Home >> Story >> বাঘ

Anu Galpo

বাঘ

অভিজিৎ রায়

  • দরজায় জোরালো আওয়াজে ঢুলুনিটা চটে গেল শিশিরের। গলা শুকিয়ে গেছে। স্বপ্ন দেখছিল। সবিতার হাত থেকে এক গ্লাস জল নিয়ে খেল আর সারা গায়ে ভয়ঙ্কর জ্বলুনি।  হলুদ হয়ে যাচ্ছে তার সমস্ত গা, চামড়া ফেটে গিয়ে বেরিয়ে আসছে কালো কালো সব ফাটল। বিশ্রি গন্ধে ভরে যাচ্ছে ঘরদোর। যত কাতরাচ্ছে ততই হাসছে সবিতা। বাপ রে!

    একটু থম মেরে রইল শিশির। কতকাল হয়ে গেল সবিতার বিয়ে হয়ে গেছে। গায়ের গন্ধও ভুলে গেছে শিশির। এখনও তাকে স্বপ্নে দেখতে হবে? খুব খিঁচড়ানো মেজাজে দরজার দিকে তাকাল শিশির, বাইরে অন্ধকার  হয়ে আসছে। ফারাক্কার দিক থেকে গঙ্গার বাতাস বইছে অল্প অল্প।

    দরজায় দাঁড়িয়ে আছে একটা মেয়ে।

    এমনিতে শিশিরের কাজ মিটিয়ে ফিরতে সন্ধে গড়িয়ে যায়।  একটা বড় সাইটের কাজ মিটিয়ে দিন পাঁচেক বাদে আজ সে একটু তাড়াতাড়ি ওয়ার্কার্সদের মেসে ফিরে এসেছিল। ক্লান্তিতে ঘুমিয়েই পড়েছিল নিরিবিলি পেয়ে। এতক্ষণে ভেতরের ঘরে তাসের আড্ডা বসে গেছে। গন্ধ বেরচ্ছে মদের। মেসের রাঁধুনি রসুন পেঁয়াজ কষে রান্না বসিয়েছে। মেয়েটাকে দেখে শিশিরের আবার গা জ্বালা করে উঠল।

    ‘কী রে, কী ব্যাপার? কী চাই এখানে?’

    —‘মা পাঠালে বাবু।’ মেয়েটা এক পা ঢুকে এল দরজাটা ছেড়ে। বছর চোদ্দ-পনেরো বয়স হবে। খোলা চুলে ঘেরা ঢলঢলে মুখ। চিকন ঠোঁট। —‘বইলল, যা, যদি বাবুদের কুনও কাজ লাগে কর‌্যে দিবি। আসার সময় শ’ খানেক টাকা চেইয়ে লিস না কেনে। চাল আর ওষুধ লাইগবে।’

    বাইরের আলোটুকু ঘরে এসে অন্ধকার হয়ে গেছে। গায়ে প্রচণ্ড জ্বলুনি টের পাচ্ছে শিশির। চড়চড় করে ফেটে যাচ্ছে তার হলুদ চামড়া। বেরিয়ে আসছে কালো কালো গভীর ফাটল। বিকট ভোঁটকা গন্ধ নাকে আসছে। গা গুলিয়ে উঠছে শিশিরের। ‘তোর মা এল না কেন?’ শুকনো গলায় জিজ্ঞেস করল শিশির। নিজের গলাটা নিজের কাছেই হাঁড়িচাপা আওয়াজের মতো শোনাচ্ছে। বড় গলার একটা জামা পড়ে আছে মেয়েটা। বাঁ দিকের কাঁধের নিচ থেকে বুক পর্যন্ত ছেঁড়া।  এই অন্ধকারেও একদলা তুলতুলে আগুনের মতো জ্বলছে সেটুকু। জঙ্গলে ঢুকে পড়েছে শিশির। ওর চোখ দুটোও কি জ্বলতে শুরু করেছে? মেয়েটা কেমন ভয় পাওয়া গলায় থেমে থেমে বলল, ‘মা তো বুড়া। কী কাজে লাইগবে আপনাদের?’ এক পা এগিয়ে গেল শিশির। বাঘের চলাফেরা খুব শব্দহীন। শিকারের চোখে বাঘ চোখ রাখলে শিকার নাকি নড়তে চড়তে পারে না। ভীষণ জলতেষ্টা পাচ্ছে শিশিরের। মেয়েটার হাত থেকে জল নিয়ে খেলে কেমন হয়? অমন তুলতুলে শরীর বাঘের একটা থাবায় চটকে গলে পিষে যেতে পারে। অন্ধকারে মেয়েটার মুখ দেখা যাচ্ছে না।

    মেয়েটার চুল থেকে একটা হালকা গন্ধ পাচ্ছে শিশির। গন্ধটা খুব চেনা। নিঝুম দুপুরে একতলার ঘরে সবিতা কাপড় টেনে নিয়ে বুক ঢাকতে ঢাকতে খিল খিল করে হেসেছিল।

    —‘তোমার এইটুকুও সাহস নেই, শিশিরদা! ভেবেছিলাম বাঘ। দেখছি বেড়াল।’

    নাহ্। এক্ষুনি এই জঙ্গল থেকে পালাতে হবে শিশিরকে। প্রায় ছুটে গিয়ে ঘরের আলোটা জ্বেলে দিল শিশির। মানিব্যাগ থেকে পাঁচশো টাকার একটা নোট বের করে বাড়িয়ে ধরল মেয়েটার দিকে। চোখ নিচু রেখেই।

    ‘কী কইরতে হবে বাবু’— কাঁপা হাতে নোটটা নিয়ে কাঁপা গলাতেই জানতে চাইল মেয়েটা।

    পাশের ঘর থেকে এক দমক হুল্লোড়ের হাসি ভেজানো দরজাটা পেরিয়ে এ ঘরে আসতেই চাপা গলায় চেঁচিয়ে উঠল শিশির, ‘যা এখান থেকে। আর কোনওদিন যেন তোকে না দেখি এখানে। যা বলছি।’ মেয়েটার দিকে আর ঘুরে তাকাল না সে। মদের গন্ধে তাকে এখন এই মেয়েটার শরীরের গন্ধ ভুলতে হবে। কিন্তু ভেজানো দরজাটা খুলতে গিয়েও থমকে গেল শিশির।

    দরজাটার ওপারেও জঙ্গল।

    অঙ্কন: প্রসেনজিৎ নাথ

You may like