চিঠিপত্র

ক্ষমতায় মমতা: কিছু জরুরি প্রশ্ন

  • ‘এখনও ক্ষমতায়’ (মন্তব্য ২ জানুয়ারি ২০১৫) লেখাটি প্রসঙ্গে কয়েকটি কথা না বললেই নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি যে-আশা জুগিয়েছিল, তা এসেছে বটে কিন্তু বদলায়নি কিছুই। পরিবর্তন এনেছে আশার অপমৃত্যু, পরিবর্তন যা হয়েছে তা কেবল বাংলাকে নিচের দিকে টেনে নামিয়ে শাসনব্যবস্থাকে (পড়ুন দুঃশাসন) এক অতল অন্ধকারের গহ্বরে নিক্ষেপ করতে চেয়েছে যেন। অপশাসন, দুর্নীতি ও অপরাধের বাড়বাড়ন্ত ছিল সাল ২০১৪-র অলঙ্কার। দুর্ভাগ্যের কথা এই যে, যিনি এই পরিবর্তনের কান্ডারি ছিলেন, তিনিই আজ শাসনক্ষমতার শীর্ষে বসে রাজ্যের শাসনব্যবস্থার অবনমনের সঙ্গে মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে হতাশায় রূপান্তরিত করেছেন।

    মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক উত্থান উল্কাসম। তিনি নিজেকে সিপিএম-বিরোধী একমাত্র নেত্রী ও মুখপাত্র বলে তুলে ধরেছেন। সিপিএমের অপশাসন ও ক্যাডারবাহিনীর হিংসাশ্রয়ী আচরণের ফলে মমতা নিজেকে শান্তির দূত ও আশার প্রতীক হয়ে বামফ্রন্ট শাসনকে অপসারণ করে একটি গুণগত পরিবর্তন এনে ও শাসনক্ষমতায় বসে, রাজ্যের মানুষকে একটা সুদক্ষ সরকার ও স্বচ্ছ প্রশাসন দেওয়ার আশায় উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। মানুষ তাঁকে বিশ্বাস করে বিপুল ভোটে জয়যুক্ত করেছিলেন। রাজ্যের আপামর মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন লাভ করেই মমতা রাজ্যের শাসনভার হাতে নেন এবং পরিবর্তনের শপথ নেন। ভোটযুদ্ধের উচ্ছ্বাস স্তিমিত হলে কিছু প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্ব মুখ্যমন্ত্রীকে পরামর্শ দেন যে, চাঁদের আলোকিত অংশের পেছনে একটি অন্ধকার দিক বিদ্যমান- এটা যেন তিনি মনে রাখেন। শাসনক্ষমতায় বসার অল্পকাল পরেই রাজ্যের নানা অংশে চাঁদের অন্ধকার দিকের মতোই কালো ছায়া স্পষ্ট হতে থাকে এবং মানুষের মধ্যে একটা সন্দেহ জাগে, মমতার পরিবর্তন আনার প্রতিশ্রুতির মধ্যে আদৌ কোনও আলোকিত দিক ছিল কি না! প্রশাসনিক দুর্বলতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, বিরুদ্ধ মতের প্রতি অসহিষ্ণুতা এবং অসাংবিধানিক ভাষা ব্যবহারের প্লাবন ও ভোটব্যাঙ্ক অক্ষুণ্ণ রাখতে সংখ্যালঘু তোষণ, আইনের শাসনকে অমান্য করার সঙ্গে দুর্নীতির বাড়বাড়ন্ত- এসবই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজ্যশাসন প্রক্রিয়ার বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে। তিনি একাই মন্ত্রক ও প্রশাসন নির্বিশেষে সবক্ষেত্রেই তাঁর নিজের মতকেই চূড়ান্ত বলে জারি করায় প্রশাসনে ও বিশেষ করে পুলিশে একটা অসাড়ভাব জাঁকিয়ে বসেছে। এর ফলে সারা দেশে প্রবাসী বাঙালিরা হাসির ও উপহাসের পাত্র হয়ে উঠেছেন। অবাঙালিরা প্রশ্ন করেন, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক সচেতনতার যে-গর্বে বাঙালিরা নিজেদের গৌরবান্বিত বোধ করেন, সেই বাঙালিরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে কীভাবে রাজ্যের ৩৪ বছরের বাম-শাসনের পর শাসনক্ষমতায় বসিয়ে দিলেন? তাঁরা (ভিনরাজ্যবাসীরা) মনে করেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে বাঙালিদের গর্বের যেসব জায়গা, যেমন শিক্ষা, সংস্কৃতি ও আভিজাত্য এসবের কোনও কিছুই নেই। তা সত্ত্বেও বাঙালিদের ভোটে বাঙালিদের ভাগ্যনিয়ন্তা হলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়! বাংলার বাইরে তো বটেই, বাংলার মধ্যেই কিছু মানুষ এই ধাঁধার রহস্য ভেদ করতে পারেননি। তাহলে এটা কি দুর্ঘটনা না কার্যকারণযোগ, যার ফলে বাঙালি ভোটদাতাদের পরিণামদর্শী ভোটের অঙ্ক, যা আগে থেকে অনুমান করা যায় না। এখন সময় এসেছে এই প্রশ্ন করার, বাঙালি সংস্কৃতির অতীত গৌরবের যে-জায়গা, সে কথা ভুলে ভোট দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কোন গুণে রাজ্যের শীর্ষ-ক্ষমতায় বসানো হল?

     চৌত্রিশ বছরের বামফ্রন্ট শাসনকালে সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার, দলের ক্যাডারদের দিয়ে ভীতিপ্রদর্শন ও হিংসাকে প্রশ্রয় দেওয়া ও রাজ্য-পরিচালনায় সুশাসনকে কোনওরকম গুরুত্ব না-দিয়ে শুধুমাত্র টিকে থাকার জন্য সব রকমের গণতন্ত্রবিরোধী কাজকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বামফ্রন্টের এই অপশাসনকে হঠিয়ে একটা পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। গত সাড়ে তিন বছরে তিনি এই প্রতিশ্রুতি ও মানুষের বিশ্বাসের কোনও মর্যাদা দেননি। তাঁর শাসনাধীন বাংলায় আমরা প্রত্যক্ষ করছি সেই সর্বনাশের চিত্র, যা শুরু হয়েছিল সিপিএম দলের চেয়ারম্যান প্রমোদ দাশগুপ্তের আমলে। একজন দায়বদ্ধ নাগরিকের মতো একজন শাসকেরও উচিত এমন কাজ না করা, যাতে অন্য অনেকের ক্ষতি হয়।

    শুধুমাত্র যেনতেনপ্রকারেণ ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য দলদাসদের সব রকমের অপকর্মে প্রশ্রয় দিয়ে চলার ফল হয়েছে এই- বিজ্ঞানী বিকাশ সিংহ মমতার রাজত্বকে ব্যর্থ রাজ্য বলেছেন, আর দলের সাংসদ ড. সুগত বসু থেকে মন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায়, সাধন পাণ্ডের মতো দলের পুরনো নেতা/মন্ত্রীরা বিবেক-দৃষ্ট হয়ে কিছু কঠিন সত্য কথা বলায় দলনেত্রীর ক্ষোভের মুখে পড়েছেন। কারণ, নেত্রী কোনও সমালোচনা সহ্য করতে পারেন না। পূর্ব মেদিনীপুরে দলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এমন আকার নিয়েছে যে, মঞ্চে ভাষণরত সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে এক যুবকের হাতে গালে চড় খেতে হয়েছে। কলেজগুলিতে ছাত্র-সসংদ নির্বাচনের মনোনয়ন পত্র তোলা নিয়ে মারপিট-হানাহানি চলছে টিএমসিপি ও অন্য দলের ছাত্র-নেতা কর্মীদের মধ্যে। রোজ খবরের কাগজ খুললেই ধর্ষণ, মারামারি, দুর্নীতির খবরে সকালের মেজাজটাই বিগড়ে যায়, দিনটা কেমন যাবে সে প্রশ্ন মনে জাগে। আমার মনে হয়, মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসে এতরকম সমস্যা হবে, প্রশাসনিক কাজকর্মে সচিব ও আমলাদের পরামর্শ নিয়ে চলতে হবে- এমন সব বিষয় তিনি ভেবে উঠতে পারেননি। তাই সর্বস্তরে নিজের মতো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়ে, প্রশাসনকে নিষ্কর্মা করে রেখে যে-সঙ্কট তিনি তৈরি করেছেন, এখন তার মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে না পেয়ে অনেকটা দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। সারদা কাণ্ডে সিবিআই তদন্ত যাতে না হয় সেজন্য সুপ্রিম কোর্টে প্রাণপণ লড়েও তা বন্ধ করতে পারেননি। সিবিআই যেভাবে তদন্তের জাল গুটিয়ে আনছে, তাতে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা/মন্ত্রীদের মধ্যে যদি আরও কেউ ধরা পড়েন, তাহলে তাঁর মন্ত্রিসভা ও দলের কী হাল হবে এবং কীভাবেই বা তিনি রাজ্যের কাজকর্ম সামলাবেন তা সময়ই বলবে। জেলবন্দি মদন মিত্রের পদত্যাগপত্র তিনি গ্রহণ করেননি। তাই পরিবহন ও ক্রীড়ামন্ত্রকের নীতিগত সিদ্ধান্ত তিনি কীভাবে নেবেন ও জেলে বসে দপ্তরের ফাইলপত্রই বা তিনি সইসাবুদ করবেন কীভাবে এবং তা আইনত বৈধ হবে কি না, এ প্রশ্নও বিভিন্ন মহলে উঠেছে।

