কবিতা

শিশুতীর্থ

জয় গোস্বামী

  • শিশুখুন করে খুশি?

    আনন্দ হল বাচ্চাগুলোকে মেরে?

    ভেতরে একটা উল্লাস হচ্ছে না?

    কী দুর্দান্ত ইতিহাস গড়লাম!

    পুরো দুনিয়াকে জানিয়ে দিলাম আমরা কিন্তু আছি!

     

    নিজের বাড়ির বাচ্চার কথা কারও মনে পড়ল না?

     

    কোনওদিকে কোনও গাছপালা নেই, লোকালয় নেই আর-

    মাটির বদলে পৃথিবী কাঠের পাটাতন দিয়ে ঢাকা

    সেই পাটাতনে এখানে ওখানে শত শত শিশুদেহ

    স্কুলের পোশাক পরা

    কেউ চিত্‌, কেউ উপুড়, কেউ বা কাত হয়ে পাশ ফিরে

     

    ওরা ওরকমই থাকবে, ওদের শরীরে পচন নেই

     

    কোনও সত্‌কার হবে না ওদের

    সভ্যতা শেষ হবে 

    . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . .

    দু’টি কবিতা

     

    সোমব্রত সরকার

     

    কথিকা

     

    কুবেরের ভাই হলে আমারও বোন ভূষণা ভূষণী

    ঘরে ও বাতাসে বাংলার পোষ হাওয়া তোলে

    সংক্রান্তির দিনে মকরে তার আলপনা এঁকে দিই

    তুমি চারটে চিতুই, চোখা গুড়, পিটুলি, ছাঁচ

    অকল্পিত কোন সাক্ষ্যে নেমে এলে আজ! ঘর গৃহস্তি

    সামলাবে পাত্র ও ইন্ধনে? রাঙাদিদা

    প্রাণেশ্বরী। পিঠের দিনে মুগপুলি, গোকুল

    চন্দ্রকাটে ছবিবন্ত হয়ে বসে আছ। গামলায়

    ঘন হচ্ছে দুধ। চির-অস্থির সৌম্য আমি

    একথালা আগুনের শিশুকাল- মিষ্টি মিষ্টি গন্ধ

    ঝাঁঝ কম। পিঠের দিনে দূর গাঁয়ে দিদারও

    জয়ানন্দ আছে। যার জন্য ভাপাপিঠা, পাটিসাপটা

    সরুচাকলি মুখে না তুলে পাতায় ভাসানো পুকুরের জলে

    হাত মুখ ধুয়ে একমাথা ঘোমটা সংক্রান্তির সাঁঝে

    সবই দ্যাখা কথা। সুচিত্রিত জলচৌকি-

    ঝরনা কলম সুলেখা কালিতে ভরে নিয়ে অজস্র ভূষণে

    লিখে চলা দিদা যেন চোরাটানে মন কাঁপায়, জয় জয়

    আনন্দের ফ্রেমে বাঁধা মধ্যযুগ, রামায়ণ- সমাজশাসনে

    আরও এক যুগের আড়াল নেওয়া কথিকার কবি, এই চন্দ্রাবতী।

     

     

    ধার

     

    পড়ো তুমি এ যুগের সংহিতা। সাত খণ্ড উপনিষদ

    সটীক তৈত্তিরীয়, গীতাতে আমরা আজও নই সিদ্ধহস্ত

    কোনওভাবে! অবসরকালে শুয়ে বসে প্রিয় কিছু গ্রন্থ পাঠ

    এই আমাদের আলস্যসম্ভোগ। জ্ঞান? সেও এক

    তঞ্চকী মায়া, সৃষ্টির গিঁট খুলে দেয় মাঝে মাঝে।

     

    বস্তুময় এ পৃথিবীকে ব্রহ্মময় করে নেওয়া প্রবাদপুরুষ

    ব্যাসের প্রয়াস। অথচ তিনিই আবার অত বড় এক যুদ্ধ এনে

    কামিনী, কাঞ্চন যোদ্ধাদের প্রখর তরোয়ালে সাজিয়ে দিলেন

    খুব লিপ্সা, ভোগ পরপর ধীরে ঢুকে গেল মহত্ত্বব্যঞ্জক।

     

    স্বপ্ন কিসে? তোমার ঠোঁটের ভাঁজে নেত্রবতী পৃথিবীর

    আঁখি দেখে ফেলা, নাকি কিরণ্ময়ী বুকের তীব্র দাবে

    ব্রহ্মময় তৃষ্ণিকার ছবি বুঝে যাওয়া- এও সম্ভব!

     

    নেপথ্য মঞ্চের কাছে চতুর্যুগ খেলা করে

    শকুনির দানে কৃষ্ণগন্ধলুব্ধ পাশা উলটে গেলে

    কোন যুগ কত দানে? প্রশ্ন করি আর বস্তুময়, ব্রহ্মময়

    সব যেন বিপরীত ছুরিকার শব্দময় আসক্তির ধার। 

    . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . .

    পাখিজন্ম

     

    রজতশুভ্র মজুমদার

     

    তুমি এখনই চলে যাচ্ছ?

