গ্রন্থ সমালোচনা

ব্যতিক্রমী দুই আখ্যান

সাগ্নিক রক্ষিত

  • ........................

    জোন থার্টি
    নলিনী বেরা
    দে’জ পাবলিশিং
    কল-৭৩ । ২০০.০০

    অপার্থিব

    অনিন্দ্য সেনগুপ্ত
    বৈভাষিক

    হাওড়া-৭১১৩০২

    ১৮০.০০

    ........................

    একটি উপন্যাসে আছে ফ্রান্সের প্রান্তিক জনপদের জীবনযাত্রার কথা, অপরটিতে কল্পবিজ্ঞানের আঙ্গিকে উঠে এসেছে রাজনীতি ও দর্শন।

    তথ্য-প্রযুক্তির বিকাশের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি এখন আমরা। মানুষ ক্রমশ ভিড়ের অনুগামী হয়ে পড়ছে। তাৎক্ষণিকতা মানুষকে দার্শনিক বোধ থেকে বিযুক্ত করেছে। তার হাতে এখন সময় নেই। তার চাহিদা সাহিত্যের সরলীকরণ। আর শিল্পের দাবি মিটিয়ে উপন্যাস লেখা কষ্টসাধ্য হওয়ায় অনেকেই এখন রোম্যান্টিক, সহজ ভঙ্গির লেখায় মনোনিবেশ করেছেন। আলোচ্য দু’টি উপন্যাস এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। সহজতার কাছে ধরনা দেওয়ার প্রবণতা এবং নাটুকে সিকোয়েন্সের মাধ্যমে পাঠককে তাত্ক্ষণিক আনন্দ দেওয়ার চেষ্টা এখানে নেই। তবে মূল ধারার মানুষ নয়, এখানে রয়েছে প্রান্তিক মানুষের আচার-আচরণ, ভাষা, জীবনযাপনের প্রণালী, স্বপ্ন-সাধ এবং সংকট থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে গৃহীত পদক্ষেপের উপস্থাপনা।

    আলোচনার প্রথম উপন্যাস নলিনী বেরার ‘জোন থার্টি’। এখানে লেখক ফ্রান্সের নাঁত শহরের প্রান্তিক জনপদ জোন থার্টির জীবনযাত্রার কথা তুলে ধরেছেন। পর্যটক হিসেবে নয়, এক নিকটাত্মীয়ের আমন্ত্রণে সস্ত্রীক তিনি পাড়ি দিয়েছেন সুদূর ফ্রান্স। নাঁত শহরে তাঁর দৈনন্দিন রোজনামচাই উপন্যাসের উপজীব্য। তবে ভ্রমণবৃত্তান্ত নয়, এটি উপন্যাস। ফ্রান্সের ভূগোল ও প্রকৃতির বিবরণ, জীবন ও সংস্কৃতির বিশ্লেষণ এবং মানুষের স্বভাবের যে অনুপুঙ্খ, হৃদয়গ্রাহী বর্ণনা লেখক করেছেন, তাতে তাঁর পরিবেশনশৈলীর নৈপুণ্যে বিস্মিত হতে হয়। ‘জোন থার্টি’ নাঁত শহরে ভ্রমণরত এক আদ্যন্ত ‘মেদিনীপুরিয়া’ বাঙালির আত্মজবানি। ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে লেখক গল্পের আকারে উপস্থাপন করেছেন দক্ষ শিল্পীর কৌশলী আঁচড়ে। এখানে ভ্রমণ শুধু কায়িক নয়, মানস ভ্রমণও।

    উপন্যাসে যেমন ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাস, ক্রীতদাসপ্রথা, জিপসি সম্প্রদায় সম্পর্কে আলোচনা বা ভলতেয়ার, মদিয়ানো, সার্ত্র, কাম্যুর সাহিত্যকীর্তির উল্লেখ আছে, তেমনই আছে মহাভারত, মধুসূদন, বিবেকানন্দ বা সুকুমার রায়ের প্রসঙ্গ, যা রসজ্ঞ পাঠককে আগ্রহী করে তুলবে। পাশাপাশি উঠে এসেছে লেখকের জন্মস্থান, সুবর্ণরেখা নদীর তীরে প্রান্তিক জনপদ বাছুরখোঁয়াড় গ্রামের জীবনচিত্র, মকর পরবে গুঁড়ি কুটা, ভাদ্র-আশ্বিনে ডাহি-জমি বা জল-ঝড়িয়ার মাসে জঙ্গলমহলের কথা কিংবা দুই জেলে বুড়ো মাধব পানী আর ঝড়েশ্বর পানীর গল্প। রয়েছে ফ্রান্সের বিভিন্ন এলাকা দেখে স্বদেশের স্মৃতিচারণ ও তুলনা। নাঁত-র রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে লেখকের গ্রামের বাড়িতে খড়ির দাগ কেটে পূর্ণিমা-অমাবস্যার হিসেব রাখার কথা মনে প়ড়ে। নাঁত কমপ্লেক্স স্পরতিফ, জেরেদিয়ের-এর ধারে গাছের জঙ্গল দেখে লেখক বলছেন, যেন ‘গোঠ-টাঁড়ের মাঠের ওধারে মাঝু-ডুবকার পুরাতনডাহিতে সার সার মহুল গাছের মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলেছি।’

