Travelogue

বান্ধবগড়ের অন্দরে

অয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়

  • “পতা নেহি কিঁউ এক ভি তালাও মে নেহি মিলা… মিলনা চাহিয়ে থা। চলিয়ে আভি তো নিকালনে কা ওয়ক্ত ভি হো চুকা।’’  গাইড মুকেশজির কথাতেও হতাশার ছাপ স্পষ্ট । আমাদেরও অবস্থা প্রায় একই রকম । তিনটে সাফারির প্রথমটায় বাঘের দেখা পাইনি। দ্বিতীয়টাও শেষের মুখে। পাওনা বলতে সকালে মাগধি জোনে মহামান বিটের বাঘের গরগরানি আর তার অপেক্ষায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা। হাড়-কাঁপানো ঠান্ডা জানুয়ারির সকাল। ফলে নরম রোদে গাড়িতে বসে শালের পাতার ফাঁক দিয়ে আলোর ঢুকে পড়া আর লাল মাটির ওপর জমে থাকা কুয়াশা সরে গিয়ে চারাগাছেদের বেরিয়ে আসা দেখতে মন্দ লাগছিল না। তবে বিকেলের খিতৌলি জোনে সাফারিতে কিছু পাখি ছাড়া এ পর্যন্ত প্রাপ্তি বলতে বিস্তর ধুলো। যাই হোক, সময় শেষ হয়ে আসাতে আমরাও গাড়ি ঘুরিয়ে বেরোবার পথ ধরলাম। কিছুটা এগোতে সামনে আরও গাড়ির দেখা মিলতে লাগল। এবং হঠাৎই দেখলাম, খানিকটা দূরে পরপর কয়েকটা গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ল, চিতলের অ্যালার্ম কলও শুনলাম বার তিনেক। যথারীতি আমাদের গাড়ির গতিও অন্য গাড়িগুলোর মতোই বেড়ে যেতে সময় লাগল না। আর বাকি গাড়িগুলোর পিছু নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেখা পেলাম বেশ খানিকটা দূরে বড় বড় শালগাছের সামনে দাঁড়িয়ে আছে বাঘটা। গাইডদের পরস্পরকে অনুরোধ, আদেশ, ধমক আর ধন্যবাদসুচক শব্দের আদানপ্রদান সহ গাড়িগুলোর পারস্পরিক অবস্থান ঠিক করার ফাঁকেই বাঘটা বসে পড়ল। খানিকক্ষণ বসে থেকে উঠে জঙ্গলে ঢুকে পড়ল। কিন্তু গাড়ির ভিড় তখনও ওখানেই দাঁড়িয়ে। কারণ আরও একটা বাঘ বসে আছে একেবারে রাস্তার ধারেই। তবে ভিড় খালি হতে দেরি হল না, কারণ ঘড়ির কাঁটায় পাঁচটা চল্লিশ এবং খিতৌলি জোন থেকে বেরোবার জন্য সময় আছে আর মিনিট পাঁচেক। বলা বাহুল্য গাড়ি ছুটল রাস্তার স্বাস্থ্যের দিকে দৃকপাত না করে। ক্যামেরা আর নিজেকে একই সঙ্গে শকটচ্যুত হওয়া থেকে বাঁচানোর পাঁচ মিনিটের লড়াইটা মোটেও উপভোগ্য হল না। জঙ্গল থেকে বেরিয়ে ঝকঝকে পিচ রাস্তায় উঠে মুকেশজিকে জিজ্ঞেস করতে জানলাম এটা মহামান বিটের বাঘিনী আর তার ছানা। মহামান বিটটা মাগধি আর খিতৌলি দুটো জোনেই পড়ে।

