Interview

বিজ্ঞান নিজেই নৈতিকতার ধ্বজাধারী, আমার সেটা আদৌ মনে হয় না।—পথিক গুহ

  • বিজ্ঞান কি আমাদের পথ দেখায়? বাংলায় বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখির কোনও পুষ্ট ধারা কেন গড়ে উঠল না আজও? বিজ্ঞান সাংবাদিকতা ঘিরে নানা প্রশ্ন নিয়ে পথিক গুহর মুখোমুখি যুধাজিৎ দাশগুপ্ত।

     

    যুধাজিৎ: আজকের বাংলায় বিজ্ঞানলেখক হিসেবে মাত্র একজনের নাম যদি তুলে আনতে হয়, তবে সে নামটি আপনার। রচনার মোট আয়তনের দিক থেকে ভাবলে হয়তো আরও একাধিক ব্যক্তিকে আমরা আপনার আগে পাব, কিন্তু সামগ্রিক অভিঘাতের দিক থেকে আপনাকে আগে রাখতেই হবে। পথিক গুহ সাংবাদিক, পথিক গুহ বিজ্ঞানলেখক, এবং বিজ্ঞানপত্রের সম্পাদক। আজকের অনেকের চোখে হিরো। আমরা একটু আগে থেকে শুরু করি এবং উল্টো দিক থেকে। আমরা কিশোর পথিক গুহর হিরোদের কথা একটু শুনে নিই।

    পথিক: অনেকে হয়তো এ প্রশ্নের উত্তরে রবীন্দ্রনাথের নাম করবেন, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর নাম করবেন, অথবা চারুচন্দ্র ভট্টাচার্য, জগদানন্দ রায়— হ্যাঁ, আমি এদের লেখা পড়েছি কিন্তু হয়তো আমার দুর্বলতাবশত, অক্ষমতাবশত এঁদের লেখা আমাকে তেমন করে টানেনি। আমাকে যাঁর লেখা খুব বেশি করে টেনেছিল তিনি একজন সাংবাদিক, তাঁর নাম জগদ্বন্ধু ভট্টাচার্য। আমি তখন স্কুলের ছাত্র, নাইন টেনে পড়ি, বয়স হবে কত, চোদ্দো পনেরো ষোলো এরকম। সমরজিৎ কর তো ছিলেনই। সমরজিৎ করের লেখাও নিয়মিত পড়তাম দেশ-এ।

    যু: জগদ্বন্ধু... খুব পরিচিত নাম নয়

    প: জগদ্বন্ধু ভট্টাচার্যকে আমি পরে আবিষ্কার করি কলকাতায় এসে, যখন সাংবাদিকতার সঙ্গে কিছুটা যোগাযোগ হয়েছে। তিনি আনন্দবাজারে চাকরি করতেন। চিফ সাব এডিটর ছিলেন। ওঁর লেখায় যে জিনিসটা আমাকে খুব আকর্ষণ করত সেটা হচ্ছে, উনি বিজ্ঞান লিখছেন, কিন্তু বিজ্ঞানটাকে একান্ত ভারতীয় প্রেক্ষাপটে উপহার দিচ্ছেন।

    আমি যা জানি, জগদ্বন্ধু ভট্টাচার্য বোধহয় একটিই বিজ্ঞানের বই লিখেছিলেন, ‘মহাকাল ও মহাবিশ্ব’, বিশ্ববাণী প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছিল। সেই বইটা কেন রবীন্দ্র পুরস্কার পায়নি সেটা আমরা জানি না। ওঁর দু’টি লেখার কথা বলছি। একটি লেখা যখন কার্ল সাগান মহাশূন্যের প্রাণীদের উদ্দেশে একটা চিঠি পাঠালেন— যে নক্ষত্রপুঞ্জের দিকে সেটা পাঠানো হল সেখানে পৌঁছতে তার সময় লাগবে পঁচিশ হাজার বছর— তো, জগদ্বন্ধু ভট্টাচার্য একটা লেখা লিখেছিলেন, তার হেডলাইন ছিল, ‘যে চিঠির উত্তর আসবে পঞ্চাশ হাজার বছর পরে’। এই যে উপস্থাপনার অন্যতর ভঙ্গি, সেটা আমাকে খুব টাচ করেছিল। আর একটি লেখা, আমার এখনও মনে আছে, সেটা হচ্ছে কলকাতায় যখন ভেরিয়েবল এনার্জি সাইক্লোট্রন সেন্টার স্থাপিত হল। স্থাপনের সপ্তাহে আনন্দবাজারে ওঁর লেখার হেডলাইন ছিল, ‘লবণ হ্রদে গুরু দ্রোণাচার্যের সামনে’। মানে, ওই যে, সাইক্লোট্রনে একেবারে পিনপয়েন্ট হিট করা হচ্ছে, সেটাকে উনি গুরু দ্রোণাচার্যের রূপকল্পে এনে ফেলেছিলেন। এইটা আমার কাছে একটা আবিষ্কার—যে, বিজ্ঞানকে তাহলে এইভাবেও প্রেজেন্ট করা যায়! বিজ্ঞানকে তাহলে একান্ত ভারতীয় প্রেক্ষাপটে এবং ভিন্নতর ভাবে ফোটানো যায়!

    যু: উনিশশো তিয়াত্তরে আনন্দবাজারে আনন্দমেলা-র পাতায় লিপ সেকেন্ড-এর সূত্রে আপনার একটা লেখা বেরিয়েছিল। আপনার লেখাতেও উপস্থাপনার একটা ভিন্ন ধরন কিন্তু তখনই স্পষ্ট। এক সেকেন্ড মানে কার কাছে কতটা, সেটা

    প: বুঝতে পারছি, বুঝতে পারছি। ঠিক। ঠিক।

    যু: তিয়াত্তর মানে আপনি তখন

    প: আমি তখন বসুমতীতে কাজ করছি। তবে তার আগে আরও একটা কথা বলা দরকার। গ্রামে, উত্তরবঙ্গের গ্রামে, আমাদের বাড়ির দুটো তিনটে বাড়ি পরেই ছিল পল্লী পাঠাগার। ষাটের দশকে ওই পল্লী পাঠাগারে প্রচুর খবরের কাগজ এবং ম্যাগাজিন আসত। আনন্দবাজার, যুগান্তর, বসুমতী, অমৃত, দেশ, সন্দেশ, শুকতারা, নবকল্লোল, আমেরিকান রিপোর্টার, সোভিয়েত দেশ, সমস্তই আসত। ওটা বোধহয় বিধান রায় শুরু করেছিলেন, তারপর বোধহয় অতুল্য ঘোষ— প্রফুল্ল সেন তখন চিফ মিনিস্টার। সে সময়ে এমনকী একটা করে রেডিও-ও পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত লাইব্রেরিতে ফ্রি ডিস্ট্রিবিউটেড হয়েছিল। সেই রেডিওর সাউন্ডবক্সটা, একটা কালো বাক্সের মতো, রেডিওর আসল যন্ত্রটা থেকে আলাদা। কোনও অজ্ঞাতকারণে তাতে দুটো মাত্র সেন্টার ধরা যেত। এক, কলকাতা, আর ঢাকা। রেডিও সিলোন টিলোন শোনা যেত না।