    ‘জোন থার্টি’-তে পাওয়া যায় লেখকের সরস মনের পরিচয়, যেমন ফ্রান্স যাওয়ার আগে তাঁর স্ত্রীর মিক্সিতে হলুদ-পোস্ত গুঁড়ো করে নিয়ে যাওয়া। নলিনী বেরা তাঁর রচনায় ফরাসি ও ভারতীয় ইতিহাস, পুরাণ ও লোকজ-ভাবনার নান্দনিক প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। উপন্যাসটির বর্ণনা-কৌশল সাধুবাদযোগ্য। ফরাসি জনজীবন, চরিত্র, ভোজনপ্রথা, ভাষা, গামবুট পরা সুন্দরী সোনালি চুলের ফরাসি কুকুরসঙ্গী-সমেত মহিলার সঙ্গে কুশল বিনিময়, রু কাপিতেন ভে হারমুত, আভন্যুঁ দ্যু তেরোয়ারের মতো শহরের নানা পাড়ার বিবরণ উপন্যাসকে বর্ণিল করেছে। লেখকের চোখে ও মনে যখন যা ধরা পড়েছে তখনই তা ভাষায় ফুটে উঠেছে। নাঁত-র নানা অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য, পোশাক-আসাক, সংস্কৃতি, কৌতুকবোধ, কিছুই বাদ পড়েনি। ‘জ়োন থার্টি’ লোকজীবন-চেতনায় ভাস্বর। এখানে লেখকের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ও কাব্যিক মনের পরিচয় পাওয়া যায়। বারবার উঠে আসে শিকড়ের প্রসঙ্গ। নাঁত শহরের বৈভবের পাশাপাশি দরদের সঙ্গে চিত্রিত হয় গ্রাম-জীবনের ছবি। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মুখে মুখে ঘুরে ফেরা জীবন থেকে জাতিসত্তার গল্প রচনা করেছেন লেখক। তাঁর আঞ্চলিকতা, মানুষের সমষ্টিগত অনুভব তাঁর লেখাকে স্থান-কালের সীমানা পার করে দিয়েছে। লেখকের বিবরণে মুগ্ধতা বা করুণা নেই, রয়েছে জীবনের উপলব্ধি। প্রান্তিক সমাজের ভাবাদর্শ, প্রথা, প্রতিষ্ঠান, প্রচলিত বিশ্বাস, মিথ নানা চিহ্ন ছড়িয়ে আছে উপন্যাসের বিভিন্ন পর্বে।

    উপন্যাসটির আর-এক সম্পদ তার প্রাণবন্ত কথ্যভাষা। শ্রীবেরার লেখা জড়তাশূন্য, অন্তরঙ্গ। কৌতুকপূর্ণ দৃষ্টিতে পরিপার্শ্ব, পরিস্থিতি নিয়ে রঙ্গ করতে করতে এগোন তিনি। তবে অকারণে জ্ঞান দেওয়ার প্রবণতা নেই। লেখক এখানে গল্প লিখছেন না, বলছেন। মাটির সঙ্গে তাঁর অকৃত্রিম যোগাযোগ সুস্পষ্ট। কথার পিঠে কথা সাজিয়ে সাবলীল ভঙ্গিতে লেখক পাঠকমনকে আঁকড়ে ধরেন। আশ্চর্য চিত্রকল্পের দ্যোতনায় মনোমুগ্ধকর বর্ণনা উপমার অভিনবত্বে হয়ে ওঠে অসামান্য। উপন্যাসে মাঝে মাঝেই এসে পড়ে নানা সাহিত্যকর্মের উদ্ধৃতি। এতে লেখকের গভীর পাঠ-সমৃদ্ধির পরিচয় মেলে। বিশ্বসাহিত্যের সমস্ত শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ। ইতিহাস, গবেষণা ও উপন্যাস রচনার এমন পারস্পরিক সমন্বয় প্রশংসনীয়। এই মেলবন্ধন অহেতুক জটিলতার সৃষ্টি করে না। কাহিনিপাঠের তেষ্টা মেটানোর মতো নিটোল গল্প না থাকলেও টুকরো টুকরো কোলাজ মিলে এখানে সৃষ্টি হয়েছে এক অপরূপ চিত্রলিপি।

