গ্রন্থ সমালোচনা

বৃহৎ এক পর্যটন

সায়ম বন্দ্যোপাধ্যায়

  • ........................

    বিপুলা পৃথিবী
    আনিসুজ্জামান
    প্রথমা প্রকাশন
    ঢাকা-১২১৫

    টাকা ৮০০.০০

    ........................

    আনিসুজ্জামানের আত্মকথন অনতি-ইতিহাসের সপ্রতিভ ধারাভাষ্য। 

    স্বাধীন এক দেশে ফিরছেন তিনি। স্বাধীন বাংলাদেশ। সীমান্ত পেরনোর সময় শরীর-মন শিহরিত। যশোর সার্কিট হাউজ়ে জায়গা হল না থাকার, সঙ্গে আরও কয়েকজন রয়েছেন— আত্মীয় ও বান্ধবেরা। যশোরে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে গেলেন। এক রাত সেখানেই কাটাবেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। তাঁর যাওয়ার কথা খুলনা। অথচ ক্যাম্পের দায়িত্বে থাকা ক্যাপ্টেন নুরুল হুদা সে ইচ্ছে নাকচ করে দিলেন। কিন্তু কেন? দেশ তো মুক্ত, স্বাধীন? এখনও কীসের বাধা? না, স্বাধীন দেশ হলেও বাধাবিপত্তি এখনও আছে। সন্ধ্যার পর ‘দূরপাল্লায় যাত্রা’য় সম্মতি দিতে পারলেন না হুদা। কারণ, ‘কোথায় কখন কী ঘটে, বলা যায় না।’ অতএব রাত সেখানেই কাটাতে হবে। আর হুদাও এক বিশেষ কাজে এই ক্যাম্পে অপেক্ষা করছেন— মেজর জলিলকে গ্রেপ্তার করতে হবে। প্রধান সেনাপতির আদেশ অমান্য করায় এই আদেশ দেওয়া হয়েছে। চমকে ওঠেন অধ্যাপক। মাত্র সাতদিন হল স্বাধীন হয়েছে তাঁর দেশ। এই কয়েকদিনের মধ্যেই একজন সেক্টর কমান্ডারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাঁর অধস্তন এক সামরিক কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করতে! মনখারাপ হয়ে যায় অধ্যাপকের।

    পরের দিন খুলনায় গিয়ে আরও কিছু জানতে পারলেন তিনি। একটি হল ‘মেজর জলিল ও তাঁর মুষ্টিমেয় সহযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে অবাঙালিদের সম্পত্তি লুঠপাট ও অবাঙালি মেয়েদের প্রতি অত্যাচারের’ কথা। অন্যটি, ‘ভারতীয় সেনাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সম্পদ-অপহরণের’ অভিযোগ।

    আনিসুজ্জামানের আত্মকথনের তৃতীয় খণ্ড ‘বিপুলা পৃথিবী’ শুরুতেই এই বিষণ্ণ, ম্লান ছবি আমাদের মুহূর্তে জানান দিয়ে যায় উপমহাদেশের নিয়তি। যে-নিয়তি কিছুতেই তিষ্ঠোতে দেয় না এই সুবিশাল ভূখণ্ডকে। ভাগ হয়ে নিস্তার নেই। সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের হাত থেকে মুক্ত হয়েও শান্তি নেই, স্বস্তি নেই। ঔপনিবেশিক বিকিরণ আজও তপ্ত করে রেখেছে আমাদের। প্রতিদিন নতুন নতুন ক্ষত দেখা দিচ্ছে, বা মুখ তুলছে পুরনো ব্যাধি। 

    দেশ হিসেবে ‘বাংলাদেশ’-এর জন্ম এক অনন্য সাক্ষ্য বহন করে। যে-ধর্মবিভাজন-জাতিভেদের উপর ভিত্তি করে ভারত ভাগ হয়েছিল, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা প্রমাণ করে দিয়েছিল যে, তা ছিল কতটা নিষ্প্রাণ, মেকি। জাতি-ধর্মের চেয়েও উপরে মানুষের মৌলিক অধিকার, স্বাতন্ত্র্যবোধ। পূর্ব-পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ রূপায়িত হওয়ার যে-মুক্তিযুদ্ধ, তা আসলে আমাদের অন্তর্নিহিত (এবং দেশভাগের যন্ত্রণায় ও পরিণতিতে নিষ্পেষিত) ‘হিউম্যানিজ়ম’-এর গর্জে ওঠা। তা যথার্থই ‘মুক্তিযুদ্ধ’।

