Travelogue

মুক্তিনাথের পথে...

জয়তী অধিকারী

  • মুক্তিনাথ দর্শনে নাকি মুক্তি মেলে। বলেছিলেন জেঠু। আমার প্রশ্ন ছিল, “ওখানে গেলে কি পাখিদের মতো ডানা গজায়? আকাশে উড়ে যাওয়া যায়?” জেঠু হেসে বলেছিলেন, “বড় হলে বুঝবে, মোহমুক্তিই হল আসল মুক্তি।” এখন তার অর্থ বুঝি। তবে মুক্তিলাভের আশায় নয়, নিতান্তই নেপালের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টানে ছুটে গিয়েছিলাম পোখরা, জমসম, কাগবেণি পেরিয়ে মুক্তিনাথের চরণতলে।

    পোখরা এয়ারপোর্ট থেকে সকাল সাড়ে-ছটার ফ্লাইটে কুড়ি মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম জমসম। সেখান থেকে দু’দিনের কড়ারে একটি স্করপিও গাড়িতে আমরা চারজন দু’টি ক্লাস-থ্রি কন্যাকে নিয়ে রওনা দিলাম মুক্তিনাথ-এর উদ্দেশে। জমসম থেকে বেরিয়ে কিছুটা দূরে যেতেই প্রথম দেখা কালিগন্ডকি নদীর সঙ্গে। পৃথিবীর গভীরতম গিরিখাতের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলা এই নদীতেই নাকি পাওয়া যায় শালগ্রাম শিলা, যা নারায়ণ-জ্ঞানে পূজিত হয় সমগ্র ভারতবর্ষে। নদীটি দক্ষিণ নেপালে ‘নারায়ণী’ নামে পরিচিত। কালো রঙের পাথরের প্রাচুর্যের জন্য নদীর জল কৃষ্ণবর্ণ, তাই হিন্দিতে কালিগন্ডকি অর্থাৎ কালো গন্ডকি।

    নদী পেরিয়ে বোল্ডারময় পথ ধরে ঝাঁকুনি খেতে খেতে এগিয়ে চলার মাঝেই দূরে পাহাড়ের গায়ে রঙের বৈচিত্রে মন হারিয়ে যেতে থাকে। যে কোনও প্রকৃতিপ্রেমীকেই এই ধূসর থেকে বাদামি, নীলাভ থেকে কালো পাথরের রঙ বাকরোধ করে দেবে, একথা গ্যারান্টি দিয়েই বলা যায়। থোরাং লা-র পায়ের কাছে মুস্তাং জেলার মুক্তিনাথ উপত্যকায় (১২,১৭২ ফুট) অবস্থিত এই তীর্থক্ষেত্র হিন্দু এবং বৌদ্ধ, উভয়ের কাছেই সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্যাগোডা স্টাইলে নির্মিত এই বিষ্ণু মন্দিরটি এক অন্যতম শক্তিপীঠও বটে।

    দুপুরের মধ্যে রানিপোউয়া পৌঁছে পায়ে পায়ে ঘুরে নিলাম আমাদের হোটেল পোটালা-র চৌহদ্দি ছাড়িয়ে আরও কিছুটা। সূর্য বিশ্রামে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতেই কনকনে হাওয়ার দাদাগিরি শুরু। যদিও জমসম থেকে পুরো রাস্তাতেই হাওয়ার দাপট ছিল, কিন্তু এখন যেন সে রীতিমতো হুমকি দিয়ে হোটেলের ঘরে বন্দি করে ফেলল আমাদের। গরম গরম থুকপা আর চাউমিন খেয়ে আশ্রয় নিলাম লেপের নিচে।

    পরদিন ভোর হওয়ার আগেই ক্যামেরা হাতে আমরা উঠে গেলাম হোটেলের ছাদে। দূরে বরফশৃঙ্গের মাথায় এসে পড়া প্রথম সূর্যের আলোয় দিনের শুরুটা পবিত্র হয়ে উঠল। ১৮০ ডিগ্রিতে ছড়িয়ে থাকা ধৌলাগিরি থেকে মাউন্ট টুকুচে, সবাই একে একে আপন গরিমায় দেখা দিল সূর্যের আলো মেখে। অনির্বচনীয় এই দৃশ্য দু’চোখে ভরে নেমে এলাম মন্দিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে।

    রানিপোউয়া থেকে দেড় কিলোমিটার দূরেই মুক্তিনাথ মন্দির। পাথুরে পথে বোল্ডারের ফাঁকে ফাঁকে পা রেখে চলতে চলতেই পৌঁছে যাই পাথরের সিঁড়ির নিচে। দূর থেকে দেখা যায় লাল রঙের তোরণ। সোনালি-হলুদ-সবুজ পাতায় ঘেরা মুক্তিনাথ মন্দির। মন্দিরের পেছনেই পাথুরে দেওয়ালের গায়ে সার দেওয়া ১০৮টি ষাঁড়ের মুখ। পেতলের এই মুখগুলি থেকে নিঃসৃত বরফঠান্ডা জলধারা হিন্দুদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র। তিব্বতি ভাষায় এই মন্দিরের নাম চামিং গ্যাৎসা, যার অর্থ হল ‘১০৮ জলধারার স্থান’।

    পুজো দিয়ে বেরিয়ে এগিয়ে চললাম জ্বালামুখী-র সন্ধানে। এই অনির্বাণ শিখাটি যদিও দেখা হল না, কিন্তু তার পরিবর্তে দেখলাম এক অনন্যসুন্দর সৌম্য, ধ্যানস্থ মূর্তি। শ্বেতপাথরের তৈরি প্রায় ৭০ ফুট উঁচু এই মূর্তির সামনে এলে চোখের পাতা ভিজে আসে এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে। পায়ের কাছে হাঁটু মুড়ে বসে থাকতে থাকতে মনে হয়, ঠিক সেই মূহূর্তে সারা পৃথিবীতে যেন এক পরম শান্তি বিরাজ করছে। মন না চাইলেও সবকিছু পেছনে ফেলে রেখে ফেরার পথ ধরতে হয়।

    শেষবারের মতো তাকিয়ে দেখি, মূর্তির মাথার ঠিক পেছন থেকে ঠিকরে আসছে রবিরশ্মি, আর মনের মধ্যে সুর উঠছে, বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি...