Home >> Story >> পোস্ত

Film Review

পোস্ত

  • পরিচালনা: নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়

    অভিনয়: সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, লিলি চক্রবর্তী, যিশু সেনগুপ্ত, মিমি চক্রবর্তী, অর্ঘ্য বসু রায় প্রমুখ

    শান্তিনিকেতন, রবীন্দ্রসংগীত, মধ্যবিত্ত বাঙালি আবেগ, মদ্যপানের কুপ্রভাব ও ভালবাসা— মূলত এই বিষয়গুলিকে প্রাধান্য দিয়েই নির্মিত হয়েছে শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায়ের সাম্প্রতিক নিবেদন ‘পোস্ত’। দাদু-ঠাকুরমা-মা-বাবা-কে নিয়ে সাত বছরের পোস্তর মজার দুনিয়ার কথা দর্শকের সামনে মেলে ধরেছেন পরিচালকদ্বয়। কর্মসূত্রে ব্যস্ত অর্ণব (যিশু) ও সুস্মিতা (মিমি) কলকাতায় থাকে। তাদের ছেলে পোস্ত (অর্ঘ্য) জন্মের পর থেকে অর্ণবের বাবা-মায়ের ( সৌমিত্র-লিলি) কাছে শান্তিনিকেতনে বেড়ে ওঠে। প্রত্যেক সপ্তাহন্তে অণর্ব ওরফে অণু ও সুস্মিতা পৌঁছে যায় ছেলের কাছে। স্কুলের পড়াশোনা, ক্রিকেট, গান, ছবি আঁকা সব নিয়ে দাদু-ঠাকুরমার সঙ্গে মজায় দিন কাটছিল পোস্ত-র। কিন্তু ছ’বার চাকরিতে ইস্তফা দেওয়া অণু হঠাৎ বিদেশে রেস্তরাঁর ব্যবসা করার প্রস্তাব পায়। স্ত্রী-পুত্রকে নিয়ে বিদেশে পাকাপাকিভাবে থাকার পরিকল্পনা পিতাকে জানাতেই বেঁকে বসেন তিনি। পোস্তকে ছাড়তে নারাজ তিনি। নাতির অভিভাবকত্ব নিয়ে ছেলের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন তিনি। শেষমেশ ছোট্ট পোস্তর কী হয়? সে নিজে কার কাছে থাকতে চায়? এই প্রশ্ন নিয়েই এগিয়েছে ছবিটি।

    বর্তমান সমাজের বাস্তব ছবি তুলে ধরেছে ছবিটি। কর্মজগতে ব্যস্ত মা-বাবা বেশি সময় দিতে পারেন না সন্তানকে। বাধ্য হয়ে সন্তান লালনপালনের জন্য ভরসা করতে হয় সন্তানের দাদু-ঠাকুরমা-দিদার কাছে ও তাঁদের অনুপস্থিতিতে আছে আয়া কিংবা ক্রেশ। এটা চিরন্তন সত্য যে, স্নেহ সবসময় নিম্নগামী, তাই যে-কোনও পৌঢ় ব্যক্তির নিজের সন্তানের চেয়ে তার পরের প্রজন্মের প্রতি দরদ বা ভালবাসা দুই-ই বেশি থাকে। কিন্তু তার মানে কি তিনি সেই শিশুর অভিভাবকত্বের পূর্ণ অধিকার লাভ করবেন! ‘পোস্ত’ ছবিটি দেখতে বসে এমনই কঠিন প্রশ্নের সম্মুখীন হন দর্শক। শিবপ্রসাদ-নন্দিতা জুটি চিরকালই দর্শককে সমাজ সচেতনমূলক ছবি উপহার দিয়ে এসেছেন। যে-সময়ে বাংলা ছবি দক্ষিণ ভারতীয় ছবির রিমেক নির্মাণ করে সাফল্যের ঢাক বাজাচ্ছে, সে-সময় মৌলিক গল্প নিয়ে নির্মিত এই জুটির ছবি সত্যি টাটকা অক্সিজেন-এর মতো। বাঙালি আবেগে টইটুম্বর ছবিগুলি দর্শকদের মনোগ্রাহী হবে এ জানা কথা, কিন্তু ছবিগুলির বিশ্বাসযোগ্যতা কতটা? নাতির অধিকার নিয়ে সত্যিই কি একজন দাদু আদালত অবধি ছুটতে পারেন, তাও নিজের আত্মজের বিরুদ্ধে? আর এই কথা যদি সত্যি হয় তা হলে ছবির মধ্যে বলা আইনজীবী সোহিনী সেনগুপ্তের সংলাপ ‘তা হলে তো বাবা-মায়েরা দাদু-ঠাকুরমার কাছে সন্তানকে রাখতে ভয় পাবেন!’ সত্যি প্রমাণিত হবে।

    চিত্রনাট্য, সংগীত (অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় ও অনুপম রায়), সংলাপ সব মিলিয়ে ছবিটি একটি নিটোল নির্মাণ। আর ছবির শিল্পীরা এককথায় অতুলনীয়। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, লিলি চক্রবর্তী, পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা যিশু সেনগুপ্তর সম্বন্ধে আলাদা করে বলার কিছু নেই। তাঁরা নিজেদের সেরাটাই দিয়েছেন। তবে এ ছবির বড় প্রাপ্তি মিমি চক্রবর্তী। তিনি কেরিয়ার শুরু করেছিলেন ‘গানের ওপারে’ ধারাবাহিক দিয়ে, তারপর যেন হারিয়ে গিয়েছিলেন পুরদস্তুর বাণিজ্যিক ছবির ভিড়ে। আবার এই ছবিতে অভিনেতা মিমিকে পাওয়া গেল। সোহিনীর উপস্থিতি শুধুমাত্র আদালতেই সীমাবদ্ধ। তার সংলাপ পরিবেশন বেশ কিছু স্থানে মনে করিয়ে দিচ্ছিল যে, তিনি চলচ্চিত্র শিল্পীর চেয়ে অনেক বেশি সফল নাট্যশিল্পী। আর যার কথা না বললে এই ‘পোস্ত’ বিস্বাদ থেকে যাবে, সে হল অর্ঘ্য। তার চঞ্চল উপস্থিতি দিয়ে সে গোটা ছবিটিকে মাতিয়ে রেখেছে।