    ওই পল্লী পাঠাগারে আমার প্রথম জগৎটা খুলে যায় আর কী। বিকেলে খেলাধুলোর পরে পড়তে বসার আগে আমরা কয়েক বন্ধু মিলে প্রায় ঘন্টা দেড়-দুই ওই লাইব্রেরিতে কাটাতাম।

    যু: এটা কোথায়? দিনাজপুর শহরে?

    প: তখন ছিল পশ্চিম দিনাজপুর, এখন ওটা ভাগ হয়ে দক্ষিণ দিনাজপুরের মধ্যে। শহর নয়। হরিরামপুর।

    যু: ওখানেই আপনার জন্ম?

    প: না, আমার জন্ম হচ্ছে বাংলাদেশে, তখন পূর্ব পাকিস্তান।। আমার উনিশশো চুয়ান্ন সালে জন্ম। কিন্তু আমার বাবা পাকিস্তান হওয়ার পরে ওখানেই থেকে যাবেন বলে স্থির করেছিলেন। তারপরে ঘটনাচক্রে থাকতে পারেননি, উনি পালিয়ে এসেছিলেন আমার যখন একমাস বয়স… জাস্ট আঁতুড়ঘর থেকে বেরিয়েছি আর কী… এসব গল্প আমার বাবার কাছ থেকে শোনা, সেটা হচ্ছে যে আমাকে নিয়ে রাতের অন্ধকারে বাবা এবং মা  বেরিয়ে আসেন। ততদিনে দাদা স্কুল পাস করে কলেজে ভর্তি হয়েছে। আর আমার দিদি স্কুলে পড়ে, আমার সঙ্গে দিদির বয়সের ডিফারেন্স অনেকটা, দাদার সঙ্গে তো আরও বেশি। তো, রাতের অন্ধকারে বাবা মা আমাকে নিয়ে পালিয়ে আসেন। সে সময়ে কলকাতার কলেজের ছাত্র দাদা, আমার বাবাকে নাকি একটা চিঠি লিখেছিলেন, বাবা ওকে নিয়ে আমাদের সংসার তো পথে বেরল, তাই ওর নাম থাক পথিক।

    তো, সেই পল্লী পাঠাগারেই আমার ধারণা আমি জগদ্বন্ধু ভট্টাচার্যের লেখা প্রথম পড়েছি, বোধহয় আমি ক্লাস এইটে পড়ি, তখন। সমরজিৎ করের লেখা আমি হয়তো প্রথম পড়েছি ক্লাস ইলেভেনে, কিন্তু তার আগেই আমার জগদ্বন্ধু ভট্টাচার্যের লেখা পড়া হয়ে গেছে। এবং আমি যাকে বলে একেবারে হুকড, সেটা হয়ে গেছি।

    আমি কলকাতায় এসে ওঁর সঙ্গে আলাপ করেছিলাম, তখন বসুমতীতে কাজ করি। ইন ফ্যাক্ট ‘মহাকাল ও মহাবিশ্ব’ বইটা নিয়ে আমি বসুমতীতে একটা লেখা, রিভিউ আর্টিকল করেছিলাম আর কী। বইটা ছিল আইনস্টাইনের জেনারেল রিলেটিভিটি নিয়ে। রবীন্দ্র পুরস্কার পায়নি, কিন্তু পাওয়ার যোগ্য ছিল।

    যু: তার মানে পড়ার একটা গভীর অভ্যাস তৈরি হয়েছিল ওই সংবাদপত্র ম্যাগাজিন সেসব থেকে, তা, লেখাকেই যে আপনি পেশা করে নিলেন, সেটার বীজ কি সেখানেই—

    প: হ্যাঁ হয়তো একটা সূত্র ছিল। আমি সন্দেশ শুকতারাতে গল্প লিখে পাঠাতাম। অনেক প্রতিযোগিতা আহ্বান করা হত— গল্প প্রতিযোগিতা কবিতা প্রতিযোগিতা—তখন আমি ইস্কুলের ছাত্র। একটাও ছাপা হয়নি যদিও, কিন্তু তখন থেকেই আমার এই একটা সাহিত্যপ্রেম যদি তাকে বলা যায়, তবে সেটা গড়ে উঠেছিল। আমার ধারণা ছিল, স্বপ্নও ছিল, বিজ্ঞানের ভাল ছাত্র হব, গবেষণা করা, বিদেশ যাওয়া এইগুলো আমার স্বপ্ন ছিল। কিন্তু আমার বিএসসিতে রেজাল্ট খুব খারাপ হল।

    যু: বিএসসিতে আপনার বিষয় কী ছিল?

    প: কেমিস্ট্রি। কিন্তু আমার রেজাল্ট এত খারাপ হল যে, ফিফটি পারসেন্টও না, ফরটি থ্রি পারসেন্ট মাত্র। তখন ফিফটি ফাইভ পারসেন্ট পেলে এম এসসিতে ভর্তি হওয়া যেত।  সেটাও একটা অ্যাক্সিডেন্ট আর কী, পরীক্ষার হলে আমার ব্ল্যাক আউট হয়ে গিয়েছিল, সে যাক গে— তো, খুব খারাপ রেজাল্ট হল। সেজন্য আমি এমএসসি পড়ার সুযোগ পাই না। কী করব! তখন আমার একেবারে দিশেহারা অবস্থা... সুনীল গাঙ্গুলি একটা উপন্যাস লিখেছিলেন, অনার্স মিস করা একজন যুবকের কথা, আমার উপন্যাসের নামটা মনে নেই, কিন্তু অনার্স মিস করলে একজন ছাত্রের কী অবস্থা হয় সেটা সেখানে—

