গ্রন্থ সমালোচনা

এক সংযুক্তির খোঁজে

ধৃতিমান গঙ্গোপাধ্যায়

  • ........................

    দ্য হিরোইন অ্যান্ড আদার স্টোরিজ়
    ডি জয়কান্তন
    অনুবাদ: দীপালক্ষ্মী জে । ২৯৫.০০


    দ্য মাস্ক অ্যান্ড
    আদার স্টোরিজ়
    অরূপা পতঙ্গিয়া কালিতা । ৩৯৫.০০

    নিয়োগী বুকস
    নয়াদিল্লি-২০

    ........................

    দু’টি গ্রন্থেই অনূদিত গল্পগুলি অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে রক্ষা করেছে লেখক ও পাঠকমনের সংযোগ।

    ছোটগল্প নিয়ে রবীন্দ্রনাথের বহু ব্যবহারে ক্লিষ্ট কোটেশন দিয়ে সমালোচনা শুরু করতেই হবে, এমন কোনও নিয়ম নেই। তবু বলি, ‘ছোট-ছোট গল্পকথা’ সহজ সরল আর থাকে না, যখন কোনও একজন ‘ছোট’ মানুষের জীবন ছুঁয়ে ফেলে বৃহত্তর জীবনকে। অর্থাৎ লেখক যখন সেই ছোট সাধারণ চরিত্রের মধ্য দিয়ে বৃহত্তরের কাছে পৌঁছে দেন পাঠককে। এই সংযোগেই ছোটগল্পের সার্থকতা আর তাই সকলের আগে ‘ছোট’ সাধারণ চরিত্রগুলির সঙ্গে পাঠকের মনের সংযুক্তির প্রয়োজন, হয়তো বিশ্বাসযোগ্যতার মাধ্যমে। দু’টি অনুবাদ গল্পের সংকলন পড়তে গিয়ে ঠিক এই জায়গাতেই দু’টি খুব ভিন্ন অভিজ্ঞতা হল।

