Travelogue

সবুজ বাটি, রুপোর আয়না: সানাসার

অমিতাভ ঘোষ

  • মিনিট দশেক হল লজের রিশেপসনে এসেছি। চেক ইন করে তিনতলায় উঠে করিডর দিয়ে নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছি, হঠাত্‌ চোখ আটকে গেল দেওয়ালে টাঙানো এক অসাধারণ ছবি দেখে। পরক্ষণেই ভুল ভাঙল পাইন, দেওদার ঘেরা যে-মনোরম পাহাড়ের ছবিটা দেখলাম তা তো ছবি নয়! লজের করিডরে বিশাল কাচের জানালা দিয়ে ছবির মতো সুন্দর বাইরের দৃশ্যটাই আমি দেখতে পেয়েছিলাম। এখন নিজের ঘরের খোলা ব্যালকনি থেকে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছি। হাতে সদ্য দিয়ে যাওয়া কফির কাপ। চোখের সামনে লম্বা লম্বা পাইন গাছ, বেশ খানিকটা জায়গা ফাঁকা। সামনের সুনসান রাস্তাতে একটা সুন্দর গাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে। পর পর কয়েকটা সুন্দর হোটেল। সাপের মতো নিচে চলে যাওয়া রাস্তাটাকে অনেক দূর অবধি দেখা যাচ্ছে। দূরে দৃষ্টিপথে একটা বিশাল পাহাড়, যার গায়ে ছড়িয়ে আছে কয়েকটা গ্রাম। অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকতে থাকতে স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছিল সময়টাকে। অথচ কাছে-পিঠে এখনই একটু ঘুরে আসা উচিত। পাহাড়ে কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঝুপ করে সূর্যের আলো নিভে যায়। ঘড়িতে এখনই বেলা ৩-৩০।  

    আমরা আজই প্রায় ১১৫ কিমি পথ চলে জম্মু থেকে পৌঁছেছি পাটনিটপ। উচ্চতা প্রায় ২০২৪ মিটার। কাছাকাছি একটু হেঁটে আসব ভেবে আমরা সবাই বেড়িয়ে পড়লাম। পথ ধরে উঠতে থাকলাম আরও ওপরে। পাইনের সারি আমাদের দু’পাশে। অচেনা পাখি এদিক ওদিক উড়ে বেড়াচ্ছে। প্রতিটা মূহূর্তে আমরা যেন আনন্দ শুষে নিচ্ছি। দেখতে দেখতে ডানদিকে একটা পাহাড়কে রেখে আমরা এক তিন মাথার মোড়ে হাজির হলাম। পার্কের মতো ঘেরা একটা জায়গা। একটা গেট পেরিয়ে ঢুকে পড়লাম ভেতরে। চোখ জুড়িয়ে গেল। সামনের জায়গাটা প্রায় সমতল। পুরোটাই সবুজ ঘাসের গালিচা দিয়ে ঢাকা, মাঝে মাঝে অসংখ্য হলুদ ফুল সবুজ গালিচাতে নকশা সাজিয়ে তুলেছে। বাঁদিকে পাহাড়ের গা ধীরে ধীরে ঢালু হয়ে তলায় চলে গেছে। সেই পাহাড়ের ঢালে আধুনিক জীবনের সমস্ত উপকরণসহ একটা সবুজ কটেজ জায়গাটির সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে তুলেছে। রাস্তা থেকে ধাপে ধাপে সিঁড়ি নেমে গেছে কটেজগুলোর দিকে। সামনে এগিয়ে যেতেই পেলাম বুনো সবুজ রঙের কাঠের সাঁকো, অসংখ্য ফুল, চনমনে ঘোড়া ও তার মালিককে। ঘোড়ার মালিক আমাদের পাহাড়ের এক্কেবারে উপরে আপেল বাগান দেখিয়ে নিয়ে আসতে চায়। ওটাই ওদের পেশা। তবে এর মধ্যে সূর্য পশ্চিম আকাশে অনেকটা হেলে গেছে। ঠান্ডাটাও বেশ হাড় অবধি ছুঁয়ে যাচ্ছে। ফিরে এলাম। মোড়ের দোকানে গরম ডিমের ওমলেট ও দুধের চা এড়িয়ে যেতে পারলাম না। রাত্রে শোবার সময় লক্ষ লক্ষ জোনাকির মতো আলোয় ঢাকা পাহাড়ের গা দেখে রূপকথার দেশের মতো মনে হতে লাগল।

    পরদিন সকাল সকাল উঠে পড়েছি। আজকে একটু দূরে যাব। ড্রাইভার আমন ভাই সময়ের আগেই চলে এসেছে। তার কাছেই জানতে পারলাম শীতে এই লজ সহ সমস্ত জায়গা বরফের তলায় চাপা পড়ে যায়। আমন দেখাল, আমাদের গন্তব্য ওই সামনের পাহাড়টার পিছনের গায়ে, যেটাকে আমার গতরাত্রে রূপকথার দেশের মতো মনে হয়েছিল।