    আর সেই মুক্তিযুদ্ধের প্রাণপুরুষ? লয়লপুরের (অধুনা ফয়সলাবাদ) জেলে কারারুদ্ধ থাকার পর লন্ডন-ভারত হয়ে ‘স্বাধীন’ দেশে ফিরছেন ‘বঙ্গবন্ধু’ শেখ মুজিবুর রহমান। বহু-অভিপ্রেত প্রত্যাবর্তনের দিন। সেদিন ১০ জানুয়ারি, ১৯৭২ — ‘বঙ্গবন্ধুকে দেখলাম দূর থেকে। তিনি যেন এই ক মাসে খানিকটা কৃশ হয়েছেন, কিন্তু কণ্ঠের তেজ বিন্দুমাত্র কমেনি। বক্তৃতায় তিনি জানিয়ে দিলেন ভুট্টোকে: কোনো বন্ধন নয় আর পাকিস্তানের সঙ্গে; বাংলাদেশ স্বাধীন, এর রাষ্ট্রীয় নীতি— ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র।’

    দু’টি ফেরা। একটি অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের, অন্যটি বাংলাদেশের জাতির জনক মুজিবুরের। দু’জনেই ফিরলেন সদ্য স্বাধীন হয়ে ভূমিষ্ঠ হওয়া এক দেশে। অর্থাৎ, দু’জনেই দেখছেন তাঁদের আশপাশ বিস্রস্ত। গোছানোর পর্ব শুরু হবে। নতুন করে তৈরি করতে হবে এই দেশ, জাতি-পরিচয়। আনিসুজ্জামানের ব্যক্তি-ইতিহাস (মাইক্রোহিস্টরি) ওতপ্রোত যুক্ত তাঁর মুক্ত দেশের জন্মক্ষণ (ম্যাক্রোহিস্টরি) থেকে। এই দুই ন্যারেটিভ সকলের জীবনে কাছাকাছি আসে না। রাষ্ট্রনায়কদের আসে সবচেয়ে বেশি। রাষ্ট্র-নির্মাণের কান্ডারিদের কাছেও তেমনই আসে। আনিসুজ্জামান তাঁর রাষ্ট্রের নির্মাণের অন্যতম কান্ডারি, প্রশাসনিক স্তরে প্রথম থেকেই পদচারণা। জায়মান বাংলাদেশের দ্রষ্টা তিনি। দেশের জীবন তাই তাঁরও জীবন হয়ে যায়।

    কতজনের ডাক আসে দেশের জাতীয় সংগীত বিষয়ক আলোচনায়? আনিসুজ্জামানের ডাক এসেছিল— ‘‘...দুপুরে বাড়ি ফিরে শুনি, বাংলা একাডেমি থেকে কয়েকবার আমার খোঁজ করা হয়েছিল। কারণ জানতে পরিচালক কবীর চৌধুরীকে ফোন করলাম। তিনি বললেন, ‘আমার সোনার বাংলা’— এটা স্থির হয়ে গেছে, তবে গানটির কয় চরণ জাতীয় সংগীতরূপে গৃহীত হবে, সেই পরামর্শ চাওয়া হয়েছিল বাংলা একাডেমির কাছে। পরামর্শের জন্যে তিনি ডেকেছিলেন কয়েকজনকে, আমাকেও যুক্ত করতে চেয়েছিলেন তার সঙ্গে। তাঁরা সুপারিশ করেছেন, গানটির প্রথম দশ চরণ জাতীয় সংগীত হিসেবে গৃহীত হোক। আমি বললাম, যথার্থ হয়েছে। কিন্তু মনে আফসোস রয়ে গেল, এত বড়ো একটা সিদ্ধান্তের অংশভোগী হওয়া থেকে বঞ্চিত হলাম।’’

    এই ‘আফসোস’-এর কয়েকদিনের মাথায় আরও-এক ঐতিহাসিক ডাক। ‘ড. কামাল হোসেন এত্তেলা পাঠালেন: বাংলাদেশের সংবিধান-রচনার কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। তিনি খসড়া তৈরি করবেন ইংরেজিতে, আমাকে তার বাংলা করে দিতে হবে, শেষ পর্য়ন্ত বাংলাটাই গৃহীত হবে প্রামাণ্য ভাষ্য বলে।’ আনিসুজ্জামান কাজটি করতে একটি দল চেয়েছিলেন, নির্দেশও পেয়েছিলেন নিজের মতো লোক বেছে নেওয়ার। নেয়ামাল বসির, এ কে এম শামসুদ্দীন ও আনিসুজ্জামান, এই তিনজনের দল শুরু করে দিল সংবিধানের কাজ— ‘একটা অনাস্বাদিত শিহরণ জাগলো দেহে-মনে: এই আমার স্বাধীন দেশ, তার সংবিধান-রচনার কাজে হাত দিয়েছি।’ সত্যিই, অদ্বিতীয় এই অনুভব!

