Travelogue

রাত পোহাল রাজবাড়িতে

শ্যামল সান্যাল

  • রাজবাড়িতে ভোর হল বাঁশির সুরে। দরজা খুলে নরম আলোয় দেখা গেল মাথায় টুপি মাঝবয়সী এক মানুষ বাঁশিতে মগ্ন। শম্ভুচরণ একগাল হেসে বলে, সকাল-সন্ধ্যা এই বাড়িতেই বাজাই অনেক বছর। ইটাচুনার রাজবাড়িতে শম্ভুর আড়বাঁশিতে গানের সুর ছড়িয়ে পড়ে— ‘এই কথাটি মনে রেখো, আমি যে গান গেয়েছিলেম’। পুরো নাম শম্ভুচরণ দাস। নিবাস ছোট সরসা গ্রাম। তার পাশে রাখা ঝোলা থেকে বেরয় আরও ক’টা বাঁশি। অন্য আর একটা বাঁশিতে সুর তোলার আগে অদ্ভুত হেসে বলেন, ভাল লাগে, তাই বাজাই, মাসে কিছু আয় হয় এ বাড়ি থেকে। এই রাজবাড়ি ছাড়া আর কোথাও তাই সে কাজ করে না। এখানে এমন বাঁশি অপ্রত্যাশিতই ছিল, তবু মনে হল, যেন এই বাঁশির সুর শুনব বলেই আসা। দুয়ার হইতে দুই পা-ও নয়। কিন্তু শিশিরে ভেজার জন্য যথেষ্ট।

    হুগলির ইটাচুনায় প্রায় কুড়ি বিঘা জমির ওপরে আড়াইশো বছরের পুরনো এক রাজবাড়ি। কাছাকাছি রেল স্টেশনের নাম খন্যান। হাওড়া থেকে ঘন্টাখানেক। স্টেশন থেকে রাজবাড়ি হাঁটা পথে আধঘন্টা, অটো বা রিকশায় আরও কম সময় লাগবে। গাড়ি কি বাইকে শহর কলকাতা থেকে হেসে খেলে দু’ ঘন্টায় ইটাচুনা।

    কিছুদিন আগে ইজিপ্ট ঘুরে এসেছি। দূরে কোথাও এখনই যাব না। অথচ একটু না বেরলেই নয়। অতএব রাজবাড়ি। শুধু এখানে থাকতে চাই বলেই। এই ভবনের বর্তমান মালিকদের পূর্বপুরুষরা মহারাষ্ট্র থেকে এসেছিলেন বর্গির বেশে। পরে থিতু হন এখানে। এইটুকু জানা ছিল।

    বিশাল রাজবাড়ির একটা অংশই মাত্র পর্যটকদের জন্য খোলা। প্রাচীন স্থাপত্যের ছাপ গায়ে মেখে প্রায় তিনতলা এক ভবন। সামনে খোলা বাগান, ভেতরে প্রাচীনতা মাখা টানা লম্বা বারান্দা, দোতলার সিঁড়ি। তবে এ বাড়ি রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশের প্রাসাদগুলোর মতো অমন বিশাল নয়। আড়ম্বর জৌলুসের হাঁকডাক বাড়াবাড়ি নেই। টাইলস বা মোজাইক নেই। বারান্দা, ঘরের আসবাবও সেকালের। আরামকেদারা, বিলিতি ওয়াল ক্লক, দেওয়ালে রাজপরিবারের ছবির পাশে আধুনিক দৃষ্টিনন্দন শিল্পকর্ম।

    কড়িবরগার ছাদ, ঝাড়লণ্ঠনের আলোর নরম স্নিগ্ধ পরিবেশ। চড়া হ্যালোজেন, সিএফএল নয়। ইট-চুন-সুরকির গাঁথনির মোটা পুরু দেওয়াল টপকে প্রখর গ্রীষ্মেও গরম বাতাস ঢুকতে সাহস করে না। তবে ঘরে এসির ব্যবস্থা আছে, সুইচ টিপলেই শীতলতা। নিতান্ত ঘরোয়া পরিবেশ। কর্মীরা ধুতি বা শাড়ি পরেন। বাড়ির আত্মীয়-পরিজনের মতো করেই তাঁরা কথাবার্তা বলায় অভ্যস্ত, ঠাটবাট কেতার ব্যাপারই নেই।

