চিঠিপত্র

প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব

  • যে-কাজটি পূর্বতন দোর্দণ্ডপ্রতাপ বাম সরকার পারেনি, সেই পাহাড় শান্ত করার কাজটিই করলেন এক আবেগময়ী মুখ্যমন্ত্রী (মন্তব্য, ২ নভেম্বর ২০১৩)। নিপাট দো-আঁচলার মুখ্যমন্ত্রী। আর অপর দিকে ধমকে-হুংকারে-দাদাগিরিতে পাহাড়কে তপ্ত রাখা গুরুঙ্গরা। আগু-পিছু না ভেবে হুটহাট মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেওয়া, যে-কোনও ঘটনায় আগ বাড়িয়ে মন্তব্য করা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কী করে এমন একটা দুরূহ সমস্যার অনেকটাই সমাধান করলেন? ভারতীয় মানচিত্রে দ্বিতীয় তেলেঙ্গনার উত্থান হতে দিলেন না?

    মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাফল্যের রহস্য কী, এ প্রশ্ন আপনা আপনিই উঠছে। কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, দাওয়াই অতীব সরল। আগের সরকার সুদূর মহাকরণ (আলিমুদ্দিন) থেকে মাঝে-মাঝে হুংকার ছেড়েছেন, ফোঁস করেছেন, সতর্কবার্তা পাঠিয়েছেন। কিন্তু কাছের মানুষ হতে পারেননি। সেই জায়গাতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাজিমাত করেছেন। পাহাড়ের মানুষ চাইলেই এখন মুখ্যমন্ত্রীকে হাতের নাগালে পেয়ে যাচ্ছেন। কখনও ম্যাল-এ, কখনও ডুয়ার্সের চা-বাগানে, আবার কখনও কখনও ‘মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি’-র মতো বাড়ির উঠোনে। আর মুখ্যমন্ত্রীও তাঁদের সঙ্গে মিশে, কথা বলে অসুখটা ধরে ফেলেছেন। অনুন্নয়ন। পাহাড়ে একের পর এক দাদা এসেছেন, আর লুটেপুটে খেয়েছেন। কিন্তু উন্নয়নের যে-প্রতিশ্রুতি তাঁরা দিয়েছেন, তার ছিটেফোঁটাও হয়নি। ভুক্তভোগী মানুষ বরাদ্দের কানাকড়িও পাননি। তাঁরা শুধু সভা-সমাবেশের ভিড় বাড়িয়েছেন।

    মুখ্যমন্ত্রীর সাফল্যের বাতাবরণে যখন পাহাড় হাসছে, তখন বিরোধী সমস্ত রাজনৈতিক দল (লুপ্তপ্রায়, ঢাকাপড়া, লুকিয়ে থাকা, টুকি মারা সবাই) আবারও তাদের পায়ের তলার মাটি খুঁজতে শুরু করেছে। গা ঝাড়া দিয়ে উঠে নিজেদের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে উঠে-পড়ে লেগেছে। গণতান্ত্রিক ভারতে এ এক বড় জয়। গণতন্ত্রের জয়। পাহাড়ে তৃণমূলের সমাবেশ, জিএনএলএফ-এর বন্ধ হওয়া পার্টি অফিস খুলে যাওয়া সেই বার্তাই দেয়। তবে এলাকাভিত্তিক আঞ্চলিক দলের উত্থানের চেয়ে, মূল ধারার রাজনৈতিক দলের প্রতি যদি পাহাড়বাসী বেশি আনুগত্য দেখান, বেশি বেশি করে ক্ষুদ্র পরিসর থেকে বৃহত্তর আঙিনায় প্রবেশ করেন তবে তাঁদের নিজেদের আর আলাদা বলে মনে হবে না। তাঁরা সেই দিকে অগ্রসর হতে শুরু করেছেন। সেইসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীকেও আরও বেশি করে খেয়াল রাখতে হবে তাঁদের উন্নয়নের বিষয়টি। যে-উন্নয়নের মন্ত্রে জঙ্গলে শান্তি বিরাজ করছে, তার সুফল পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলিতেও পৌঁছে দিতে হবে। পাহাড়ের দাদারা অনুন্নয়নের জিগির তুলে মানুষকে একত্রিত করেছেন মাত্র। মানুষ সেই চালাকি ধরে ফেলেছেন। একত্রিত জনতা মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি পালনের বাস্তব রূপ দেখার আশায় দিন গুনছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই তাঁদের শেষ ভরসা।