    আনিসুজ্জামানের এই আত্মকথা সুযোগ করে দিল আমাদের সেই উন্মেষলগ্নটিকে কাছ থেকে ফিরে দেখার। যাকে বলে ‘কনভারসেশনাল টোন’, একেবারে সেভাবেই লেখা ‘বিপুলা পৃথিবী’। আমরা সহ-পথিক, পথ হাঁটি, সংলাপবদ্ধ হই অধ্যাপকের সঙ্গে। জ্ঞাত ও অজ্ঞাত তথ্য-সংবাদ মিলিয়ে তৈরি হয় নতুন-নতুন পাঠ। অন্তরালের কত কথা জানতে পারি, বিস্ময় জাগে জেনে আমাদের। যেমন, সংবিধান-রচনার সময় বানানবিধি নিয়ে এই স্থানটি— ‘নেয়ামালের পটুত্ব খুব কাজে এসেছিল। শব্দের উদ্ভাবনে তার নৈপুণ্য ছিল। ওমবুড্‌সম্যানের প্রতিশব্দ ন্যায়পাল তারই তৈরি। তবে তার মধ্যে এক ধরনের রক্ষণশীলতা ছিল। যেমন, ইংরেজিতে বহুবচন থাকলে বাংলায় সে বহুবচনই ব্যবহার করবে; মূলে যদি পার্লামেন্টরি অ্যাফেয়ার্স থাকে, তাহলে অনুবাদে সে সংসদ-বিষয়াবলি করবে, কিছুতেই সংসদ-বিষয়ক করতে রাজি হবে না। সে বারবার বলতো, দেখো, এক জায়গায় গিয়ে তুমি হয়তো দেখবে, বাংলায়ও বহুবচন ব্যবহার না করে উপায় নেই, তখন কী হবে? ইংরেজির বহুবচন বাংলায় কোথাও একবচন করবো, আবার কোথাও বহুবচন করবো, এতে সংগতি থাকে না। তবে সংবিধানে সে আরো বাংলা পারিভাষিক শব্দ ব্যবহারের পক্ষপাতী ছিল, আমিও ছিলাম।’ এই কাজ চলাকালীন দু’বার ডেকে পাঠিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। প্রথমবার তাঁর প্রস্তাব ছিল ‘রাজনীতির সঙ্গে ধর্মের সংযোগ ছিন্ন করার একটা বিধান থাকতে হবে সংবিধানে।’ দ্বিতীয়বার তিনি জানিয়েছিলেন ‘পাকিস্তান-আমলে সরকার অস্থিতিশীল হয়েছিল মূলত পরিষদ-সদস্যদের দলবদলের ফলে কিংবা দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে দলের বিপক্ষে ভোটদানের ফলে। এটা বন্ধ হওয়া দরকার।’ একজন মানুষ ক্রমাগত ভেবে চলেছেন তাঁর সদ্য জন্মানো দেশটিকে নিয়ে, একা হাতেই তাঁকে দেখতে হবে সমস্ত ক্ষেত্র— তিনি দেশনায়ক। জাতীয় শিক্ষা কমিশনের অন্যতম সদস্য অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে তিনি বলছেন, ‘টাকাপয়সার কথা আপনারা ভাববেন না। দেশের জন্য যেটা ভালো মনে করবেন, তেমন শিক্ষাব্যবস্থা সুপারিশ করবেন। আমি ধার করে হোক, ভিক্ষা করে হোক, টাকা জোগাড় করব।’