    ডি জয়কান্তন অত্যন্ত সেলিব্রেটেড তামিল লেখক, বহু পুরস্কারের (এমনকী পদ্মভূষণ) প্রাপক। ‘দ্য হিরোইন অ্যান্ড আদার স্টোরিজ়’-এ তাঁর কিছু তামিল গল্পকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন দীপালক্ষ্মী। ছোট সংসার, ছোট চরিত্রের কাহিনি, ফলে বলাই বাহুল্য সাধারণ সংসারের কেন্দ্রীয় চরিত্র অর্থাৎ নারী এই বইয়ের প্রায় প্রতিটি কাহিনির কেন্দ্রেই বিরাজ করছে। প্রচ্ছদ এবং বইয়ের নামেই তো এই দিগন্ত পাঠককে দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবু কোথাও যেন জয়কান্তনের নারীচরিত্ররা একটু একরঙা। মরালিটির রংটি খুব বেশি করে ব্যবহার করা হয়েছে এবং সেজন্য পাঠকের কাছ থেকে কোথাও একটু দূরে সরে যায় চরিত্রগুলি। অবশ্য এখানে একটি ডিসক্লেমারও দেওয়া যায়। প্রায়শই অনুবাদ করার সময়ে মূল ভাষার আবেগগুলি হারিয়ে যায়। জানি না কেন, ভারতে অনূদিত বেশির ভাগ বই হাতে ধরলেই তার ভাষায় একটা দূরত্ব, একটা প্যাটার্ন লক্ষিত হয়। সাহিত্যে মন না দিয়ে, সাহিত্যিককে দূরে রেখে, শুধু ভাষায় মনোনিবেশ করা হয় বলে কি? জানা নেই। অনুবাদ-বিশেষজ্ঞরা হয়তো আরও ভাল বলতে পারবেন। বিষয়ান্তরে চলে গেলাম, জয়কান্তনের গল্পগুলিতে আসা যাক। বইয়ের প্রথম গল্পটির নামেই বইয়ের নাম। গল্পের মূলে শক্তিশালী নারীচরিত্র, কিন্তু এক্ষেত্রে পুরুষ চরিত্রটির অতিমাত্রিকতায়, বড় একপেশে হয়ে যায় গল্পটি। একমাত্রিকতার যা ফল হতে পারে, অর্থাৎ একটা অসংযোগ, বিশ্বাসহীনতার সুর শুরুতেই ধরা পড়ে। ‘ফয়েল’-এর ঘনত্বর অভাবে মূল নারীচরিত্রটিও পূর্ণতা পেয়ে ওঠে না। তবে গল্পের উজ্জ্বলতম মুহূর্ত, শেষে পুরুষচরিত্রর চোখে জলের ফোঁটাদু’টি। আবার ‘দ্য পলবেয়ারারস’-এর শেষটিই গল্পের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা। সেটুকু বাদ দিলে মাতৃত্বের ছবিটি বিশ্বাসযোগ্যভাবে এঁকেছেন লেখক। বিশেষত পুলিশকর্মীর স্ত্রীয়ের কান্নায় যে-বেদনা প্রচ্ছন্ন, তা মর্মস্পর্শী। জয়কান্তনের বইটি জয়েসের ‘ডাবলিনারস’ নয়, সেই কন্টিনিউটি নেই পুরো বই জুড়ে। গল্পগুলিকে আলাদা-আলাদা গল্প হিসেবেই দেখা শ্রেয়। তবু যদি একটি ট্রোপকে এই গল্পের অন্যতম মূল সূত্র ধরা যায়, তা ‘অনাথ’। বইয়ের প্রায় সব গল্পে কোনও না-কোনও চরিত্র অনাথ। হয়তো লেখক সামাজিক অসহায়তার কথা বলছেন। বা হয়তো বলছেন এমন এক অবস্থার কথা যেখানে বৃহৎ ‘স্কিম অফ থিংস’-এ মানবচরিত্রগুলি নিতান্তই ক্ষুদ্র। মর‌্যাল সঠিকতার দিকে লেখকের কলম ঝুঁকেছে, ফলে মানবের এই ক্ষুদ্রতা হয়তো ঈশ্বরেচ্ছার নিকট মানবের নগণ্যতারই প্রতিচ্ছবি। এমন অনেক কথা মনে পড়ে ‘পার্ভার্ট’ গল্পটি পড়তে-পড়তে। এই যে কাহিনির মূল পুরুষচরিত্রটির প্রচণ্ড শিভ্যালরি (যা বইয়ের অন্যান্য পুরুষচরিত্রের মধ্যেও যথেষ্ট বর্তমান), এই যে নারীকে বলা ‘তুমি আমার বাড়িতে থেকে যাও’, এই মহানুভবতা কি সেই মুহূর্তে নগণ্য হয়ে যাচ্ছে না, যখন জানতে পারছি পুরুষটি আসলে ‘পৌরুষহীন’? কিন্তু একটি প্রশ্নও ওঠে। পুরুষটির যে চরিত্র লেখক এঁকেছেন, সেই বোহেমিয়ানিজ়ম-এর কারণ কি এই যে, সে ‘পৌরুষহীন’? ‘পলবেয়ারারস’-এ সন্ততি না থাকাই কি মমত্বের কারণ? জয়কান্তনের গল্পের মধ্যে সিনেম্যাটিক এলিমেন্টও যথেষ্ট। সিনেম্যাটিক মেলোড্রামার প্রভাবে ‘পার্ভার্ট’ এবং ‘ইট্‌স ওনলি ওয়র্ডস’ তার মর্মস্পর্শী চরিত্রটি হারিয়ে ফেলে। আর-একটি জিনিস লক্ষিত হতে পারে। গল্পগুলিতে একটি চরিত্র অনাথ এবং অপর চরিত্রটি তা নয় বলে একটি অবস্থার উপর-নীচ আছে। ‘ইট্‌স ওনলি ওয়র্ডস’-এ দু’টি চরিত্রই সহায়সম্বলহীন বলে সেই উচ্চ-নীচটা নেই এবং তাই প্রেমটা এত কাছের বলে মনে হয়। তবে বইয়ে যে-কাহিনিটি সত্যি-সত্যি নাড়িয়ে দিয়ে যায়, তা ‘ক্রুসিফিক্‌শন’। মরালিটি এখানে পথের ধুলোয় গড়াগড়ি খাচ্ছে। ঈশ্বরেচ্ছা ইত্যাদির কথা হচ্ছিল। ধার্মিক পাপ-পুণ্যবোধ আর ঈশ্বরদত্ত স্বাভাবিক প্রবৃত্তির মধ্যে আটক সন্ন্যাসিনীর মধ্যে মুক্ত নারীর ব্যক্তিত্বটি অসাধারণ লাগে।