    কিছুদিন আমার সামনে একদম অন্ধকার। এগ্রিকালচার পড়ার চেষ্টা করছি, পেপার টেকনোলজি পড়ার চেষ্টা করছি, সেগুলো সব রেসিডেনশিয়াল এবং প্রচুর টাকার ব্যাপার, আমার ফ্যামিলির সেটা অ্যাফর্ড করার ক্ষমতা নেই। তখন আমাদের পাড়ায় একজন থাকতেন, আনন্দবাজারের সাব এডিটর। অরুণ চক্রবর্তী। তাঁর স্ত্রী এবং আমার বউদি প্রাইভেটে বাংলা পরীক্ষা দিয়েছিলেন। অরুণদা পরে ন্যাশনাল বুক ট্রাস্টে বাংলা বিভাগের এডিটর হয়েছিলেন।

    অরুণ চক্রবর্তীর স্ত্রী দীপ্তিদি। একদিন, তখন আমার ওই ফেজটা যাচ্ছে, অনার্সের রেজাল্ট খুব খারাপ করেছি এম এসসিতে চান্স পাইনি, কী করব অন্ধকার, দীপ্তিদি একদিন বললেন, এই শোনো পথিক, আমি তোমার গল্প আমার হাজব্যান্ডকে বলেছি। ও খুব ইন্টারেস্টেড তোমাকে মিট করার জন্য। তুমি একদিন এসো তো আমাদের বাড়িতে। তো, আমি একদিন গেলাম, অরুণদার সঙ্গে আলাপ হল। অরুণদা বললেন, তোমার ভাগ্য বিপর্যয়ের কথা আমি শুনেছি, তো তুমি কী করবে ঠিক করেছ?

    বললাম, কিছুই তো আমার সামনে নেই, অন্ধকার। অরুণদা ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটিতে জার্নালিজমের টিচারও ছিলেন। অরুণদা বললেন, তুমি জার্নালিজমে ভর্তি হয়ে যাও। আমি বললাম সেটা কী জিনিস? জার্নালিজম যে পড়ানো হয়, ওটা পাস করে যে খবরের কাগজে চাকরি পেতে হয়, ওটা পড়ার একটা কোর্স আছে সেটাই আমি জানি না। বললাম, এরকম হয় নাকি? উনি বললেন, হ্যাঁ, তুমি ইউনিভার্সিটিতে যাও।

    অরুণদার পরামর্শেই আমি জার্নালিজম নিয়ে এমএ তে বসলাম, পাশও করলাম। তবে বিএসসি-র ছাত্রের সরাসরি এমএতে পরীক্ষা দিতে বাধা ছিল, সেজন্য স্পেশাল বিএ পাশ করতে হয়েছিল।

    যু: তারপরেই বসুমতীতে যোগ দিলেন। সেখান থেকে টেলিগ্রাফ!

    প: সেও অনেক গল্প। তখন বহুদিন বন্ধ থাকার পর বসুমতী কাগজ আবার চালু হয়েছে, কেদার ঘোষ এডিটর হয়ে এসেছেন, আট পাতা কাগজ, এক ছটাকও বিজ্ঞাপন নেই, ঠাসা ম্যাটার। ফলে প্রচুর ফ্রিল্যান্সার বসুমতীতে ভিড় করল। অরুণদার একজন চেনাজানা ছিলেন, শ্যামল সান্যাল, তিনি তখন বসুমতীতে কাজ করেন, অরুণদা ফোন করে শ্যামলদাকে বললেন, এই শ্যামল, তোর কাছে একটা ছেলেকে পাঠাচ্ছি, একে একটা সুযোগ দে।

    আমি বসুমতীতে গিয়ে লেখালেখি শুরু করলাম। কী লেখালেখি? ওদের তো পাতা ভরাতে হবে। সোমবার ওদের ‘তরুণদের জন্য’ বলে একটা পাতা ছিল, তাতে নানা রকম ফিচার থাকত, ওরাই ভেবে বলল, তুমি সায়েন্স নিয়ে ফিচার লেখো, তোমার তো বিএসসি অবধি সায়েন্স ছিল। সপ্তাহে একটা করে সায়েন্সের ফিচার। ব্যস, আমি শুরু করে দিলাম। সেই প্রথম সমরজিৎ করের কাছে যাওয়া আসা শুরু করলাম, উনি তখন ‘ইসনা’ ছেড়ে সায়েন্স কংগ্রেস-এ জয়েন করেছেন। সমরজিৎদা আমাকে খুব হেলপ করেছেন। প্রচুর মেটেরিয়াল দিয়ে। তখন তো লেখার মেটেরিয়াল, পত্রপত্রিকা পাওয়া যেত না। ইউএসআইএস লাইব্রেরি ছাড়া এবং আমেরিকান সেন্টারের হ্যান্ডআউট ছাড়া, টাইম পত্রিকা-নিউজউইক ছাড়া—

    আমি তখন নিউ সায়েন্টিস্ট পত্রিকা চোখে দেখিনি। এই গত মাসে পুরুলিয়া গিয়েছিলাম সুকান্ত চৌধুরী, সুপ্রিয়া চৌধুরী আর আমার বক্তৃতা ছিল। সুপ্রিয়া চৌধুরী তো অমলেন্দু দাশগুপ্তের মেয়ে। সুপ্রিয়া বললেন, বাবার কাছে আপনার কথা শুনেছি। কীভাবে শুনলেন? ব্যাপারটা হল, সমরজিৎদা আমাকে বলেছিলেন যে— সমরজিৎদাও নিউ সায়েন্টিস্ট পেতেন না— কিন্তু যেহেতু ব্রিটিশ হাই কমিশন স্টেটসম্যানকে খুব গুরুত্ব দেয়, সেজন্য অমলেন্দু দাশগুপ্তর কাছে একটা কমপ্লিমেন্টারি কপি আসে। আমি চলে গেলাম ওঁর কাছে। উনি খুব মুডি মানুষ ছিলেন। আমি গিয়ে অনুরোধ করলাম। বললেন, ঠিক আছে, তুমি আমার কাছ থেকে নিয়ে যেতে পারো নিউ সায়েন্টিস্ট, কিন্তু যেভাবে থাক থাক করে সাজানো থাকে সেইভাবে নিয়ে যাবে এবং ঠিক জায়গায় সেটা রাখবে, পরপর।  তা, আমি ওঁর কাছ থেকে একটা করে নিউ সায়েন্টিস্ট আনতাম, পড়া হয়ে গেলে— জেরক্স আসেনি, হাতে লিখে— আবার সেটা ফেরত দিয়ে আসতাম। সুপ্রিয়াকে বলছিলাম, আমার সেই দৃশ্যগুলো মনে পড়ে। ঘরে ঢুকতাম— অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটরদের বিশাল বিশাল ঘর ছিল— আমি আসতে পারি? মাথাও তুলতেন না। উনি হাত দিয়ে দেখাতেন, নিউ সায়েন্টিস্ট রাখা আছে। ওঁর বাঁ হাতে সিগারেটটা আঙুলে ধরা থাকত, পুড়তে পুড়তে প্রায় আঙুলে ছেঁকা লেগে যাবে, খেয়াল নেই। এক আঙুলে টাইপ করতেন, খুব ছোট্ট একটা টাইপরাইটার ছিল, আমি নিউ সায়েন্টিস্ট আগেরটা রাখতাম আর-একটা নিতাম, বেরিয়ে চলে আসতাম, উনি তাকিয়েও দেখতেন না, মগ্ন, সিগারেটটা পুড়তে পুড়তে আঙুলের কাছে এসে গেছে।