    পরদিন সকালে টালা জোনে আমাদের শেষ সাফারি। গাইড কমলেশজি দেখলাম অত্যন্ত মিতবাক। জিজ্ঞেস না করলে কথা তো বলেনই না এবং সবসময় প্রশ্নের উত্তরও দেন না।মাঝবয়সি ভদ্রলোক টালার প্রধান ফটক দিয়ে ঢোকার পরেই প্রায় আদেশের সুরে ঘোষণা করলেন, প্রথম দেড় ঘন্টা আমরা বাঘ আর লেপার্ড খুঁজব। মিনমিন করে বললাম, পাখি আর অন্যান্য জীবজন্তুতেও আমরা সমান আগ্রহী। তাতে উত্তর এল, দেড় ঘন্টা পরে সেসব নিয়ে ভাবা যাবে। কারণ একটু রোদ না উঠলে পাখি বা অন্যান্য জীবজন্তুর দেখা পাওয়ার সম্ভাবনা কম। অকাট্য যুক্তি না হলেও তর্ক করে বিশেষ লাভ হবে না বুঝে ইতি টানলাম। রাস্তার ধারের নরম ধুলোর ওপর বাঘের থাবার ছাপ আর জঙ্গলের ভিতর থেকে একজোড়া বাঘের ডাক প্রায় একই সঙ্গে দেখলাম আর শুনলাম। খুব চাপা গলায় চালকের উদ্দেশে কোনও একটা তেমাথায় যাওয়ার আদেশ দিয়েই গাইড ভদ্রলোক আমাদের বললেন, “বিলকুল শান্ত্ রহনা”। তেমাথায় পৌঁছে মিনিট তিনেক অপেক্ষার পরেই আমাদের ডানদিকের শালের জঙ্গল আর ঘাসের মধ্যে থেকে একবার ময়ূর ডাকল আর তারপরেই একটি তন্বী বাঘিনী ধীরে সুস্থে রাস্তা পেরিয়ে পাশের পাহাড়ের দিকে চলে গেল। তার দর্শনের ঘোর কাটার আগেই দেখলাম আমরা আবার ছুটছি। ওরই মধ্যে জিজ্ঞেস করার জন্য গাইডের দিকে তাকাতেই উনি বললেন এই বাঘিনীটার নাম স্পটি, আর আমরা এখন যাচ্ছি এর পুরুষ সঙ্গী মাঙ্গুর দেখা পাওয়ার আশায়। কারণ এরা একই দিকে যাচ্ছে। একটু পরেই দেখলাম আমরা বাঘ দেখার ইঁদুর দৌড়ে ঢুকে পড়েছি। একসঙ্গে সাতটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে মাঙ্গুর দেখা পাওয়ার আশায় এবং তাদের ড্রাইভার আর গাইড প্রবল চেষ্টা করে চলেছেন দর্শনার্থীদের নিঃশব্দ রাখার। এরই মধ্যে গাছপালার ফাঁক দিয়ে ঘাস ঠেলে এগিয়ে আসা বাঘটা দেখা যাচ্ছে। রাস্তার কাছাকাছি এসে এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়িয়ে সম্মিলিত দর্শনার্থীদের একবার দেখে নিল।তারপর লেজ উঁচু করে রাস্তা পেরিয়ে আবার জঙ্গলে ঢুকে গেল। মাঙ্গু রীতিমতো বিপুল বাঘ। যদিও গাড়ির ভিড় থাকায় মাঙ্গুর ছবি পেলাম না। তবে দেখলাম মন ভরে।

    বান্ধবগড় নিয়ে কথা  হলে বাঘ যে বেশির ভাগ জায়গা দখল করে থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তবে বান্ধবগড়ে পাখির দেখাও মেলে প্রচুর। প্লেনস লাঙ্গুর, রেসাস ম্যাকাক, গাউর, সম্বর, বুনো শুয়োর আর অগুনতি চিতল তো দেখেছিই আর দু’দিন জঙ্গলে ঘুরে চোখে পড়েছে প্রায় পঞ্চাশ প্রজাতির পাখি। টনি বেলিড ব্যাবলার, পেন্টেড স্পারফাউল, জাঙ্গল আউলেট, থিক-বিল‌্ড ফ্লাওয়ারপেকার, টিকেলস ব্লু ফ্লাইক্যাচার, ইন্ডিয়ান রোলার, ব্ল্যাক রেডস্টার্ট, চেস্টনাট শোলডার্ড পেট্রোনিয়া, হোয়াইট ব্রাউড ফ্যানটেল ফ্লাইক্যাচার, ইন্ডিয়ান গ্রে হর্নবিল আর অসংখ্য ওয়ার্বলার প্রায় সারাক্ষণ চোখে পড়েছে। লেসার অ্যাডজুট্যান্ট স্টর্ক, ব্রাউন ফিশ আউল, হোয়াইট আইড বাজার্ড, রেড জাঙ্গল ফাউল আর লং বিল‌্ড ভালচারও দেখেছি বেশ কিছু। তবে গাড়িতে করে বাঘের খোঁজে ছুটে না বেড়ালে হয়তো পাখির সংখ্যা আরও বাড়ত। আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল বান্ধবগড়ে মধ্যপ্রদেশ ট্যুরিজমের হোয়াইট টাইগার ফরেস্ট লজে। আতিথেয়তা, খাওয়া আর থাকার ব্যাবস্থা এদের অত্যন্ত ভাল। আর লজের বিশাল কম্পাউন্ডের মধ্যে ঘোরাগুরি করলেই বিস্তর পাখির দেখা মেলে। সব মিলিয়ে  বান্ধবগড়ের অন্দরে কাটানো তিনটে দিন সত্যিই উপভোগ্য। 

    (ছবি লেখক)

You may like