    তবে নারী, সংযুক্তি, মুক্তি, ছোটগল্পের কন্টিনুইটি ইত্যাদি কিন্তু অনেক সার্থকভাবে উঠে আসে অসমিয়া সাহিত্যিক অরূপা পতঙ্গিয়া কালিতার ছোটগল্পের সংকলনটিতে। ‘দ্য মাস্ক অ্যান্ড আদার স্টোরিজ়’-এর গল্পগুলি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন ভিন্ন-ভিন্ন অনুবাদক। অথচ তা-ও পরপর গল্পগুলি পড়তে গিয়ে একটি ছোট জায়গা চেনা যায়, একটি কলমের সত্তা খুঁজে পাওয়া যায়, অসমের একটি সময়, একটি ভাগ করে নেওয়া সামাজিক অস্থিরতাকে বোঝা যায়। লেখক-সত্তাটি কাহিনিতে নারী এবং তার মধ্যে জয়কান্তনের ‘সর্বজ্ঞানী’ লেখক-সত্তাও অবর্তমান। ফলে, চরিত্রগুলি (‌লেখিকাকে ধরে) আরও বেশি কাছের হয়ে ওঠে। নারী ও লেখিকার সংযুক্তিকে একটু স্টিরিয়োটিপিক্যাল অতিসরলীকরণ মনে হতে পারে। কিন্তু ‘মৃগনাভী: দ্য মাস্ক’ গল্পটি পড়লেই সে সন্দেহের নিরসন হবে। উক্ত গল্পটি একটি অসাধারণ সার্থক ‘বিলডুংসরোমান’। লেখক-সত্তার প্রতিটি রং এই গল্পের মধ্য দিয়ে মন ভরিয়ে দেয়। অনুবাদককে ধন্যবাদ, চিত্রণ এবং অসমিয়া এলিমেন্টগুলিকে এত সুচারুভাবে রেখে দেওয়ার জন্য। অন্য গল্পগুলিতে মিলিটারি ও উগ্রপন্থার যুদ্ধের প্রবল অস্থিরতার মধ্যে অরূপা তাঁর চরিত্রগুলিকে এঁকেছেন। অস্থির সময়ের স্বাভাবিকতম প্রভাব এই যে, মানুষের সত্তা সেখানে নস্যাৎ হয়ে যায়। শুধুমাত্র সময়ের একটি সত্তা রয়ে যায় ইতিহাসের পাতায়। খুব ধ্বংসাত্মক সে সত্তা। অথচ অরূপার ক্ষুদ্র চরিত্রগুলি তাদের সত্তা নিয়ে প্রবলভাবে বিদ্যমান এই সময়ের মধ্যেই। গল্পের শেষে গল্পের সেই একটি মানুষ হয়তো মুছে যায়, কিন্তু তার ভিতর দিয়ে একটি জনজাতির সত্তা কোঁচড়ে বাঁধা পড়ে। রয়ে যায় তিনটি স্তরই... ব্যক্তি, জনজাতি এবং বৃহত্তর সময়। তাই ‘আই’ প্রতিটি মা হয়ে ওঠে, প্রতিটি নারী হয়ে ওঠে। ব্যক্তিকে কিন্তু প্রায়শই কোনও নাম দেননি অরূপা। ওই সত্তার অবলুপ্তি ঘটানোর জন্যই হয়তো। এবং হয়তো তাই চরিত্রের চেতনারও অবলুপ্তি ঘটান লেখিকা। ‘দ্য ভোগী অফ দ্য বোগমতি শ্রাইন’ বা ‘আই, দ্য মাদার’-এর স্বপ্নকল্প আশ্চর্য এক রঙিন অন্ধকারে পাঠকমনকে ডুবিয়ে দেয়, আর সে সুযোগে অরূপার কলম সোজা বুকে এসে খোঁচা দেয়। ‘টু ডেজ় ফ্রম ফ্যান্টমস ডায়েরি’-র লোকটি বা ‘দ্য গডেস’-এর মহিলা... প্রত্যেকটি চরিত্রকে চিনতে পারি আমরা, হয়তো ভালবেসে ফেলি, কেঁদে ফেলি। এরই মধ্যে আলাদা করে গেঁথে থাকে ‘আ প্রিকেরিয়াস লিঙ্ক’-এর বৃদ্ধ ফল-ব্যবসায়ীর কথা। আর দুঃস্বপ্নে রয়ে যায় ভারী মিলিটারি বুট আর জলপাই রঙের ট্রাকগুলির শব্দ, যা সত্তা নস্যাৎ করে দেয়। সেখানে একমাত্র রক্ষাকর্তা লেখক ও পাঠকমনের সংযোগ। ‘দ্য মাস্ক অ্যান্ড...’ সেই কাজটি করেছে খুব সার্থকভাবে। তাই গল্পগুলির আলাদা-আলাদা সত্তা থাকা সত্ত্বেও বইটি একটি স্বকীয় সত্তায় বেঁচে ওঠে।

    ছবি: দীপঙ্কর ভৌমিক

You may like