শেষকথা

যেমন জন, তেমন তার প্রতিনিধি

বিশ্বজিত্ রায়

  • জনতাই তো তাঁদের প্রতিনিধিকে নির্বাচিত করছেন। আর প্রত্যাশা পূরণ না হলেই তখন চপেটাঘাত!

    কাব্যশাস্ত্রীরা ‘অনুভাব’ শব্দটি ব্যবহার করতেন। ভাব অনুসারে অভিনেতাদের কণ্ঠে শরীরে যে-প্রকাশচিহ্ন দেখা যায় তাই অনুভাব। যেমন, প্রেমের দৃশ্যে অভিনয় করতে গেলে ভেজা-ভেজা গলায় কথা বলতে হয়। হাত-পা নরমভাবে ‘সঞ্চালন’ করতে হয়। ভেজা গলা, আলতো করে হাত-পা চালনা এসব অনুভাব। চিত্‌কার করে, আমার দাবি মানতে হবে গোছের স্লোগান তুলে হাতমুঠো করে কোনও অভিনেতা প্রেমাভিনয় করেন না। শুধু মঞ্চে কেন, বাস্তবেও আমরা নানা অনুভাবের বশীভূত। আমাদের গণতান্ত্রিক দেশে বসবাস। নিয়ম করে সেখানে ভোট হয়। ভোট দিয়ে আমরা জনপ্রতিনিধিদের নির্বাচিত করি। ভোটের পরে পরেই আমাদের আশা- ভালবাসার শেষ থাকে না। নাগরিকদের গলার স্বর, চোখমুখের চেহারা বদলে যায়। নাগরিক-সমাজ ভাবে যাক, ভোটের পর যাঁরা নবনির্বাচিত, তাঁরা বুঝি এবার রাজ্যের উন্নয়নের জন্য একমনে কাজ করবেন। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে তো শেষ নির্বাচন পরিবর্তনের নির্বাচন। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে নানা ব্যাধি ভর করে। সর্বাত্মক দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতা ব্যক্তি ও দলের মধ্যে দুর্নীতির সঞ্চার করে বলেই গণতন্ত্রের স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য বদল জরুরি। এই বদল পশ্চিমবঙ্গের মানুষের চোখে-মুখে-শরীরে-কণ্ঠে নতুন আশা-উদ্দীপনা সঞ্চারিত করেছিল।

    সেই সব ইতিবাচক অনুভাব অবশ্য ক্রমশই বদলে যাচ্ছে। ইদানীং রাজনৈতিক মঞ্চের সঙ্গে নাট্যমঞ্চের আর তেমন পার্থক্য নেই। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা প্রতিনিয়ত জনসমাবেশে মানুষকে উত্তেজিত করতে উত্‌সাহী। স্থির কোনও উন্নয়নমূলক পরিকল্পনা ছাড়াই গরম-গরম কথা। সেই সব অন্তঃসারশূন্য প্রয়োগহীন কথা শুনতে-শুনতে মানুষ ক্রমশই হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। আর সেই হতাশভাবের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে তাঁদের শরীরী ভাষা-অনুভাব তখন অন্যরকম। হতাশা থেকে জন্ম নিচ্ছে ক্রোধ। সেই ক্রোধ হয়ে উঠছে মারমুখী। রাজনৈতিক নাট্যমঞ্চে প্রবেশ করেছেন নাগরিক। জনপ্রতিনিধির ওপর বর্ষিত হচ্ছে চপেটাঘাত। এই আঘাত আসলে হতাশাজনিত প্রত্যাঘাত। অনেক আশা নিয়ে যাঁদের নির্বাচিত করা হয়েছিল, তাঁরা যখন ক্রমাগতই অদ্ভুত আঁধারের উত্‌পাদক হয়ে ওঠেন, তখন তো এমনই প্রতিবাদী প্রত্যাঘাত নেমে আসবে। বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির খোঁজ করবেন নাগরিকবৃন্দ। জনপ্রতিনিধিদের মাথায় তুলে নাচা আর চপেটাঘাত করা কিংবা জুতো ছুড়ে মারা- এ দুই বিপরীত প্রতিক্রিয়া। সচেতনভাবে সবদিক বিবেচনা করে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করা উচিত। জনপ্রতিনিধিদেরও বুঝতে হবে তাঁরা অভিষিক্ত রাজাধিরাজ নন। নির্বাচিত প্রতিনিধি মাত্র। গাঁধীবাদী নির্মলকুমার বসুর মতে এঁরা জনসেবক। জনগণের আশাকে ন্যায়সঙ্গতভাবে পরিপূর্ণ করার প্রয়াসগ্রহণ তাঁদের কর্তব্য। বাস্তব অবশ্য আদর্শ থেকে শত যোজন দূরবর্তী। ফলে রাজনৈতিক বঙ্গ, অলীক কুনাট্য রঙ্গে পরিপূর্ণ। নাট্যটি যে ঠিক কী ভাবের তা বোঝার উপায় নেই। প্রতিমুহূর্তেই ভাব যাচ্ছে বদলে। তলানিতে ঠেকছে দায়িত্ববোধ। আর শুরু হচ্ছে বিচিত্র হাতাহাতি, অযোগ্য জনপ্রতিনিধির ওপর নেমে আসছে চপেটাঘাত। যেমন ‘জন’ তেমনই তার ‘প্রতিনিধি।’