    যু: তখনও আপনি বসুমতীতে ফ্রিল্যান্সার—

    প: হ্যাঁ, কিছু পরে বসুমতীতে একটা ভ্যাকেন্সি হল। চাকরি পেলাম। সাবএডিটর। চাকরি করতে করতে আশি সালে ‘আজকাল’ খুলল, আমি ‘আজকাল’-এ চলে গেলাম। সেটাও বিশাল একটা ব্যাপার। ‘এই সময়’ বেরনোর সময় কী আর এমন হাইপ হয়েছিল। আজকাল বেরনোর সময় যা হাইপ হয়েছিল, কল্পনা করা যায় না— গৌরকিশোর ঘোষ কাগজ করছেন, না জানি সে কাগজটা কী হবে।

    গৌরকিশোর ঘোষ, আর ছিলেন হামদি বে। চারটে স্ক্রিনিং হয়েছিল। একটি চিঠি এল, এই কুড়িটা বই পড়ে এসো, তারপরে তোমাদের ইন্টারভিউ হবে। কুড়িটা বইয়ের নাম আমার মনে নেই, কয়েকটা মনে আছে, তার মধ্যে যে-বইটা আমি প্রথম পড়লাম, ওই ইন্টারভিউ না দিলে পড়তাম না হয়তো, সেটা হল বার্ট্রান্ড রাসেলের ‘হিস্ট্রি অফ ওয়েস্টার্ন ফিলোজফি’— ওহ। ওই সময়েই আমি কিনলাম বইটা, আজও আছে। জেমস ফ্রেজারের ‘গোল্ডেন বাও’। কিনতে পারলাম না, আমাকে পশুপতিপ্রসাদ মাহাতো, অ্যানথ্রোপলজির, উনি ওঁদের লাইব্রেরি থেকে সাপ্লাই করেছিলেন। আর্নল্ড টয়েনবির ‘হিস্ট্রি অফ দি ওয়ার্ল্ড’, পার্সিভ্যাল স্পিয়ারের ‘হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়া’, রোমিলা থাপারের হিস্ট্রির ওপরেই আর একটা বই, এরকম কুড়িটা বই। আমি বোধহয় গোটা এগারো বারো বই জোগাড় করতে পেরেছিলাম, বাকিগুলো পারলাম না। কেউই পারেনি। তারপর একটা ইন্টারভিউ হল, ইন্টারভিউয়ে স্ক্রিনিং হল, স্ক্রিনিং-এর পরে পাঁচ হাজার ওয়ার্ডের একটা ‘এসে’ জমা দিতে হল। আমি, সুমন, বিশ্বজিৎ রায়, অরুন্ধতী মুখার্জি, মৃত্তিকা মিত্র, পুলক লাহিড়ি, পূষন গুপ্ত, দেবাশিস ভট্টাচার্য সব আমরা ওইভাবেই সিলেক্টেড আর কী। ছিলেন সুব্রত সেনগুপ্ত, রমানাথ রায়। কিন্তু আমার কিছুদিন চাকরির পরেই হামদি বে-র সঙ্গে ঝামেলা হল। ছুতোনাতায় আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার শুরু করলেন। আমি না বলে ‘আজকাল’-এ যাওয়া বন্ধ করলাম। 

    তখন আমার বসুমতীতে চাকরি নেই। চাকরি ছেড়ে গেছি। কিন্তু বসুমতীতে তখন এডিটর হয়ে এসেছেন, স্টেটসম্যান থেকে এসেছিলেন, প্রশান্ত সরকার। তিনি আমাকে খুব ভালবাসতেন। আমি প্রশান্ত সরকারের কাছে গিয়ে বললাম, আমি টিকতে পারছি না ওখানে। তিনি আমাকে বললেন, তুমি এখানে আসবে? বললাম, আমি তো রেজিগনেশন দিয়ে গেছি, কী ভাবে হবে সেটা? উনি ড্রয়ার থেকে আমার রেজিগনেশন লেটারটা বের করলেন। বসুমতী তখন গভর্নমেন্টের আন্ডারে ছিল তো, রেজিগনেশন, অ্যাপয়েন্টমেন্ট সেগুলো অ্যাপ্রুভ হত বোর্ডের মিটিং-এ। মাঝখানে তিনমাস বোর্ডের কোনও মিটিং হয়নি। তিনি ড্রয়ার থেকে রেজিগনেশন লেটারটা বার করে বললেন, এটা ছিঁড়ে ফেলে দি? তুমি আর একটা ফ্রেশ অ্যাপ্লিকেশন দাও, স্টাডি লিভে যাচ্ছো তিনমাসের জন্য।

    যু: বসুমতী, আজকাল, ফের বসুমতী। তারপর টেলিগ্রাফ?