    আমাদের মনে রাখতে হবে, রাজ্যের সরকার যদি সঠিক দিশায় কাজ করতে না পারে, তাহলে সঙ্কট শুধু মুখ্যমন্ত্রীর নয়, সঙ্কট রাজ্যের সাধারণ মানুষেরও।

    নন্দদুলাল রায়চৌধুরী, খড়্গপুর-৭২১৩০১

    - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -

     দুই

    ‘এখনও ক্ষমতায়’ (মন্তব্য, ২ জানুয়ারি ২০১৫) পড়ে এই চিঠির অবতারণা। স্বাধীনতার পরবর্তী ৬৮ বছরে যে-আটজন (প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ, ডা. বিধানচন্দ্র রায়, প্রফুল্ল সেন, অজয় মুখোপাধ্যায়, সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়, জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন, তার মধ্যে জনপ্রিয়তার নিরিখে ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের পরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম উল্লেখ করতে হয়। তাঁর অপরিসীম প্রাণশক্তি ও লড়াকু মনোভাবই শুধু নয়, তাঁর আটপৌরে জীবনযাপন, সাধারণ মানুষের মুখের ভাষাই তাঁর রাজনীতির বক্তৃতার ভাষা প্রভৃতির জন্য তিনি আমজনতার কাছে জনপ্রিয়তম নেত্রী হিসেবে পরিগণিত হয়েছেন।

    দেখা যাচ্ছে তাঁর রাজনীতি আপাতদৃষ্টিতে দক্ষিণপন্থী হলেও, তাঁর ভিতরে সবসময়ই অবচেতনভাবে কাজ করেছে বামপন্থী আন্দোলনের ঝোঁক। এবং এই জন্যই সম্ভবত তিনি ভূত-ভবিষ্যত্‌-বর্তমানের কথা অতশত না ভেবে যে- কোনও কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এই ভাবমূর্তিই সমর্থকদের কাছে তাঁকে আরও জনপ্রিয় করে তুলেছে। আমি তোমাদেরই লোক- একথা আমজনতা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে। নাহলে ১৯৯৮ সালে একটি নবগঠিত দল তৈরি করে, ২০১১ সালে রাজ্যে ক্ষমতা দখল করার নজির ভূ-ভারতে আর ক’জনের রয়েছে? ১৯২০ সালে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার পরে এবং ১৯৬৪ সালে সিপিএম দল তৈরির পরে, পশ্চিমবঙ্গের রাজপাট দখল করতে এই বামপন্থী দলটির সময় লেগেছিল ৫৮ বছর। আর মমতার লেগেছে মাত্র ১৩ বছর। সুতরাং দেখা যাচ্ছেমমতা একাই একশো!

    তবে মমতা জনপ্রিয় নেত্রী হয়েও তাঁর শাসনকালে যে-আশা জাগিয়ে এসেছিলেন, তা সাম্প্রতিককালে অনেক ফিকে হয়ে গিয়েছে বিভিন্ন কারণে। নিবন্ধে তা খুব সুন্দরভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবুও এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির পরিমণ্ডলে তাঁর বিকল্প কেউ নেই।

    তুষার ভট্টাচাযর্, মুর্শিদাবাদ-৭৪২১০২