চিঠিপত্র

গীতা কেন ‘জাতীয় গ্রন্থ’?

  • গীতাকে ‘জাতীয় ধর্মগ্রন্থ’ (সম্পাদকীয়, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৪) আখ্যা দেওয়ার জন্য মোদী সরকারের বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ একবারও ভাবেননি, ভারতের মতো একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশে একটি ধর্মগ্রন্থ কেন জাতীয় গ্রন্থরূপে চিহ্নিত হবে? তাহলে ত্রিপিটক, বাইবেল, কোরান, গুরুগ্রন্থসাহিব, জেন্দ আবেস্তা প্রভৃতি ধর্মগ্রন্থ কী দোষ করল? হিন্দুত্ববাদীদের ধারণা, একমাত্র গীতাই হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ ও সর্বমান্য গ্রন্থ, গীতাই প্রথম ও শেষ কথা! মন্ত্রীমহোদয়ার এ ভাবনা শুধু ভুল নয়, যথেষ্ট উদ্বেগজনকও। হিন্দুধর্মমতে যে-সহনশীলতা, যে-ঔদার্য, বহু মত-পথ সম্পর্কে যে-শ্রদ্ধা আছে, এ ভাবনা তার পরিপন্থী। তাছাড়া সম্ভবত মন্ত্রীর এই ভাবনা সম্পূর্ণ সংবিধান বিরোধীও।

    গীতা আদৌ গ্রন্থ নয়। গীতা মহাভারতের প্রক্ষিপ্ত অংশ। আসলে গীতা এক দর্শন। দর্শন কোনও গ্রন্থে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। দর্শন মহাজাগতিক চেতনা বিশেষ। এই দর্শনকে কোনও গ্রন্থে বেঁধে একে ব্যবহার করতে চাইছে ভারতের রাজনৈতিক স্বার্থ। সেই দিক থেকে বিচার করলে অবশ্যই এই প্রচেষ্টা অভারতীয়! তাছাড়া দেশ পরিচালনার পূর্বশর্ত হল, তা ভারতীয় সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। সেই সংবিধান অনুযায়ী ভারত ‘সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র’। অর্থাত্‌, ভারতের কোনও রাষ্ট্রীয় ধর্ম নেই। তবে গীতার বাণী প্রচারের উদ্যোগ নেওয়ার স্বাধীনতা যে-কোনও নাগরিকের রয়েছে। কিন্তু তেমন উদ্যোগের সঙ্গে রাষ্ট্র জড়িত থাকতে পারে না। গীতা মহাভারতের একটি অংশ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে পঠিত হয়ে চলেছে। কিন্তু কোনও গণতান্ত্রিক দেশ তার নাগরিকদের বাধ্য করতে পারে না সেটি পড়তে, বা পড়ে গর্ববোধ করতে।

    মধ্যযুগে শঙ্কর, রামানুজ দু’জনেই গীতাকে স্মৃতিশাস্ত্রের বর্গে ফেলেছেন, স্মৃতি মানে পুরাণের চেয়ে ওপরে, কিন্তু শ্রুতির (বেদ) নিচে। গীতা নয়, বেদই শীর্ষে। বেঁচে থাকলে শঙ্কর বা রামানুজ কেউই গীতাকে ‘জাতীয় গ্রন্থ’ বলতেন না সেটা সঠিক। গীতার গুরুত্ব অন্যত্র। স্মৃতি কিন্তু শ্রুতিতুল্য। গীতার বাণী ধর্মদর্শনের বিচারে অত্যন্ত উচ্চমার্গের। কিন্তু গীতার পূর্বসূরি বেদ-উপনিষদের দর্শনতত্ত্ব ভারতের আধ্যাত্মিক ভাবনা ও জীবনচর্যার মূল প্রেরণা। এটা সঠিক যে, বহু হিন্দু মনে করেন আদতে বেদান্তই পথপ্রদর্শক গ্রন্থ। উপনিষদের দর্শনে বেশির ভাগ হিন্দু ধর্মনিরপেক্ষ বাণীর সন্ধান পেয়ে আশ্বস্ত হন। উপনিষদ, গীতা, ব্রহ্মসূত্র কোনওটিরই কোনও সর্বসম্প্রদায়সম্মত ভাষ্য পাওয়া যায় না, যা সব হিন্দু বা অধিকাংশ হিন্দু গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন। দার্শনিক গ্রন্থের ব্যাখ্যার একটি নির্দিষ্ট, ধারাবাহিক ঐতিহ্য রয়েছে। যেমন, শঙ্করের ধারা, রামানুজের ধারা, নিম্বার্ক কিংবা অভিনবগুপ্তের কাশ্মীরি ধারা। এই ধারাগুলি একে অপরের বিরোধী। ইহুদি, খ্রিস্টান বা শিখ ধর্মের মতো হিন্দু ধর্ম গ্রন্থনির্ভর নয়। ১৯৯০ সালে বিজেপি হিন্দু ধর্মকে রামায়ণ-ভিত্তিক বলে প্রচার করেছিল। তাঁরা তুলসীদাসজি-র রামচরিতমানসকে (রামায়ণ) বেছেছিল, যেখানে রামচন্দ্রকে ভগবান বলে দেখানো হয়েছে। বাল্মীকির রামায়ণ অনেক প্রাচীন, কিন্তু সেখানে রামচন্দ্র বীর, একপত্নীক, ‘নরচন্দ্রমা’। সেজন্য বর্তমান পত্রলেখকেরও ধারণা যে গণতন্ত্রে সংবিধানই একমাত্র পবিত্রতম গ্রন্থ।

    সোমেশ্বর মল্লিক, কলকাতা-৭০০০৮৪

You may like