চিঠিপত্র

ক্রিকেট মহাকাব্যে একমেবাদ্বিতীয়ম্

  • সচিনের কাছে ক্রিকেট অনেকটা রিলিজিয়নের মতো। একজন ধর্মপ্রাণ মানুষের মতোই ক্রিকেট-দেবতার প্রতি সচিনের নিষ্ঠা অচঞ্চল এবং দৃঢ়। সম্ভবত সেই কারণেই তিনি ঈশ্বরের বরপুত্র।

    শোভনলাল বকসী, কলকাতা-৭০০০৪৫

    (সচিনের ছবি: পি টি আই)

    -----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

    শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ও লোকেন্দ্রপ্রতাপ শাহি, উভয়েই সচিনের ক্রিকেট সর্বস্বতাকে এক নির্দিষ্ট অভিমুখে আলোচনার (মন্তব্য, ২ নভেম্বর ২০১৩) কেন্দ্রে এনেছেন। সেই অভিমুখ এক অতিমানবের অস্তিত্বের ইঙ্গিত করে। স্বামী বিবেকানন্দের উক্তি (সত্যের জন্য সব কিছু ত্যাগ করা যায়, কিন্তু কোনও কিছুর জন্য সত্যকে ত্যাগ করা যায় না) ধার করে বলা অত্যুক্তি হবে না, এ যেন সেই সচিন যিনি ক্রিকেটের জন্য সব কিছু ত্যাগ করতে পারেন, কিন্তু কোনও কিছুর জন্য ক্রিকেটকে ত্যাগ করেননি। বিশেষ করে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের মন্তব্য, ‘ক্রিকেটই তার শ্বাস-প্রশ্বাস, তার হৃদস্পন্দন, রক্তের মতো তার ধমনিতে ক্রিকেটের প্রবাহ’ এ কথাই দাবি করে। কিন্তু অধম এই পত্রলেখকের মতে শুধু ক্রিকেট নয়, অন্য এক বোধ কাজ করে। এ বোধ হল সততা, যা নিষ্ঠার জন্য একান্ত অনিবার্য উত্‌সেচক।

    নিবন্ধলেখকরা সচিনের দুঃসাহসী ক্রিকেট কেরিয়ার তুলে আনলেন, তাঁর জন্য একশো একুশ কোটি লোকের সমর্থন দেখালেন, ব্যাটসম্যান-রেকর্ড পেশ করলেন আর সচিনের পারিবারিক জীবন দেখালেন না? যে-আবহে পড়লে ৯৯.৯৯৯৯ শতাংশ কিশোর বখে যায়, টাকা আর বিজ্ঞাপনে মাথা ঘুরে যায় সেখানে সচিন শান্ত। বয়সকালে সত্তা (ego) বিকশিত হলে বন্ধু সহকর্মী আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে মনোমালিন্য, স্বার্থপরতা সংকট তৈরি করে। সচিনের কথা আমরা সকলেই যতটুকু পড়েছি, তাতে তাঁর সে সংকটের প্রমাণ পাইনি। ক্রিকেট সচিনের শ্বাস-প্রশ্বাস হলে তাঁর অন্তর্গত বোধের এই সততা হল অক্সিজেন, হৃদস্পন্দন নির্মাতা হৃদয়, ধমনির লোহিত রক্তকণিকা। শুধু ক্রিকেটার কেন, বহু সৃজনশীল মানুষই হারিয়ে গেছেন এই বোধের অভাবে।

    রাজনীতিকরা প্রাণপাত করে যাচ্ছেন জনগনের সমর্থনের জন্য। বহুত্ববাদী গণতন্ত্রে সায় দিতে গিয়ে তাঁরা ধর্মসংকট ডেকে আনছেন। আর জয় গোস্বামীর কবিতায় সচিন ‘দেশ’-এর একশো একুশ কোটি লোককে মাঠে এক করে দিলেন। কিসের জন্য? কেউ বলতেই পারেন, একশো একুশ কোটি লোক ক্রিকেট দেখে? সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হল জাতি-ধর্ম-ভাষা-বর্ণ-রাজনীতি-প্রাদেশিকতা-লিঙ্গ-বয়স ইত্যাদি বিভাজনের ঊর্ধ্বে সচিন সমর্থন ও ভালবাসা পেয়েছেন কেবল ধারাবাহিক ভাল ফলের জন্য নয়, এক সংযত জীবনযাপনের জন্যও। এই সচিনের মধ্যে খেলার মাঠে বেপরোয়া উদ্দাম উল্লাস বা সমাজজীবনে বেলেল্লাপনা, উঁচুগলায় কথা বলা, সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যমকে নিগ্রহ অন্তত সংবাদ মাধ্যমে দেখা যায়নি। এ সচিন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ‘গোপাল’-এর মতো সুবোধ নয়। এ সচিন সাহসী সেই সংস্কৃত রাখাল, যে ক্রিকেটের গোঠে বাঁশি বাজিয়ে সকলকে মোহিত করেছে গোপালের বোধ অর্জন করে।