     

    অনিন্দ্য সেনগুপ্তর ‘অপার্থিব’ উপন্যাসে কল্পবিজ্ঞানের আঙ্গিকে রাজনীতি ও দর্শনের উপস্থাপনা করা হয়েছে। এখানে লেখক নির্মল বাস্তববাদের পথে হাঁটেননি। তবে কল্পবিজ্ঞান অনেকটাই আলংকারিক। এখানে কল্পনার মেদুরতার পরিবর্তে পাঠককে দাঁড়াতে হবে বাস্তবের কঠিন মাটিতে। গল্পের সময় আনুমানিক ২০৬৫ সাল, যখন পৃথিবীর অধীশ্বর আটটি যুযুধান কর্পোরেশন। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র দারিয়াস মজুমদার। তার আচরণ নায়কোচিত নয়, সে বরং অ্যান্টি-হিরো। দারিয়াস সমাজের মূলস্রোতের মানুষই নয়, সে প্রান্তজীবী। তার রাজনীতি, দর্শনও প্রান্তিক। পেশাগতভাবে সে একজন হ্যাকার, কর্পোরেশনের চোখে ‘অ্যানার্কিস্ট অ্যাক্টিভিস্ট।’ প্রতিষ্ঠানের রক্তচক্ষুকে সে এড়াতে পারে না, দণ্ডিত হয় যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে। তার উদ্দেশ্য প্রযুক্তিকে কর্পোরেশনের দাসত্ব থেকে মুক্তি দেওয়া। সেজন্য প্রযুক্তির কার্যক্ষমতার বিনাশ ঘটলেও ক্ষতি নেই। দারিয়াস প্রযুক্তির আত্মধ্বংসকেই ব্যাখ্যা করে প্রযুক্তির চূড়ান্ত ‘সৌন্দর্য’ হিসেবে।

    পৃথিবী থেকে ৪.২৪ আলোকবর্ষ দূরে, ‘প্রক্সিমা সেন্টরি’ তারকামণ্ডলের করোনা গ্রহে দারিয়াসকে পাঠানো হয়, যেখানে পাওয়া গেছে প্রাণের সন্ধান। কর্পোরেশন যথারীতি হাত গুটিয়ে
    বসে নেই। তারা করোনাকে উপনিবেশে পরিণত করতে চায়, গোগ্রাসে গিলতে চায় গোটা গ্রহটাকে। কর্পোরেশনের তরফ থেকে করোনাতে পাঠানো হয়েছে একদল বিজ্ঞানীকে। কিন্তু কোনও রহস্যময় কারণে তাঁরা সকলেই পরিণত হচ্ছেন বোধবুদ্ধিহীন জরদ্‌গবে। করোনার ডিস্টোপিক দুনিয়ায় দারিয়াস পৌঁছয় কর্পোরেশনের দূত হিসেবে। সেখানে গিয়ে কর্পোরেশনের তাসের দেশে সে অন্তর্ঘাত ঘটাবে, নিজেই পরিণত হবে জরদ্‌গবে, নাকি শেষপর্যন্ত রহস্য উন্মোচনে সমর্থ হবে, এই নিয়েই এগোয় উপন্যাসের মূল গল্প। দারিয়াসের সঙ্গে রোজবাড, ইলিনা ঈৎজাক বা সোহরাব ঘানির সংলাপে এবং তার নিজস্ব স্মৃতিচারণে ঢুকে পড়ে দর্শন, রাজনীতি, প্রান্তজীবন।

    ইলিনা বা সোহরাবের কথাতেও উঠে আসে শোষণের প্রসঙ্গ। কিন্তু এই অতিবুদ্ধিমান বিজ্ঞানীগোষ্ঠী অরাজনৈতিক, নিস্পৃহ। তাঁরা গজদন্ত মিনারে বসে জ্ঞানচর্চায় মগ্ন। এঁদের অন্তরে প্রতিবাদের আগুন জ্বলে না। দারিয়াসের মতে এঁরা ‘স্যানিটাইজ়ড জ্ঞানের অজ্ঞানতায় নিমজ্জিত।’ উপন্যাসের শেষ অংশে উঠে আসে নানা রকম দ্বন্দ্ব। বহিরাগতের আক্রমণ, নাকি অভ্যন্তরীণ অভিঘাত, কোনটা বেশি কার্যকর? দারিয়াসের মনের অন্দরে স্মৃতির শাসনের সঙ্গে বেধে যায় ভবিষ্যতের দ্বৈরথ। 