    তবে এসবের মাঝেও লেখক বুঝতে পারেন না ‘মুজিববাদ জিন্দবাদ’ স্লোগানের অর্থ। ‘মুজিববাদ’ বলতে কী বোঝায়, ‘তা আমার জানা ছিল না; দেখা গেল, অনেকেরই জানা নেই।’ ফুকোল্ডিয়ান ভাষ্যে যাঁকে নির্দ্বিধায় ‘পারেজ়িয়াস্টেস’ বলা যায়, আনিসুজ্জামান তেমনই একজন। তিনি ক্ষমতার সামনে দাঁড়িয়ে সত্য বলতে পিছপা হন না, এই লেখায় তার একাধিক প্রমাণ রয়েছে।

    গবেষকদের কাছে ‘বিপুলা পৃথিবী’ হতেই পারে এক প্রাইমারি টেক্সট। আর এই ডিজিটাল যুগের পাঠকদের কাছে তা অবশ্যই অতীতের ‘সরাসরি সম্প্রচার’। দর্শক আমরা, বসে (পড়তে) থাকি। এপিসোডের পর এপিসোড আসতে থাকে। সেখানে বঙ্গবন্ধু তো আছেনই, আছেন কাজী নজরুল ইসলাম। নজরুলকে নিয়ে লেখকের স্মৃতি অবশ্য মধুর নয়, ‘...[ঢাকায়] তাঁর জন্মদিনে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর সম্পর্কে কিছু বলার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। কিন্তু যেভাবে সেদিন গাড়ি থেকে টেনে-হিঁচড়ে তাঁকে বাংলা একাডেমির সভামঞ্চে তোলা হয়েছিল, তা দেখার বেদনায় আমার সৌভাগ্যলাভের আনন্দ ম্লান হয়ে গিয়েছিল।’

    আছেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়— ‘‘চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউতে এক বন্ধ রেস্টুরেন্ট ও বারের সামনে ট্যাকসি থেকে নামলাম। হাঁকডাক করে দরজা খোলানো হলো। নিচের তলায় এক টেবিল অধিকার করে শক্তি পানীয় আনতে হুকুম করলো আর বললো, ‘সঙ্গে কিছু দিস রে বাপু!’ বেয়ারার বললো, ‘সার্‌, আজ ড্রাই ডে।’ শক্তি সখেদে বললো, ‘বাবা, বাংলাদেশ থেকে আমার বন্ধু এসেছে, তাকে নিয়ে এসেছি খাওয়াবো বলো, তোরা বন্ধুর সামনে আমাকে অপমান করবি!’ সে বললো, ‘সার্‌, আমি কী করবো! ম্যানেজার সাহেবও নেই—।’ শক্তি বললো, ‘টেলিফোন লাগা ম্যানেজারকে।’ আমি বাধা দিতে চেষ্টা করি, তাতে কাজ হয় না। টেলিফোনে আবার তার কথা, ‘বাংলাদেশ থেকে খুব সম্মানিত একজন অতিথি নিয়ে এসেছি—ওসব ড্রাই ফ্রাই বুঝি না—আমার মানসম্মান নেই বুঝি!’ এবার টেলিফোন গেল ওয়েটারের হাতে—‘হ্যাঁ সার্‌, হ্যাঁ সার্‌’ শুনতে পেলাম তার মুখে। তারপর দোতলায় ‘প্রাইভেট অফিস’ লেখা এক ঘরে আমাদের বসিয়ে সে গেল রসদ আনতে।’’

    আছে অধ্যাপকের সামনে কবি শক্তির স্বীকারোক্তি—‘আমি পদ্য লিখি— কবি হলো সুনীল। ওর কবিতা ভালো করে পড়লে তোমরা অনেক কিছু পাবে।’ আচম্বিতে পেয়ে যাই রাজেশ্বরী দত্তকেও। আবেগমথিত এক মুহূর্তে। সুধীন্দ্রনাথ-পত্নী অভিমানাহত হয়ে আনিসুজ্জামানকে বলছেন— ‘...আসলে তোমরা আমাকে অ্যাকসেপ্ট করো না— বোধহয় আমি অবাঙালি বলে।’

    এরকম কত ব্যক্তিত্ব, কত ঘটনা ছড়িয়ে রয়েছে ‘বিপুলা পৃথিবী’র পথে-পথে। ব্যক্তিগত আনিসুজ্জামানও ধীরে-ধীরে উন্মোচিত হয়েছেন। এ গ্রন্থ শুধুমাত্র আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথা বলে চিহ্নিত হলে ভুল হবে। এ গ্রন্থ মেধা, মনন ও ইতিহাসের এক বৃহৎ পর্যটন।