    প: বসুমতীতে থাকাকালীনই, আজকাল-এ যাওয়ার আগেই, আমি সানডে-তে ফ্রিল্যান্স করতাম। ইন ফ্যাক্ট আই ওয়জ দা ফার্স্ট ফ্রিল্যান্সার টু গো অ্যান্ড মিট আকবর। টেলিগ্রাফে দু’জনের চাকরি হয়েছিল অন কমপ্যাশনেট গ্রাউন্ড। এক, পথিক গুহ। আর এক, বরুণ ঘোষ। বরুণ ঘোষ এবং আমি টেলিগ্রাফে চাকরি পেয়েছিলাম স্রেফ আকবরের দয়ায়। আমরা দু’জনেই বাংলা মিডিয়াম স্কুল থেকে টেলিগ্রাফে চাকরি পেয়েছিলাম। আর একজনও তা ছিল না, বোধহয় চল্লিশজন জয়েন করেছিল।

    সানডে-তেও আমি একবার ইন্টারভিউ দিয়েছিলাম। সেবার আকবর আমাকে ইন্টারভিউতে বসেই বললেন, পথিক, আমি এখন সানডে-তে তোমাকে চাকরি দিতে পারছি না। তখন আমি বসুমতীতে চাকরি করি, কিন্তু সানডেতে ফ্রিল্যান্স করি। আমার দশ-বারোটা স্টোরি বেরিয়ে গেছে সানডে-তে। ইনক্লুডিং যেটা কভার স্টোরি হবার কথা ছিল, কিন্তু সেকেন্ড কভার স্টোরি হয়েছিল— ফার্স্ট টেস্ট টিউব বেবি। লুইস ব্রাউন।

    যু: সানডে-তে হল না, কিন্তু টেলিগ্রাফে— সেই একই এম জে আকবর

    প: হ্যাঁ। টেলিগ্রাফে ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন পবিত্র মুখার্জি, গৌতম অধিকারী, সুবীর রায় আর এম জে আকবর। আমি যখন ইন্টারভিউ দিতে ঢুকলাম, তখনই আকবর উঠে টয়লেটে চলে গেলেন। আমার ইন্টারভিউ শেষ হল আর আকবর ঢুকলেন। আমি ভাবলাম, যে-লোকটা আমাকে চাকরি দেবে বলে আমার মনে হয়, সে লোকটাই নেই! তা হলে আর আমার কী হবে। ওঁরা আমাকে সামান্য দু’-চারটে প্রশ্ন করলেন। আমি খুব ফ্রাস্টেটেড হয়ে গেলাম। পরে সুবীর রায়কে, যখন ওঁর সঙ্গে একটু চেনাজানা হল, কথাটা জিগ্যেস করেছিলাম। উনি বললেন, আকবর তোমার ইন্টারভিউতে ছিল না আর বরুণের ইন্টারভিউতে ছিল না। দু’বারই ও টয়লেটে গেল, আর যাবার সময় আমাদের বলে গিয়েছিল, ডোন্ট আস্ক দিস বয় মেনি কোয়েশ্চন। জাস্ট টেক হিম।

    যু: টেলিগ্রাফে আপনি প্রথমে ছিলেন পলিটিক্যাল রিপোর্টার।

    প: সে-ও মজার। টেলিগ্রাফে চাকরি হল, প্রথমে সাব এডিটর। শেখর ভাটিয়া নিউজ এডিটর। শেখরের মনে হল, এ ডেস্কে ভাল পারছে না, রিপোর্টার করে দেওয়া হোক। বুঝুন, ডেস্কে ভাল পারছে না বলে রিপোর্টার! যাই হোক, প্রথমে করপোরেশন, পুলিশ— আমাকে অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের বিট কখনও করতে হয়নি, রাইটার্সে বোধহয় সাকুল্যে পনেরোদিন গেছি। তারপরেই পলিটিক্স। খবরের কাগজে পলিটিক্সের রিপোর্ট করাটা কেরিয়ারের এন্ডে আসে, যে-পলিটিক্সের রিপোর্ট করে সে মোটামুটি সিনিয়র এবং ধরে নেওয়া হয় যে, সে ভাল কাজ করছে। এইটাই আমাদের এখানকার নিয়ম, যদিও আমি আমেরিকায় খোঁজ নিয়ে দেখেছি যে ওখানে এরকম নয়। আমাদের এখানে পলিটিক্স ইজ ভীষণ ইম্পর্ট্যান্ট— তো, আমি পলিটিক্যাল খবর করতাম এই দেবাশিস ভটচায আশিস ঘোষ, এদের সঙ্গে এখনও সেইসব নিয়ে হাসাহাসি হয় আর কী।

    যু: কিন্তু তখনই আপনি এখানে বেশ কিছু বিজ্ঞানের লেখা লিখে ফেলেছেন।

    প: হ্যাঁ, তবে তার আগে আনন্দবাজারের একটা ঘটনা বলা দরকার।

    গৌরী চট্টোপাধ্যায় তখন আনন্দবাজারের পত্রিকা বিভাগে, যেটা বুধবার আর শনিবার বেরত, সেইটাতে জয়েন করেছেন। তো, আশিস ঘোষ আমাকে নিয়ে আলাপ করিয়ে দিল গৌরীদির সঙ্গে। গৌরী চট্টোপাধ্যায় নাকি অন্য ধরনের লেখা খুঁজছেন। উনি বলছেন একটু বাচ্চা বাচ্চা ছেলে, ইয়ং ফেস আমাকে এনে দিতে পারো যারা নতুন করে ভাববে টাববে। আশিস ঘোষ আমাকে নিয়ে গেল যেহেতু আমার সায়েন্স ভাল লাগে। আমি বললাম, একটা স্টোরি আছে, হোয়াট ইজ দি আলটিমেট কনস্টিটুয়েন্ট অফ ম্যাটার। এটা সায়েন্সের আর্টিকল। উনি বললেন, বাঃ গুড। লিখে ফেলো।

    লিখে ফেললাম। গৌরীদি এখনও বলেন যে, পথিক, আমি লেখাটা পেয়ে কয়েক মিনিট স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম— অ্যাকর্ডিং টু হার— আমার মনে হচ্ছিল যে আনন্দবাজার এটার যোগ্য নয়, আমি অভীক সরকারকে গিয়ে বলি এই লেখাটা আপনি দেশ-এ দিয়ে দিন। তা যাই হোক উনি ছাপলেন। খুব রিয়্যাকশন হল।

