Anu Galpo

জগদীশ দাদু

দীপক দাস

  • ঝাঁটাকাঠিটা মোক্ষম জায়গায় গুঁজে দেওয়া। কাজটা যারপরনাই নিষ্ঠুর। তারপর ছোট্ট একটা টুসকি। পোকাটা ফড়ফড়িয়ে উড়ে পালাতে চাইত।

    তার ওই প্রাণপণ ডানা কাঁপানোটাই ছিল আমাদের আমোদ। হাওয়া পোকা বলতুম। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ডানার সে হাওয়া দীর্ঘশ্বাসের থেকেও কম জোরাল। তবুও কাঠিবিদ্ধ হাতপাখা হাত ফেরতা হত। তখন ফাইভ বা সিক্স। ছুটির দিনে একটা পোকা মানে মিনিট কুড়ির ক্যান্ডি ক্র্যাশ।

    এসব মনে পড়ছিল জগদীশদাদুকে দেখে। অনেকদিন বাদে পাড়ায় ফিরেছি। সেদিন হালদারদের তুলসীমঞ্চে আড্ডা মারছিলাম। দেখি, দাদু। হন্তদন্ত।

    ‘জগদীশদাদু! কেমন আছ?’

    তেড়েমেড়ে বুড়ো খিস্তি দিয়ে বলল, ‘মরছি নিজের জ্বালায়। ইনি এলেন পেছনে লাগতে!’ দাদু দ্রুত চলে গেল।

    একটু অবাক হইনি তা নয়। ছোটবেলা থেকেই জগদীশদাদু বলি! ওটা যদিও আসল নাম নয়। হাওয়া পোকা নিয়ে আমাদের নিষ্ঠুর আমোদ দেখে দাদু একদিন রেগে বলেছিল, ‘প্রাণ দিতে পারো না, প্রাণ নিচ্ছ কেন?’ তখন সবকিছু হেসে উড়িয়ে দেওয়ার বয়স। হেসেই বলেছিলাম, ‘প্রাণ নিচ্ছি না। হাওয়া খাচ্ছি, জগদীশদাদু।’ ক্লাসের পাঠে সদ্য পড়েছি জগদীশচন্দ্র উদ্ভিদের প্রাণ নিয়ে ভাবিত ছিলেন। সেদিন দাদু হো হো করে হেসে বলেছিল, ‘জগদীশদাদু? বেশ নাম।’

    আজ রাগল কেন? অমর বলল, ‘দাদু হেব্বি কেস খেয়েছে।’

    ‘কেস মানে পুরো স্যুটকেস।’ তারকের হাসিতে শয়তানি।

    আমি চুপ। অমর বলল, ‘দাদু বাবা হতে চলেছে।’ বুঝলাম, কিছু একটা রসাল বিষয় বাজারে ছড়িয়েছে। ঠাকুমা, মানে জগদীশদাদুর স্ত্রী অনেকদিন গত হয়েছেন। অবৈধ সম্পর্ক ছাড়া দাদুর বাবা হওয়ার চান্স নেই!

    কিছুক্ষণ চুপ থেকে সুতো ছাড়ে অমর, ‘চাঁপাপিসি রে! দাদুকে দেখাশোনা করত। দাদুও এক ফাঁকে পিসিকে দেখে নিয়েছে। এখন দুই বাড়িতেই হেবি বাওয়াল।’

    চাঁপা পাড়াতুতো পিসি। স্বামী পরিত্যক্তা। রোগাভোগা, চিরুনি কম পড়া চুল, বেশবাস ঢিলেঢালা। লোকের বাড়ি কাজ করে। কথা বললেই বোঝা যায়, মাথার একটা অংশে জন্মের সময়েই হাওয়া ঢুকে গিয়েছে। স্বামী ভদ্রলোকটি এক সন্তান-সহ পিসিকে বাপের বাড়িতে রেখে উধাও হয়ে যায়।

    জগদীশদাদু সরকারি চাকুরে ছিলেন। ছেলে বেঙ্গালুরুতে। বড় চাকরি। মেয়ের ভাল জায়গায় বিয়ে হয়েছে। দাদুর অর্ধেক বয়সি পিসির সঙ্গে যৌন সম্পর্কের কথা কেউ স্বপ্নেও ভাববে না!

    অমর বলল, ‘সামনের হপ্তায় দাদুর ছেলে বেঙ্গালুরু থেকে আসছে। তার আগে মেয়ে খুব ঝামেলা করেছে। চাঁপাপিসির বৌমা বলেছে, ও পাপ না খসালে বাড়ি থেকে দূর করে দেবে। দাদু কিন্তু রাজি নয়। প্রস্তাব দিয়েছে, সব সম্পত্তি ভাইবোনের নামে লিখে দেবে। যে আসছে তাকে আসতে দেওয়া হোক।’ বুঝলাম, সামাজিক সম্মান, সম্পত্তির অধিকার-সহ নানা হিসেবনিকেশে আগত সন্তানের মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হয়ে গিয়েছে।

    সেদিন বন্ধুর বাড়িতে নোটস আনতে যাচ্ছিলাম। মাকড়দহ বাজারে দেখি, দাদু ফল কিনছে। অভ্যাসে ডেকে ফেলেছিলাম, ‘জগদীশদাদু, তুমি এখানে?’ দাদু ম্লান হেসে বলল, ‘ওই নামে আর ডাকিস না। একটা প্রাণ বাঁচাতেই পারলাম না। ওরা সবাই মিলে খুন করে দিল।’ কিছুক্ষণ চুপ। আবার দাদু বলল, ‘দোষটা তোদের ঠাকুমার নয়— ও, তোরা তো পিসি বলিস। —একা থাকতাম। মেয়ে শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে যেতে রাজি ছিল না। ছেলেকে বলেছিলাম, সব বেচে দিয়ে তোর কাছে থাকি। সম্ভবত বৌমা রাজি হয়নি। চাঁপাই সারাদিন দেখাশোনা করত। একটা অধিকারবোধ তৈরি হয়ে গিয়েছিল আমার উপর। আমার জেগেছিল শরীর। ভুল হয়ে গেল।’

    কথার মাঝেই দাদু হঠাৎ বলল, ‘চলি রে, মেয়েটা একা আছে। এখন অসুস্থ হয়ে পড়েছে।’

    —তোমার মেয়ে এখানে থাকে?

    —ধুর। সব সম্পর্ক চুকে গিয়েছে। সম্পত্তি দুই ভাইবোনকে দিয়ে চাঁপাকে নিয়ে পালিয়ে এসেছি। পেনশনের টাকায় চলে যায়। বিয়ে করেছি রে চাঁপাকে।

    অঙ্কন: শুভম দে সরকার

You may like