     

    আকাশ কালো করে কেমন মেঘ উঠেছে দ্যাখো

    ওই দিকে ঝড় শুরু হয়ে গেছে, কী প্রচণ্ড ঝড়!

                                    বড় গাছটা দুলছে আমাদের বাঁচার আর্তনাদে-

    দুলতে দুলতে গাছ পড়ে গেল অবশেষে।

    গাছের ভেতর যে-পাখির বাসা ছিল,

    বাসার ভেতর যে-ডিমগুলো,

    ডিমগুলোর মধ্যে যেগুলো একটুখানি ফুটেছিল,

    ফুটে বেরিয়ে আসছিল যে-ফুটফুটে বাচ্চা,

    সব ফেলে,

    মা-র মাথায় আকাশ ভেঙে

    একদিন

                     বাবা চলে গেলেন নিরালার দিকে...

    তারপর এতগুলো বছরের চড়াই-উতরাই

    এত কষ্টের পাহাড় ডিঙিয়ে

    জীর্ণ হাড়-জিরজিরে মা আমাদের

    আজও মাটির কাছাকাছি,

                                    মাটিরই বিষাদপ্রতিমা যেন-

                                                         নির্জন

                                                                    পরিত্যক্ত...

     

    আর আমাদের পাখিজন্ম আকাশের সভ্যতায়

    কী দারুণ উচ্চকিত, মুখর!

    . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . .

    দু’টি কবিতা

     

    নিমাল্য মুখোপাধ্যায়

     

    রহস্যহীন

     

    আর কোনও রহস্য নেই আমার কবিতার।

    এবার শান্তভাবে রাতের বাগানে দাঁড়াই

    প্রতিটি গাছই যেন এক-একটি চরিত্র,

    ঘুমের দেশ থেকে জেগে উঠবে এখনই।

    কী অদ্ভুত আঁখি সে তাদের, মাটির

    শিকড় থেকে আকাশ মেলে তাকাচ্ছে তারা -

    এখন আমিও কি গাছ? ফুলের, পাতার

    অথবা সুস্থির ছায়ার মতন?

    আর কোনও রহস্য নেই আমার কবিতার

    এই জন্মের পর শুধু একবার শুধু

    ‘আশ্রয়’ বলে মুগ্ধতা এসে বসুক আমার কপালে!

     

     

    চরণ মুর্মুর ঘর যেতে যেতে

     

    ‘ত্রিসীমা’, ‘আমঝরনা’, ‘ময়ূরঝরনা’ এসব পাহাড়ি গ্রামের নাম।

    আরও পশ্চিম দিকের মেদিনীপুর, আমরা চলে যাচ্ছি

    দীর্ঘ শালজঙ্গলের ভিতর। কাঁকড়াঝোড় নয়, ভিতর পথে,

    দূরে ধলভূমগড়! মাকড়ভুলার পাহাড় দেখে মনে হল -

    প্রতিটি গ্রামই যেন এক-একটি ফুলের উপত্যকা;

    সকালে সূর্য এসে কুঁড়েঘরে খেলা করে আনন্দ-ঈশ্বর।

    দূর থেকে ভুল হয়, বাহা উত্‌সবে বনে ফুটে আছে অমৃতবাগান!

    চরণ মুর্মুর ঘর যেতে পৃথিবী এখানে রাত্রির ময়ূর! জলের উপর

    থেকে সহস্র শিখি আজ যেন বনের পাখি, মনের পাখি

    এই পূর্ণ চন্দ্রালোকে সেরে নিচ্ছে স্নান। মাটির রং ঘন সবুজ

    যার যেমন ইচ্ছে সংগ্রহ করি, শহরুলের সময় লাল, খয়েরি

    হলুদ মাখিয়ে দিই এ-ওর গায়ে। রঙের ধাঁধায় ঘুরতে ঘুরতে

    চরণ মুর্মুর ঘর - তার বউ মাটির হাঁড়িতে পুরনো চালের

    ভাত বসিয়ে দেয়, আজ মাথার উপর কত যে পাখি, কত যে কুজন,

    আমি ভাবি, ভাবতেই থাকি, ঈশ্বর সত্যিই আছেন আমার পৃথিবীতে...

     

    . . . . . . . . . . . . . . . . . 

    চিত্‌পুরে

     

    শান্তি সিংহ

     

    পথে যেতে যেতে কবির সঙ্গে দেখা

    মেয়েকে ইস্কুলে নিয়ে যাচ্ছেন কবি

     

    দুটো মিনি বাসে ঝগড়া

    থমকে দাঁড়িয়ে ট্রাম

    ঘণ্টি বাজছে

    একটা ঠেলাগাড়ির আগে

    সওয়ারি নিয়ে টানা-রিকশা

    তার মাঝে ঢুকে গেছে

    একটা সাইকেল

    ইস্কুলে-পড়া ছেলেটা নির্বিকার

     

    থমকে দাঁড়িয়ে কবি

    মেয়ে বলে, ‘বাবা, ছোটনদী কবিতাটা শুনবে

    আজ মুখস্থ ধরবেন বীথিম্যাম’

     

    চাপা বিরক্তি নিয়ে কবি বলেন,

    ‘এখন থাক’

    . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . .

    অঙ্কন: সুব্রত চৌধুরী

     

     

     

You may like