    অভীক সরকার সেই সময়টাতেই রবিবাসরীয়তে দিব্যেন্দু পালিতকে এনেছেন। এবং কভার স্টোরির কনসেপ্টে ভাবছেন, এটা উনিশশো অষ্টআশি সালের কথা। স্টিফেন হকিং-এর বইটা বেরিয়েছে। এবং গৌরীদিও বলেছেন বইটার কথা— মানে, পার্থ চট্টোপাধ্যায় আমেরিকা থেকে পড়িয়ে ফেরত এসেছেন, এবং ওই বইটা নিয়ে এসেছেন। বইটা যে-সপ্তাহে বেরয়, ব্যান্টাম বুকস নিউ ইয়র্ক হারবারে জাহাজের মধ্যে পার্টি দিয়েছিল। টাইম ম্যাগাজিনে নিউজ উইকে কভার স্টোরি হয়েছিল ওই বই। আমার বইটা খুব পড়ার ইচ্ছে ছিল। পার্থদা বইটা কিনেছেন, ফ্লাইটে আসতে আসতে পড়েছেন। গৌরীদি আমাকে পড়তে দিলেন। আমি বললাম, যত ভাল বলা হচ্ছে তত ভাল নয়, কিন্তু বইটা মোটামুটি ভাল বিক্রি হবে দেখবেন আপনি। গৌরীদি বললেন, একটা লেখা যাক এটা নিয়ে এবং স্টিফেন হকিংকে নিয়ে।

    অভীক সরকারকে গৌরীদি যখন বলছেন যে, এই সপ্তাহে এইটা যাচ্ছে, অভীকবাবু বললেন, না, ওই লেখাটা রবিবাসরীয়তে যাবে। তখন আমি টেলিগ্রাফে, এবং পলিটিকসের রিপোর্টার। অভীক সরকার আমাকে ডেকে বললেন, এই লেখাটা আপনি আনন্দবাজারের ‘পত্রিকা’তে দেবেন না ‘রবিবাসরীয়’তে দিন, আমি দিব্যেন্দুকে বলে দিচ্ছি। দিব্যেন্দুদাও আমাকে ডেকে পাঠালেন, লেখাটা তাড়াতাড়ি দিয়ে দিন। লেখাটা বেশ কষেই লিখলাম। সেই লেখাটা গেল।

    আমাদের চিফ রিপোর্টার ছিলেন তরুণ গাঙ্গুলি, অভীক সরকার তাঁকে বললেন ওই ছেলেটাকে আমি আনন্দবাজারের অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর করে নিতে চাই। তো, তরুণদা আমাকে বললেন, মাস্টার, তুমি গেলে। অভীকবাবু নিখিলদার ডিপার্টমেন্টে তোমাকে চাইছেন। আমি বললাম আমাকে বাঁচান, আমি এটা একদমই চাই না, দিব্যি আছি। আমার কারণ আনন্দবাজার সম্পর্কে আমার অসুবিধা ছিল, ইন ফ্যাক্ট নিখিলদা সম্পর্কেও আমি শুনেছিলাম, তিনি খুব দাবড়ে রাখেন, খুব হার্ড টাস্ক মাস্টার ইত্যাদি। ওদিকে তরুণদা খুবই ভাল বস ছিলেন। বললাম, তরুণদা আপনি এটা আটকান। তরুণদা খুব লড়াই করে সেটা আটকে দিলেন। তাই অনির্বাণ (চট্টোপাধ্যায়) এখনও ঠাট্টা করে বলে, কবে আসার কথা ছিল আনন্দবাজারে, আর কবে এলে!

    যাই হোক, আমি পলিটিকসের রিপোর্ট করছি তখন। নাইনটি টুতে এসে টেলিগ্রাফ দেখল যে অনেকদিন হয়ে গেছে, দশ বছর হয়ে গেছে, কিন্তু স্টেটসম্যানের সঙ্গে কিছুতেই পেরে ওঠা যাচ্ছে না। তখন আকবর চলে গেছেন, শেখর ভাটিয়া চলে গেছেন। সুমিরলালকে আনা হল এগজিকিউটিভ এডিটর করে এবং খোঁজা হতে থাকল কেন টেলিগ্রাফ পারছে না। বাঙালি বাড়িতে টেলিগ্রাফ ঢুকছে না, অবাঙালির বাড়িতেই টেলিগ্রাফ মোটামুটি কনফাইনড। কেন বাঙালি বাড়িতে ঢুকছে না? না, বাঙালিরা টেলিগ্রাফকে ফ্লিপ্যান্ট মনে করছে। সিরিয়াস নয়। টেলিগ্রাফকে সিরিয়াস হতে হলে কী করতে হবে? ফিচার বের করতে হবে। সিরিয়াস ফিচার। আর্টস অ্যান্ড আইডিয়াজ, নোহাউ, এন্টারটেনমেন্ট-সিনেমা-টেলিভিশন এইগুলো বের করতে হবে। সুমিরলাল আমাদের সঙ্গে টেলিগ্রাফের প্রথম ব্যাচ, তারপর চলে গিয়েছিল এক্সপ্রেস-এ, তারপর টাইমস-এ, তাকে ফেরত আনা হল এগজিকিউটিভ এডিটর হিসেবে। সুমির দেখে গেছে আমি পলিটিক্সের রিপোর্ট করতে করতে সায়েন্স কংগ্রেস কভার করতে যাই, টুকটাক সায়েন্সের লেখা লিখি, তার কারণ সায়েন্সের ব্যাপারটা আমার মাথার মধ্যে ছিলই আর কী।

    এটাও একটা ঘটনা যে, পলিটিকসে ক্রমশ ইন্টারেস্ট হারিয়ে ফেলছিলাম। পলিটিক্স খুব বোরিং মনে হত। কিন্তু সায়েন্সের কোনও একটা বই বেরল, কোনও নতুন ডিসকভারি হল, আমি সেটা নিয়ে টেলিগ্রাফে লিখতাম। এডিট পেজেই লিখতাম। এমনকী নাইনটিন এইট্টি থ্রিতে যখন সুব্রহ্মণ্যম চন্দ্রশেখর নোবেল প্রাইজ পেলেন তখনও, এক বছর হয়ে গেছে টেলিগ্রাফ বেরিয়েছে, আকবর বললেন, এই, তুমি তো সায়েন্স লেখো, চন্দ্রশেখরকে নিয়ে একটা লেখা লেখো তো দেখি।

    তো, সুমির যখন নোহাউ করতে চাইল তখন সুমির বলল, পথিক, তোমাকে যদি পলিটিকস থেকে অফ করে পুরোপুরি সায়েন্সে দেওয়া হয়, তুমি কাজ করবে? আমি বললাম এক্ষুনি করব। তুমি আমাকে এক্ষুনি করে দাও। এবং ও করে দিল। সেই শুরু হল নোহাউ। তার আগে অবশ্য আমি যখন রবিবাসরীয়তে লিখছি, তখন দেশ-এ সমরজিৎ করকে বন্ধ করে আমাকে লিখতে বলা হয়েছিল। আমি টেলিগ্রাফে পলিটিক্যাল রিপোর্টার, কিন্তু দেশ-এ তখন সায়েন্সের লেখা লিখছি।

    যু: তখন আপনি একই সঙ্গে বিজ্ঞান লেখক এবং সম্পাদক। কীভাবে প্ল্যান করতেন বিষয়গুলো?

