Travelogue

পঞ্চমুখে পেঞ্চ প্রশস্তি

সুস্মিতা নাথ

  • পেঞ্চ একটা নদীর নাম। মহারাষ্ট্র আর মধ্যপ্রদেশের সীমানায়  বিশাল এক অরণ্যকে একপ্রকার জিইয়ে রেখেছে এই নদী। বিশাল সে জঙ্গল, দুটো রাজ্যে ছড়ানো। তার নামও পেঞ্চ। ন্যাশনাল পার্ক এবং ব্যাঘ্র প্রকল্প, দুই তরফেই এই জঙ্গলের বিভিন্ন অংশ সংরক্ষিত। দুটো রাজ্যে শরীর ছড়িয়ে দেওয়া পেঞ্চ ব্যাঘ্র প্রকল্পের যেটুকু শুধুমাত্র মধ্যপ্রদেশের সীমানায় রয়েছে তার কোর এরিয়ার আয়তনই ৪১১ বর্গ কিলোমিটার। বাফার জোন ধরলে মোট ১১৮০ বর্গ কিলোমিটার। কোর হল জঙ্গলের কেন্দ্রবর্তী কঠোরভাবে সংরক্ষিত এলাকা। একে ঘিরে থাকে বাফার জোন, যেখানে পর্যটকদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। অন্যদিকে মহারাষ্ট্রে এর আয়তন প্রায় ৭৪০ বর্গ কিলোমিটার। 

    রুডিয়ার্ড কিপলিং-এর মোগলির ডেরা ছিল এই পেঞ্চ!  প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, অসংখ্য প্রজাতির গাছ ও প্রাণীর বাসস্থান হিসেবে এই অরণ্যের খ্যাতি বহু যুগ আগে থেকেই। ‘আইন-ই-আকবরি’-তেও নাকি এর উল্লেখ আছে। পরে বহু পর্যটক এর সম্পর্কে লিখেছেন।

    জঙ্গল সংলগ্ন এক রিসর্টে উঠেছিলাম আমরা। প্রকৃতিকে পুঁজি করে অপূর্ব শিল্পভাবনা ও আধুনিক বিলাসবহুল ব্যবস্থার নমুনা এই রিসর্ট। বেশ মন ভরে যায়। জঙ্গলে ঘোরার আনুষঙ্গিক খরচও আমাদের প্যাকেজে ধরা ছিল। অতএব এরপর বাদবাকি দায়িত্ব তারাই পালন করবে।  পরের দিন ভোরেই বেরিয়ে পড়লাম জঙ্গলে। ভোরে নাকি বাঘ দর্শন নিশ্চিত। পতি-পুত্র বাঘ দেখতে সাংঘাতিক উৎসাহী হলেও হুডখোলা, সুরক্ষা ব্যবস্থাহীন গাড়িতে চেপে বাঘবাবাজির দর্শন পেতে আমার একটুও আগ্রহ ছিল না। পৌষ সংক্রান্তির ভোরের হিম ঠান্ডা, নাকি ভয়, কিসে কাঁপুনি আসছিল ধরা গেল না।

    শীতপোশাকে নিজেকে যথাসাধ্য মুড়ে নিয়েও হুডখোলা গাড়িতে বসে ঠক ঠক করে কাঁপছি। তখনই পেছন থেকে একটা কম্বল এগিয়ে দিলেন একজন। বেশ অবাক হয়ে দেখি, অতিথিদের জন্যে এই ব্যবস্থাটুকু করে রেখেছে রিসর্টেরই কর্তৃপক্ষ। হয়তো এর মূলে আছে বাণিজ্যিক পেশাদারিত্ব, তবু ছোট ছোট বিষয়গুলো মন ছুঁয়ে যায় বইকি।

    বিশাল আয়তনের জন্যেই মধ্যপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্র দু’দিক থেকেই মূল জঙ্গলের অনেকগুলো প্রবেশদ্বার রয়েছে— তুড়িয়া, করমাঝিরি, গুমতারা, খুরসাপার, সিলারি ইত্যাদি। নাগপুর থেকে মধ্যপ্রদেশের সিওনি জেলা হয়ে পেঞ্চ বেড়ানো সবচেয়ে সহজ এবং ওই পথটাই বেশি জনপ্রিয়। বর্ষার তিন মাস ছাড়া অক্টোবর থেকে জুন পর্যন্ত পর্যটকদের জন্যে জঙ্গল খোলা থাকলেও এ অঞ্চলে গ্রীষ্মের প্রখর দাবদাহ এড়াতে জঙ্গল সাফারির জন্যে আদর্শ সময় নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি। 