    পুরনো লোহার ফটক পেরিয়ে ঢোকা গেল, বাঁয়ে ম্যানেজারের ঘর ছুঁয়ে সিংহদরজা। প্রথম মহলের বড় উঠোন টপকে আর-এক মহলের বড় দোতলায় আমাদের ঘরের জন্য সিঁড়ি ভেঙে ওঠার ব্যবস্থা। দেওয়ালে লেখা ‘খাইবার পাস’। যথার্থ। কারণ, এই সিঁড়ির ধাপ পেরিয়ে ওঠা বেশ পরিশ্রমের। লিফট নেই। ধাপের পর ধাপ পেরিয়ে টানা লম্বা বারান্দার শেষে আমাদের আস্তানার নাম ‘ঠাকুমার ঘর’। এই বাড়ির সব ঘরগুলোরই এরকম নাম— বড় পিসি, ছোট পিসি, বড়বৌদি, ছোড়দা।

    ঘরে ঢুকে দেখা গেল কাচের শার্সি লাগানো বিশাল জানালা দিয়ে মেঝেয় লুটোপুটি খাচ্ছে রোদ। চারপাশে অজস্র গাছগাছালি। পাখির ডাক। তারাও থেমে গেলে বিরাজ করে নৈঃশব্দ্য।

    বলে রাখা ভাল, ‘রাজবাড়ি’ নাম হলেও এটা রাজাদের প্রাসাদ কোনওকালেই ছিল না। সাধারণ গরিবদের গ্রামে এত বড় বাড়ি লোকমুখে রাজবাড়ি হিসেবেই পরিচিত হয়। আগেই বলেছি, এই সম্পত্তির মালিকরা এসেছিলেন মহারাষ্ট্র থেকে, অষ্টাদশ শতকে, নবাব আলিবর্দি খানের আমলে। ব্রিটিশরা সবে তখন পা রেখেছে এই হুগলিতে। বর্গি কুন্দনরা পাশেই আস্তানা গাড়েন, বর্গিগ্রাম নামে আজও তার অস্তিত্ব রয়েছে। কুন্দনরা হামলা ছেড়ে ইংরেজদের সঙ্গে বাণিজ্যে নেমে পড়েন। পদবি বদলে হন কুণ্ডু, শাক্ত ধর্মের উপাসনা ছেড়ে বৈষ্ণব হয়ে যান। আজও উত্তরপুরুষরা ব্যবসাই করেন। বাড়ির নাটমন্দিরে সন্ধ্যা-আরতি হয় রাধাকৃষ্ণের। কিছুক্ষণ উঠোনে দাঁড়িয়ে আরতি দেখছিলাম। ঘন্টা কাঁসর ধূপধুনো কীর্তনগান— সব মিলিয়ে অন্য আবহ।

    ১৭৬৬ সালে তৈরি এই বাড়িটি সামনে থেকে দেখে মনে হল পাশ্চাত্য ও ভারতীয় স্থাপত্যশৈলীর মিশেল। বিশাল খিলান স্তম্ভ। প্রধান ফটক রেলিং-এরও বয়স বাড়ির মতোই। লোহার গেট আর রেলিং-এ ব্রিটিশ ছাপ। ভেতরে নাটমন্দির, পুজোর দালান, ঘর, বারান্দা, থাম, সিঁড়ি, কড়িবরগার পেটাই ছাদ, টালির কাজগুলির সঙ্গে নানান নকশা সাবেক বঙ্গীয় স্থাপত্য-গঠন শিল্পের কথা মনে করায়। বড় কয়েকটা ঝাড়বাতি রয়েছে, রেড়ির তেলের প্রদীপের বদলে আজ অবশ্য বাল্ব জ্বলে।

    জানা গেল, বাড়ির পেছনের পুকুরে মাছ ধরার ব্যবস্থা আছে। সুযোগ ছা়ড়তে চাইলাম না। তবে বঁড়শিতে মাছ ধরার এলেম যে এই কলমচির নেই তা অল্প চেষ্টাতেই বুঝলাম। অতএব পুকুরের বাঁধানো সিঁড়িতে আড্ডায় বসা গেল। বাগানে নানারকম ফুল-ফলের গাছ। বেশ কিছুটা সময় কাটানো গেল। অত্বর। নির্ভার।