    প: তার আগে বলি, একটা কথা আমরা প্রায়ই আলোচনা করতাম। অনেকগুলো বিভাগ আমাদের টেলিগ্রাফে শুরু হল, নোহাউ, আর্টস অ্যান্ড আইডিয়াজ, উইমেন, সিনেমা— আমি সহকর্মীদের বলতাম, হয়তো খুব বায়াসড হয়েই বলতাম, যে, উইমেন পাতার বিষয়বস্তু কী? স্ত্রী জাতির প্রতি অত্যাচার অবিচার, কিন্তু তোমরা লক্ষ করে দেখো যে, এটা সপ্তাহের পর সপ্তাহ বলে যাওয়ার মধ্যে একটা মোনোটোনি আছে। কিন্তু সায়েন্স, অলদো ইট ডিলস উইদ ডিসকভারি, কিন্তু সেই ডিসকভারিগুলো এত বিচিত্র যে, এর মধ্যে কোনও মোনোটোনি নেই। হয়তো ফিল্ম তেমনটা নয়, কিন্তু আমরা অন্য পাতাগুলোর চেয়ে অ্যাডভান্টেজিয়াস পজিশনে আছি। এইটা আমাদের সহকর্মীদের মধ্যে একটা ইনস্পায়ারিং ফ্যাক্টর ছিল। আমরা সেটাকে ক্যাশ ইন করতে পারব কি পারব না সেটা আমাদের স্কিল বা আনস্কিলের ব্যাপার। কিন্তু অ্যাজ আ সাবজেক্ট সায়েন্স প্রোভাইডস আস উইদ মাচ মোর অপারচুনিটি দ্যান আদার সাবজেক্টস। ওরাও বিশ্বাস করত যে, সায়েন্স ক্যান বি একসাইটিং ইফ ইট ইজ প্রেজেন্টেড ইন দ্যাট ফ্যাশন।

    আমি ওদেরকে বলতাম যে, দেখো অন্যেরা কীরকম করে করছে। অভীক সরকার এ কথাটা বলতেন, ট্রাই টু ইমিউলেট। আমরাও বিশ্বাস করতাম, সাহেবরা যদি পারে, তাহলে আমরাও পারব। আর একটা সুবিধে হয়েছিল, আমাদের সঙ্গে নিউ ইয়র্ক টাইমসের অ্যারেঞ্জমেন্ট ছিল, ফলে কোনও সপ্তাহে কিছু নেই, তো নিউ ইয়র্ক টাইমস-এরটা চালিয়ে দাও— ডেনিস ওভারবি, জর্জ জনসন। কিন্তু অ্যাট দা সেম টাইম, আমি, প্রসূন (চৌধুরী), পথিক ঘোষ, দেবু (দেবকুমার মিত্র), যুধিজিৎ (ভট্টাচার্য)— আমরা ওদের লেখাগুলো পড়ে আলোচনা করতাম— এই জায়গাটাতে কীভাবে ম্যানেজ করেছে— এইসব।

    আরও একটা ব্যাপার, যেটা নিয়ে আমাদের মধ্যে ডিবেট তৈরি হয়েছিল, সেটা খুব ফ্যাসিনেটিং। ২০১১ সালে রবার্ট ক্যানিগেল এসেছিলেন বাঙ্গালোরে। তো, ওখানে ইন্ডিয়ান সায়েন্স রাইটিং নিয়ে সেমিনার ছিল, সেখানে আমাদেরকেও বলতে হয়েছিল। সেখানে আমার বলার বিষয়টা ছিল, অ্যান ইলিউশন অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং। এফএলটি (ফার্মাজ় লাস্ট থিওরেম) নিয়ে তো দুটো বই হয়েছে, একটা সাইমন সিং-এর আর একটা আমির অ্যাকজেল-এর। অ্যাকজেল-এর বইটার ফ্ল্যাপে নিউ ইয়র্কারের রিভিউয়ার-এর একটা কমেন্ট আছে। কমেন্টটা কী? কমেন্টটা হচ্ছে, দিস ইজ আ ম্যাথমেটিক্যাল বনবন অফ আ বুক। কী সুন্দর! নিউ ইয়র্কারের লেখক হতে হলে ওরকমই হতে হয়। দিস স্লিম বুক ক্রিয়েটস অ্যান ইলিউশন অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং। ওফ! আমার কাছে ওটা খুব আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল। দেবু অবশ্য এই ডিবেটে মনে করত, না, অ্যাজ আ সায়েন্স জার্নালিস্ট আওয়ার ডিউটি ইজ টু ডিমিস্টিফাই সায়েন্স অ্যান্ড উই শুড নট ক্রিয়েট অ্যান ইলিউশন অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং। আমি বলতাম যে, দেবু, আমরা এক্সপার্ট নই, আমরা সায়েন্টিস্ট নই, আমরা জার্নালিস্ট, পাঠকও এক্সপার্ট নয়। ধরো পার্টিকল ফিজিক্সের কোনও ইনট্রিকেট বিষয় আমরা বোঝাতে চাই, তাহলে আমাদের কি সেই স্কিল আছে, সেই এডুকেশন আছে? আমি কি রিচার্ড ফাইনম্যান? আমি এমনকী পল ডেভিসও নই, পল ডেভিসও ফিজিক্সের প্রফেসর। আমি তো একটা বিএসসি-তে পড়া ফিজিক্সের ছাত্র। তো, আমাদের কাজ নয় পুরোটা বুঝে তারপর লেখা। এটা জর্জ জনসনও একটা লেখায় লিখেছিলেন, যে আমাদের লেখা পড়ে অনেকে মনে করেন আমরা সবটা বুঝে লিখেছি। আমরা তো বুঝতে পারি না সবটা। কিন্তু তবুও আমাদের কাজ হচ্ছে, আমরা যে বুঝেছি এটা পাঠককে বোঝানো।

