চিঠিপত্র

ঘুমের বিপদ!

  • উড়ন্ত উড়োজাহাজে পাইলটদের ঘুমিয়ে পড়ার কথা বেশ মজা করেই লিখেছেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় (শেষকথা, ১৭ অক্টোবর ২০১৩)। ঘুম স্বাস্থ্যবান মানুষের (সকল প্রাণীরই) একটি বড় সম্পদ। কমপিউটার উইজ়ার্ড বিল গেট্স, তাঁর হ্যাপিভ্যালিতে কর্মীদের কাজের সময়ে ঘুম পেলে যাতে তাঁরা একটু ঘুমিয়ে নিতে পারেন, সেজন্য একটি ‘শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘুম ঘর’ নির্মাণ করে দিয়েছিলেন।

    সব জেট প্লেনেই এখন ‘রোবোটিক অটো-পাইলট’ রাখা হয়, যাতে পাইলটরা পালা করে একটি ছোট ঘুম দিয়ে নিতে পারেন। লন্ডনের হিথরো থেকে আমেরিকাগামী বিমানকে আটলান্টিক মহাসাগর পেরোতে হয়। ক্রমাগত সাত-আট ঘণ্টা পাইলটিং করা সহজ কাজ নয়। যাত্রীরা ও বিমানকর্মীরা জেট ল্যাগে আক্রান্ত হন। অধিকাংশ যাত্রীই সময়টা ঘুমিয়ে কাটান। পাইলটরাও মানুষ, তাই যাত্রীদের মতো তাঁদেরও ঘুম আসতে পারে ধরে নিয়েই অটো পাইলটিং সিস্টেম রাখা হয়। তবে, একসঙ্গে দু’জন পাইলটের ঘুমিয়ে পড়াটা অস্বাভাবিক ও বিপজ্জনক ঘটনা, কারণ, অটো-পাইলট বিমান চালালেও বিমানের গ্যাসের ট্যাঙ্কে যথেষ্ট গ্যাস আছে কি না, প্রপেলার এবং টেল-মুভমেন্ট (যা মাছের লেজ বা হেলিকপ্টারের লেজের দিকদর্শক হুইলের মতো) ঠিকমতো কাজ করছে কি না দেখা এবং অল্টিমিটার ঠিক রাখার কাজ পাইলটকেই করতে হয়। আধুনিক প্রযুক্তি সেদিন বিমানটিকে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছে- এ বিজ্ঞানের আশীর্বাদ।

    তবে, বিমান তো একটি অকিঞ্চিত্‌কর বস্তু, একটি গোটা দেশ যে ঘুমিয়ে চালানো যায়, তা প্রমাণ করে দিয়েছেন হারদনহাল্লা ডড্ডেগৌড়া দেবগৌড়া, তাঁর দশ মাস এগারো দিনের প্রধানমন্ত্রিত্বকালে। সংসদের ঠান্ডা ঘরে নিজের আসনে বসে প্রায়ই তিনি ঘুমিয়ে পড়তেন। তবে তিনি বলতেন, আমি ঘুমোলেও আমার মস্তিষ্ক তখন দেশের কথা চিন্তা করে। আবার রেজিমেন্টেড দল বলে কথিত সিপিআই (এম) রাজ্যের জেলাস্তরের নেতা ও কর্মীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সভায়, (কলকাতার স্টুডেন্টস হলে অনুষ্ঠিত ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে) বামফ্রন্ট-চেয়ারম্যান বিমান বসু যখন তাঁর ভাষণে বলছিলেন, ‘এবারের কঠিন নির্বাচনে বামফ্রন্ট যদি শাসন-ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য জিততে না পারে, তাহলে এ রাজ্যের সর্বনাশ হয়ে যাবে’- তখন সেই সর্বনাশের সামনে দলের প্রথম সারির বেশ কিছু নেতা তাঁদের আসনে বসে ভাত-ঘুমে প্রায় অজ্ঞান হয়ে ছিলেন!

    ভারতীয় রেলের যে-চালকগণ রাজধানী এক্সপ্রেসের মতো দূরপাল্লার ট্রেনগুলি সারা রাত ধরে চালান, তাঁরা যাতে সজাগ থাকেন, তার জন্য সহকারী চালক প্রতিটি স্টেশনের থ্রু সিগনালের আলো-জ্বলা ও ট্র্যাকচেঞ্জের সময় সজোরে Right/ Through/ Danger প্রভৃতি শব্দ উচ্চারণ করেন এবং মুখ্য চালক Yes/ Through/ Danger বলে উত্তর দেন। এতে বোঝা যায় তিনি সজাগ হয়ে ড্রাইভ করছেন। বিকেল চারটে পঞ্চান্ন মিনিটে সময় রাজধানী এক্সপ্রেস হাওড়া ছেড়ে রাত আটটার পরে প্রথম স্টপ ধানবাদে থামে, এখানে যাত্রীদের রাতের খাবার দেওয়া হয়। চালক, গার্ড ও অন্য কর্মীদেরও নৈশভোজ পর্ব সেরে নিতে হয়। খাওয়ার পর যাত্রীরা ঘুমের আয়োজন করেন। চালকদ্বয়, প্যাসেঞ্জার ম্যানেজার ও গার্ড সাহেবদের কিন্তু জেগে থাকতেই হয় মোগলসরাই না আসা পর্যন্ত (রাত ১২টা ৫০ মিনিট), যেখানে তাঁদের বদলে নতুন স্টাফ ট্রেনের ভার নেন (রেলের ভাষায় Crew Change)। খাওয়ার পর চালকের ঢুলুনি আসা স্বাভাবিক, কিন্তু প্রতি সিগনালে ঘন ঘন Shouting বা জবাব আদান-প্রদানের কারণে তাঁদের ঘুমিয়ে পড়ার সুযোগ থাকে না। এ রকমই কোনও রীতি বিমান চালকদের মধ্যে চালু করলে, দুই চালকের একসঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ার সম্ভাবনা কমে আসবে।

    নন্দদুলাল রায়চৌধুরী, খড়গপুর-৭২১৩০১

    (প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী দেবগৌড়ার ছবি: তপন দাশ)