    দুপুরে খাবার টেবিলে কাঁসার ঝকঝকে থালা বাটি গ্লাস। পরিবেশক এক নবীন। ধুতি ফতুয়া পরা, গামছা কোমরে। গরম ভাত, ঘি, শুক্তো, বেগুনভাজা। ধোঁকার ডালনা, ছানার পাতুরি এবং আরও নানা পদ। শেষটুকু হল টম্যাটো জলপাই পাকা তেঁতুলের চাটনি, কাঁচাগোল্লা, চিনিপাতা দই। অতএব রন্ধনকর্তার খোঁজ নিতেই হল। কেষ্ট বাগ— এ বাড়িতে তিনি মামা বলেই পরিচিত, বললেন, এ বাড়ির গিন্নিমা হাতে ধরে যশোর খুলনার পদগুলো শিখিয়েছেন। গিন্নিমা হলেন রাজবাড়ির অন্যতম কর্ণধার ধ্রুবনারায়ণ কুণ্ডুর স্ত্রী, কিন্তু তাঁর নামটি জানা গেল না। সেটা নাকি তিনি আড়ালেই রাখতে চান।

    খাবার ঘরটা দেশীয় নানা হস্তশিল্পে সাজানো। আমার চোখ টানল সেসবের মাঝখানে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ছবিটা। তাঁর মতোই শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও আরও অনেক কবি-সাহিত্যিক-চিত্রকরদের আনাগোনা ছিল এই বাড়িতে। খাওয়া সেরে বাইরে বেরিয়ে দেখি অ্যান্টিক দেওয়াল ঘড়িতে বাজে প্রায় দুটো।

    বিকালে বাড়ির সামনের বরুণ ঘোষের ছোট্ট দোকানে চা সিঙ্গারা নিমকি খাবার সময়ে মিষ্টির ভিয়েন বসেছে দেখে নিলাম। এঁরই হাতে তৈরি মিষ্টান্ন দুপুরে আমাদের পাতে পড়েছিল।

    পরদিন ভোরে পায়ে হেঁটে গ্রামটা ঘুরে দেখতে বেরলাম। ঘোষপাড়া, দক্ষিণপাড়া, বড় সরসা, হালুসাই পাশাপাশি এক-একটি গ্রাম। ধানের গোলা, শিশিরে ভেজা আনাজখেত, গোয়ালে জাবর কাটতে থাকা উদাসীন গাইবাছুর। লাঙ্গলের পাশে ট্রাক্টর, সাইকেলের পাশে বাইক। ইস্কুলমুখী ছোট ছেলেমেয়েরা। কাঁধে ব্যাগ। দোকানে সবে চা বসেছে। এক কাপ চা হাতে নিলে এলাকার মানুষদের সঙ্গে গল্পটা জমে ভাল। তবে, কথা বলতে গিয়ে বোঝা যায়, বিষণ্ণতাই যেন ছেয়ে আছে চারিদিক। চাষবাসে আর চলে না। কাজকর্মও তেমন নেই। দিনকাল বড় খারাপ। একটু কথা ঘোরানোর চেষ্টা করি। ভাল খেজুরগুড়? না, না, সে কোথায় পাবেন আর? নিয়মরক্ষের মতো ‘পোষসংকেন্তি’র দিনে তবু কিছু পিঠেপুলি হয়। এই মাত্র। ফিরতি পথে দেখি দেওয়ালে সাঁটা রাজনৈতিক পোস্টার। এই সব মানুষের ক্ষোভ থেকে, বা বলা ভাল, ক্ষোভ কাজে লাগিয়েই সেগুলোর সৃষ্টি।

    বেলা বাড়ে। হংসেশ্বরী মন্দির আর ত্রিবেণীর ঘাট বেশি দূরে নয়। অটোঅলাকে বলা আছে। পায়ে পায়ে রাজবাড়ির দিকে ফিরে চলি।

    (ছবি-সোহম সান্যাল)

You may like