    বাংলা সাহিত্যে সিরিয়াস কল্পবিজ্ঞান খুব বেশি নেই। এ বিষয়ে যা লেখালিখি হয়েছে বা হচ্ছে, তার বেশির ভাগই কিশোরদের উপযুক্ত। প্রাপ্তমনস্কদের জন্য লেখা মৌলিক কল্পবিজ্ঞানকাহিনির রস থেকে বাঙালি কিছুটা বঞ্চিতই। ‘অপার্থিব’ সে কারণেই প্রশংসনীয় এবং অত্যন্ত সাহসী পদক্ষেপের অধিকারী। এটিই লেখকের প্রথম উপন্যাস। তবে তিনি পেশাদার লেখক নন, তাই তাঁর গ্রন্থটি চিরাচরিত ফর্মুলায় ফেলা নিছক বাজারি প্রোডাক্ট নয়। শুধু আনন্দ দেওয়া নয়, এই উপন্যাস পদে পদে বৌদ্ধিক পাঠকের চিন্তার উন্মেষ ঘটাবে। বইয়ের অবতরণিকায় বাংলায় কল্পবিজ্ঞান চর্চা নিয়ে যে-ভূমিকা দেওয়া হয়েছে, সেটিও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ‘অপার্থিব’-র প্রকৃত রসাস্বাদনের জন্য আগে কল্পবিজ্ঞানের বিখ্যাত লেখাগুলি পড়া এবং কুব্রিক, ওয়েলসের চলচ্চিত্র দেখা প্রয়োজন। 

    অনিন্দ্য সেনগুপ্তর লেখার গতি তরতরে, কিন্তু মাঝে-মাঝেই ইংরেজি শব্দ এসে প়ড়ে। মনে হতে পারে কোনও হলিউডি সায়েন্স ফিকশনের চিত্রনাট্য পড়ছি। কারণ, লেখক কল্পবিজ্ঞানের কিছু চিরপরিচিত ট্রোপ যেমন, অটোমাটা, ওয়র্মহোল, ডিসটোপিয়া ইত্যাদি ব্যবহার করেছেন। এখানেই যেন লেখকের কল্পনাশক্তি একটু হোঁচট খায়। উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু রাজনীতি হলেও তার পরিপার্শ্ব, বিন্যাসে আর-একটু মৌলিকত্বের প্রয়োগ পেলে লেখাটি আরও মনোগ্রাহী হত। উপন্যাসের শেষ অংশটুকু সামান্য প্রলম্বিত মনে হয়। তবে নির্মাণশৈলীর প্রসঙ্গ বাদ দিলে, উপন্যাসের বিষয়বস্তু নিয়ে লেখক কোনও আপস করেননি। তাঁর পাণ্ডিত্য, স্বচ্ছ রাজনৈতিক মতামতের স্ফুরণ হয় উপন্যাসের পাতায় পাতায়। তাই এটি কোনও ‘ছেলেভুলানো অ্যাডভেঞ্চার’ নয়, এর ‘অভীষ্ট পাঠকগোষ্ঠীও আলাদা।’  

    বাংলা কল্পবিজ্ঞানকাহিনির আকালের সময়ে এরকম একটি সুপাঠ্য উপন্যাস উপহার দেওয়ার জন্য লেখক ধন্যবাদার্হ।  

    উপরোক্ত দু’টি উপন্যাস পড়তে-পড়তে একটি কথা মনে হয়— বিষয়বস্তু সম্পূর্ণ পৃথক ঠিকই, কিন্তু নিবিষ্ট পাঠক বুঝতে পারবেন যে, তাদের চরিত্রগত মিল রয়েছে। মেদিনীপুরের মাধব, ঝড়েশ্বর বা যুধিষ্ঠির সকলেই অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষ। আবার দারিয়াসও কর্পোরেশনের দ্বারা শোষিত-প্রতারিত। সুতরাং উভয়েই শ্রমজীবী। তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই শ্রেণিগত কারণেই তারা পরস্পরের কাছাকাছি চলে আসে।

    ছবি: দীপঙ্কর ভৌমিক

You may like