    আমাদের যাত্রা শুরু হল। পাটনিটপ ঘুরতে ঘুরতে চললাম নতুনের খোঁজে, সুন্দরের খোঁজে, আনন্দের খোঁজে। ঢালু হয়ে যাওয়া পেঁচানো রাস্তা, লম্বা লম্বা পাহাড়ি গাছ, ছোট বড় পাহাড়, বাহারি ফুল সব মিলিয়ে মনে হয় কেউ যেন অতি যত্ন করে সাজিয়ে তুলেছে এই ছোট্ট জনপদটিকে। বহুদিন ধরেই পাটনিটপ স্থানীয় বাসিন্দাদের সপ্তাহান্তিক ছুটি কাটাবার জায়গা। যাওয়ার পথে দেখে নিলাম নাগমন্দির। প্রায় ৬০০ বছরের পুরনো এই নাগমন্দির দেখে অনুমান করা যায় কতটা প্রাচীন এই জায়গা।

    পাটনিটপ ছাড়িয়ে অন্য এক পাহাড়ি পথ ধরা হল। রাস্তার চেহারা ক্রমশ সঙ্গিন হচ্ছে। এ পথ আরও নির্জন, সুনসান। মাঝে মাঝে আমরা অতিক্রম করে চলেছি কয়েকশো ভেড়া ও ছাগলের দল। দলপতি তথা মেষপালক তার পুরো পরিবারকেই সঙ্গে করে নিয়ে চলেছেন কোনও অজানা আস্তানার খোঁজে। তাদের সঙ্গে আছে কয়েকটি ঘোড়া। প্রতিটা দলে একটা করে পোষা কুকুরও রয়েছে। আমন ভাই বলল, ভাইসাব, এরা সব গোটা পরিবার নিয়ে যাযাবরের মতো জীবনযাপন করে। পাহাড়ের গায়ে যেখানে ভাল সবুজ  ঘাস পাবে, সেখানেই এরা ভেড়া, ছাগল নিয়ে ডেরা বাঁধবে। চাষবাস করবে। হঠাত্‌ আমাদের সামনে একটি ছাগল পা হড়কে পড়ে গেল পাহাড়ের ঢালে। পুরো দলটা দাঁড়িয়ে পড়ল। আমন বলল যতক্ষণ না ওই ছাগলটি আবার উঠে আসে ততক্ষণ এরা অপেক্ষা করবে। আমরা অবাক হলাম অবলা পশুদের এই সংহতি দেখে। যাযাবরদের থাকার জন্য পাহাড়ের গায়ে এদের বাড়িগুলিও বেশ। মাটির তৈরি। ছাদের উপর চাষের আয়োজন। প্রকৃতি, মানুষ, পশু, তাদের দৈনিক জীবনের কথা শুনতে শুনতে ও দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম সানাসার।

    এখানেও পর্যটক আছেন, তবে সামান্যই জনাকতক। থাকা-খাওয়ার হোটেল এবং লজও হাতে গোনা। সেগুলোর পাশ দিয়ে একটু এগোতেই চোখ জুড়িয়ে গেল। একটা বিশাল সবুজ ঘাসের গালিচা। তিনদিক থেকে ঢালু হয়ে মাঝখানে এসে মিশেছে। সেই মাঝখানে একটা মনমাতানো লেক। সানাসারের লেক দেখেই মন ভরে গেল। লেক ও তার সংলগ্ন জায়গার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এখানকার সম্পদ। আমরা ধীরে ধীরে লেকের দিকে চললাম। নামতে গিয়ে বুঝলাম লেকটাকে যত কাছে মনে করছিলাম তত কাছে নয়। লেকের ধারে কয়েকটি বসবার জায়গা। একদিকে আপেল বন, অন্যদিকে বিশাল সবুজ পশুচারণভূমি। এতটাই বিশাল যে চরতে থাকা কয়েকটি ঘোড়াকে দূর থেকে সবুজের মধ্যে কয়েকটি বিন্দুর মতো দেখাচ্ছিল। আমরা নিজেদের মতো করে জায়গাটাতে ঘুরলাম, প্রকৃতিকে কাছ থেকে অনুভব করলাম, ভালবাসলাম। পুরো লেকটাকে একবার ঘুরে দেখতে বেশ খানিকটা সময় লাগল। লেকের ধারে দু’দণ্ড নিরিবিলিতে বসবার লোভ সামলাতে পারলাম না। এখানে পাইন গাছের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলা বাতাসের এক সুন্দর সুরেলা আওয়াজ কানে আসে। প্রকৃতি ফিসফিসিয়ে কথা বলছে। ফিরতে মন চাইছে না।