    সচিনের উত্থান নিয়ে এক আত্মজীবনী লেখা হলে মানুষ সচিনকে অনেকটাই পাওয়া যাবে। আর সেখানে পাওয়া যাবে অনেক সচিনকে। একাকী গায়কের যেমন গান নয়, শুধু সবুজ মাঠ আর ‘হাতে বশংবদ ব্যাট, মুখোমুখি ধেয়ে আসা আগ্রাসী বোলার’ নিয়েও ব্যাটসম্যান সচিন নয়। অবসরের পর সচিন নিশ্চয়ই তাঁর সমর্থক-ভক্তদের জন্য অন্য এক ইনিংস খেলবেন। আপাতত তারই অপেক্ষা।

    শুভ্রাংশুকুমার রায়, হুগলি-৭১২১৩৬

    -----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

    দুই

    সচিন ও ক্রিকেট, একে অপরের পরিপূরক। দীর্ঘ চব্বিশ বছরের ক্রিকেট-ইতিহাসে তিনি শিল্পসুষমামণ্ডিত ও নৈপুণ্যময় ব্যাটিং-এ সৃষ্টি করেছেন অনবদ্য এক-একটি চোখধাঁধানো ইনিংস, যা ক্রিকেটীয় আর্কাইভে লিপিবদ্ধ থাকবে। দীর্ঘ সময় ভারতীয় ক্রিকেট সচিনের ব্যাটিং কসরতের ওপর নির্ভর করেই দেশ-বিদেশে অগণিত ম্যাচ-বৈতরণী সাফল্যের সঙ্গে পার করেছে। ক্রিকেট মহাকাব্যের তিনি এক ও অদ্বিতীয় নায়ক।

    সচিন নামক রূপকথার মায়াবী জালে আচ্ছন্ন সমস্ত ক্রিকেটপ্রেমী। এই প্রবাদপ্রতিম ক্রিকেটার সম্পর্কে অর্জুন রণতুঙ্গার তাত্‌পর্যপূর্ণ মন্তব্য, ‘সচিন ক্রিকেটের গয়না।’ ম্যাথু হেডেন একসময় বলেছিলেন, ‘আমি ঈশ্বরকে দেখেছি। ভারতের হয়ে তিনি চার নম্বরে ব্যাট করতে আসেন।’ সচিনকে পেয়ে বিশ্বক্রিকেট গর্বিত ও সম্মানিত, যা আবহমান কাল ধরে চলতে থাকবে। ক্রিকেটের বিশ্বায়ন ঘটাতে তাঁর নিখুঁত, ক্ষুরধার, বর্ণময় ব্যাটিং এবং নিষ্কলঙ্ক, অবিতর্কিত, গ্রহণযোগ্য ভাবমূর্তি পাথেয় হয়েছে। ক্রিকেট অভিধানে সচিন মিথে পরিণত হয়েছেন পুরোদস্তুর। সকল কিংবদন্তি খোলোয়াড়কেই এক বিশেষ সময়ে থামতে হয় এবং সচিনও তার ব্যতিক্রম নন। প্রশ্ন একটাই, ক্রিকেট-বিশ্বে আরও একজন সচিনের পুনর্জন্ম হবে কি? সময়ই এর উত্তর দেবে।

    পাভেল আমান, হরিহরপাড়া, মুর্শিদাবাদ 

    ------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

    তিন

    জয় গোস্বামীর ‘দেশ’ কবিতাটি পড়ে নিজেকে খুঁজে পেলাম। কান্দি একটি ছোট শহর। আমাদের ছেলেবেলায় অধিকাংশ বাড়িতে টিভি ছিল না। এখানকার রাস্তায় ফুটপাথ বলে কিছু নেই। ছোট একচিলতে পিচের রাস্তা। সেই রাস্তার গা ঘেঁষে ছোট ছোট দোকান। সচিন যখন খেলা শুরু করে, তখন এই পত্রলেখকের ছাত্রদশা চলছে। সেসময় আমাদের বাড়িতে শুধু রেডিয়ো ছিল, টিভি ছিল না। কান্দি রাজ হাইস্কুলের গেটের সামনে একটি নতুন টিভির দোকান সবে চালু হয়েছে। আমরা সুযোগ পেলেই গেট টপকে রাস্তায় এসে দাঁড়াতাম টিভি দেখতে। দোকানে সবসময় টিভি চলত, বিক্রি হোক বা না হোক। কত বৃষ্টির দিন পরের মাথায় ধরা ছাতায় নিজের মাথাটা গলিয়ে দিয়েছি! হুড়োহুড়ি করে দাঁড়িয়ে পড়তাম পিচরাস্তায় খেলা দেখার জন্য। তখন সচিন সবে খেলা শুরু করেছে। সচিন চার মারলে সকলে আনন্দে লাফাতাম। শূন্য রানে আউট হয়ে গেলে ভীষণ মনখারাপ হয়ে যেত। এ যেন প্রত্যেকেই মাঠে খেলছে! সত্যিই তো, আমরা মনে মনে মাঠে না খেললে এত আবেগ আসবে কোথা থেকে!

    সুব্রত ঘোষ, মুর্শিদাবাদ-৭৪২১৩৭