     ঘড়িতে তখন ছ’টা বাজলেও আকাশে কৃষ্ণা দ্বিতীয়ার উজ্জ্বল চাঁদ, দিগন্ত জুড়ে জমাটবাঁধা অন্ধকার, নীরব নিঝুম চরাচরে হঠাৎ জেগে ওঠা পাখিদের কলকাকলি, অদ্ভুত মায়াময় পরিবেশ। দু’পাশে জঙ্গল রেখে মেঠোপথ ধরে এগিয়ে চলেছি। সুখী বাঁদর পরিবার, হরিণের দল, ছুটে যাওয়া বন্য শূকর, উদাস নীলগাই, লাজুক শম্বর, ব্যস্ত ময়ূরের ঝাঁক দেখে বিভোর হচ্ছি, এরই মাঝে চাঁদ কখন ভোরের সূর্যকে দায়িত্ব বুঝিয়ে বিদায় নিয়েছে খেয়ালই করিনি।   

    সেগুন, শাল, বট, বাঁশ, খয়ের ও অগুনতি নাম-না-জানা গাছের ফাঁক দিয়ে যখন অরণ্যের বুকে ছড়িয়ে পড়ল তরল সোনারোদ, সে এক স্বর্গীয় দৃশ্য। এ যেন অন্য পৃথিবী। যেন কালো পর্দা সরিয়ে হঠাৎ উদ্ভাসিত প্রকৃতির মঞ্চসজ্জা। কুশীলবরা প্রস্তুত। এখনই শুরু হয়ে যাবে পালাগান। সে পালায় আজ আমিও আছি, তবে দর্শকাসনে।

    অদূরেই সূর্যালোকে ঝকঝক করে ওঠা মার্বেলসাদা, মসৃণ এক গাছের দিকে ইঙ্গিত করে গাইড বললেন, ওই দেখুন ম্যাম, ওটা ঘোস্ট-ট্রি।

    ঘোস্ট-ট্রি? ভূতুড়ে গাছ! শুনলাম ভূতবৃত্তান্ত। এক-এক ঋতুতে এ গাছের ছাল রং পাল্টে পাল্টে কখনও হয় গোলাপি, কখনও সাদা, বা সবুজ। এখন এর রং ফটফটে সাদা। প্রায়ান্ধকার বনে তার সাদা শরীর যখন দৃষ্টিগোচর হয়, তখন তার উপমা চলে কঙ্কালসার ভূতশরীরের সঙ্গে। সেজন্যেই ঘোস্ট-ট্রি।  সত্যি, কত বিস্ময় প্রকৃতিতে!

    চলতে চলতে হঠাৎ থেমে গেল গাড়ি। রাস্তায় টাটকা থাবার ছাপ। ছানা-সহ বাঘিনীর চলার চিহ্ন। সেটাই অনুসরণ করে এগিয়ে গেলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্য, ঈপ্সিতের দর্শন মিলল না। আর-এক অভিযাত্রীদল জানাল, একটু আগেই বাঘিনী স্থানত্যাগ করেছে। অগত্যা পথ পাল্টে ফিরে আসছি,  তখনই একটা ডাক শুনে সতর্ক হয়ে উঠলেন সঙ্গী তিনজন। আবারও প্রতীক্ষা শুরু। তবে এবারে বিমুখ হতে হল না। বাঘমামা/মামি না হলেও দেখা দিলেন তাঁর মাসতুতো ভাই লেপার্ড। সেও অতিকায় চেহারার, রাজকীয় এবং অপরূপ। আতঙ্কে, আনন্দে, মুগ্ধতা, বিহ্বলতায় হাতের ক্যমেরা হাতেই ধরা রইল, ক্লিক করতে ভুলে গেলাম।  

    তবে, অজস্র পাখির দেখা পেলাম। নীলকণ্ঠ, মৌবাজ, তিলেবাজ, পেঁচা, সোনাজঙ্ঘা, টিয়া, ফুলটুসি, র‍্যাকেট-টেল ড্রঙ্গো বা ভীমরাজ—  তালিকা অন্তহীন।  

    রিসর্টের তরফে আমাদের সঙ্গ দিচ্ছিলেন বন্যজীবনকে নিবিড় ভাবে চেনে, এমনই অভিজ্ঞ একজন প্রকৃতিবিদ, একজন দক্ষ গাইড, এবং অবশ্যই গাড়ির চালক, যিনি অভিজ্ঞতায় কম যান না।  পশু-পাখি থেকে শুরু করে গাছ-গাছালি সম্পর্কে তাঁদের জ্ঞান, পড়াশোনা এবং মমত্ববোধ দেখে মুগ্ধ হয়েছি। সমৃদ্ধও হয়েছি। প্রায় ছ’ঘন্টার সফর সেরেও তাই মন বলছিল আরও কিছুক্ষণ থেকে যাই এই সভ্য বুনোদের মাঝে। নিঝুম প্রকৃতির মাঝে,  নেট ও নেটওয়ার্কহীন জঙ্গলে দিন দুয়েকের আস্তানা গেড়ে যে স্মৃতি নিয়ে ফিরলাম, সে যেন বুনো বাতাসের মতোই সজীব ও মোহময়।

    ছবি: সৌম্যদীপ নাথ  

You may like