    মোহাম্মদ সৌরভ হোসেন, মুর্শিদাবাদ-৭৪২১৬৬

    (ছবি: সনত্‌কুমার সিংহ)

    -----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

    দুই

    স্বকীয় দাপটেই দার্জিলিং শাসন করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। জমিটা তৈরি হচ্ছিল ধীরে ধীরে। দীর্ঘদিনের চাপা ক্ষোভ, পুঞ্জীভূত অভিমান, ক্রমাগত গোর্খাল্যান্ড স্তব, ধোঁকা দিয়ে তাঁদের বোকা বানানো- পাহাড়বাসী হাড়ে-হাড়ে বুঝেছেন এসব। দেখেছেন, তাঁদের ঠকিয়ে নেতাদের ফুলে-ফেঁপে ওঠার জমানা। মোর্চা নেতাদের গা জোয়ারিতে, ফতোয়াতে দীর্ঘদিন ব্যবসা-অফিস-কাছারি-স্কুল-কলেজ লাটে তুলে দিতে হয়েছে। ক্ষুব্ধ পাহাড়বাসী সঙ্গত কারণেই মমতার সভায় দলে দলে যোগ দিয়েছেন। তাঁরা বুঝতে পেরেছেন মুখ্যমন্ত্রীর আন্তরিকতা। বাম জমানার উপঢৌকন পাওয়া গোর্খা পার্বত্য পরিষদ কীভাবে নিজেদের খেয়োখেয়িতে অশ্বডিম্ব প্রসব করেছিল, কীভাবে ঘিসিংয়ের মানসপুত্র তাঁর গুরুকে উত্‌খাত করে ক্ষমতার মসনদে বসে কথার ফুলঝুরি ফুটিয়ে, মিথ্যে স্তোক দিয়ে তাঁদের সর্বনাশ করেছেন- প্রতিনিয়ত পাহাড়বাসী মালুম পাচ্ছেন।

    পাহাড়ে সুদীর্ঘকালের জিইয়ে থাকা সমস্যার সমাধানে বাম জমানার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীদ্বয় আন্তরিক ছিলেন না, একথা বলা ঠিক হবে না। কিন্তু তাঁদের পথটা স্বচ্ছ ছিল না। ক্রমাগত ঘিসিংকে তোষামোদ করে, গুরুঙ্গকে মহাকরণে এনে তৈলমর্দন করে তাঁরা সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছেন। এমতাবস্থায়, ক্ষমতায় এসে মমতা সমস্যার সমাধানে ত্রিপাক্ষিক চুক্তি করে অসাধ্যসাধন করলেন ‘গোর্খাল্যান্ড’ শব্দ জুড়ে দিয়ে। কিন্তু ভবি ভোলার নয়। তেলেঙ্গনা ইস্যুকে হাতিয়ার করে গুরুঙ্গ অচিরেই মুখ্যমন্ত্রীর অপ্রিয় হলেন লাগাতার বন্ধের পুনরাভিনয়ের মাধ্যমে। তখনই ক্ষিপ্ত মমতা স্বরূপ ধরলেন এবং মোক্ষম চালটি দিলেন। পাহাড়ে অকল্পনীয়ভাবে তৃণমূলের পতাকা উড়ল- যা সিপিএম চৌত্রিশ বছরে পারেনি, মমতা সেই কাজ করে দেখালেন অবলীলায়।

    লোকসভা নির্বাচনের কথা ভেবে পাহাড়ে জিএনএলএফ আবার মাথাচাড়া দিচ্ছে। সিপিএম-ও শীতঘুম কাটিয়ে পাহাড়ে উঁকি দিতে চাইছে। মোর্চার বিরুদ্ধে সুর চড়িয়ে সকলেই নিজের আখের গোছাতে চাইছে। এই সময় সব দলকে ব্যবহার করেই তিনি গুরুঙ্গকে জব্দ করতে চাইছেন।

    ধ্রুবজ্যোতি বাগচী, কলকাতা-৭০০১২৫

     

     

You may like