    যু: ইলিউশনটা থেকেই যায়

    প: হ্যাঁ, হোয়াট উই ক্যান গিভ ইজ ওনলি অ্যান ইলিউশন। এটা কীরকম বলছি— স্টিফেন হকিং-এর একটা বায়োগ্রাফি লিখেছেন জন গ্রিবিন, তাতে এই এপিসোডটার কথা আছে। মস্কো থেকে নিউ ইয়র্ক যাচ্ছে একটা ফ্লাইট। তখন নাইনটিন এইট্টি এইট, স্টিফেন হকিং-এর বইটা বেরিয়েছে। আন্দ্রেই লিন্ড বসে আছেন, তার পাশে একজন প্যাসেঞ্জার বসে আছেন। তিনি ‘ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টাইম’ পড়ছেন। আন্দ্রেই লিন্ড, যাঁর কাজ ওই বইটাতে, ‘ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টাইম’-এ ডিসকাসড হয়েছে, তিনি বলছেন, আপনি বইটা পড়ছেন? —হ্যাঁ হ্যাঁ, পড়ছি, দারুণ বই। আপনি পড়েছেন? তা, আন্দ্রেই লিন্ড বলেছেন, মজা করার জন্যই বলেছেন, হ্যাঁ, আমি পড়েছি কিন্তু বেশিদূর এগোতে পারিনি। আমার কাছে বইটা কঠিন মনে হয়েছে। তো, ওই সহযাত্রী আন্দ্রেই লিন্ডকে বলছেন, কোন জায়গাটা আপনি দেখান তো, আমি বুঝিয়ে দিচ্ছি আপনাকে।

    এইটা হচ্ছে স্টিফেন হকিং-এর স্কিল। এমন করে লিখেছেন যে, পাঠক মনে করছেন বুঝেছেন, কিন্তু কিছু বোঝেননি আর কী! তো, অ্যাজ আ সায়েন্স জার্নালিস্ট আমার মনে হয়েছিল যে, ইলিউশন অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিংটা তৈরি করা খুব কঠিন।

    যু: প্রতি সপ্তাহে নোহাউ-এর প্ল্যান করার সময় কী দেখতেন, স্টোরির কোন গুণটা—

    প: একটা এই যে, এই একটা কভার স্টোরি, সেটা ওই সপ্তাহেই নিতে হবে, পরের সপ্তাহে নিলে পুরনো হয়ে যাবে। সেটা জার্নালিস্টিক কারণ। আর হল, ফিলোজফিক্যাল অ্যাপিল কোন জিনিসটায় বেশি। পাঠক কোন জিনিসটাতে বেশি হুকড হবে, গেঁথে ফেলবে পাঠককে। সোমবারে কাগজটা বেরত, আমরা সোমবারেই মিটিং করতে বসতাম যে, নেক্সট উইকের কভার স্টোরি কী হবে। অবশ্যই এটা কেবল আমরা ভাবতাম, পাঠক সেরকম ভাবত কিনা আমি জানি না, তবে— অনেকেই সেই সময়ের নোহাউয়ের কথা বলেন। গৌরীদি একদিন আমাদের বলেছিলেন, জানো, ভিক্টর ব্যানার্জি কী বলেছে অভীক সরকারকে? টেলিগ্রাফে ওই একটাই সেকশন পড়া যায়, নোহাউ। উই ইউজড টু বি ভিনডিকেটেড যে, পাঠক তো পছন্দ করছে। ফিলোজফিক্যাল অ্যাপিল যে-টপিকটায় আছে সেটাই, রাদার দ্যান ইউটিলিটি। এই ইউটিলিটির থেকে আমরা দূরে থাকতাম।

    রিপোর্টিং-এর কাজ করতে করতেও আমার মনে হচ্ছিল যে, রিপোর্টিং বোধহয় আমার ফিল্ড নয়। আমার মতো করে লেখালেখিটাই গ্রাসাচ্ছাদনের উপায় হতে পারে। এখনও আমি খবর খুব কম পড়ি, একটু আধটু খেলার খবর হয়তো, কিন্তু খবর আমাকে আকর্ষণ করে না। আমাকে অনেক বেশি আকর্ষণ করে কোনও ফিচার, মূলত অখবর, যেটা খবরের বিভাগে পড়ে না। খবর আমার কাছে খুব রিপিটিটিভ মনে হয়, কিন্তু ক্রেগ ভেন্টার কিছু করছে, সেটা আমার মনে হয় যেন, আঃ, শয়তানটা আবার কী করে বসল।

    যু: আজকাল যেমন বিজ্ঞানের লেখার নামে স্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেশ

    প: ঠিক ঠিক, আমরা এ থেকে দূরে থাকতাম। থাকার চেষ্টা করতাম। আমরা মনে করতাম আমাদের কাজ টিপস দেওয়া নয়।

    যু: আপনার কি মনে হয় যে এই পরিবর্তনটা কোনও জেনারেল ট্রেন্ড?

    প: তা বটে। ইউটিলিটারিয়ান হতে হবে, চার্ম, ফিলোজফিক্যাল আপিল, কিউরিয়োসিটি এগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হবে না, এটা রিসেন্ট ট্রেন্ড।

    যু: সামাজিক-অর্থনৈতিক কোনও লক্ষণের সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতে পারে বলে মনে হয়?

    প: হয়তো, হিয়ার অ্যান্ড নাও বলে যে একটা কথা আছে— চটজলদি উপকার কিসে হবে বলো, ভবিষ্যতের কথা আমি জানতে চাই না, এক্ষুনি কী দিতে পারো তুমি, এই মানসিকতা এখন পরিব্যাপ্ত। চারদিকে। সোসাইটিতে। আমি কালকে বাঁচতে চাই না, আমি আজকে বাঁচতে চাই। তার থেকেই এটা চলে আসছে বলে আমার মনে হয়।

    এটা একটা কারণ, আর একটা কারণ হয়তো, আমার কখনও কখনও মনে হয়, জন হোরগ্যান হয়তো ঠিকই লিখেছিলেন, এন্ড অফ সায়েন্স। সত্যিই তো, কোয়ান্টাম মেকানিকসের পরে তো বিজ্ঞানের আর তেমন বড় পরিবর্তন নেই। টিওই, থিয়োরি অফ এভরিথিং তো পাওয়া গেল না এখনও অবধি, স্ট্রিং থিয়োরি তো এখনও অবধি হ্যাজ নট ফুলফিলড ইটস প্রমিস, সেটা জটিল গণিতই হয়ে থাকল। সে যত সুন্দরই হোক, সে গণিত উপভোগ করার মতো মানসিকতা বা ট্রেনিং তো আমাদের নেই। অশোক সেন যত সহজে স্ট্রিং থিয়োরি নিয়ে মত্ত থাকতে পারেন একজন সাধারণ মানুষ তো পারে না। ফলে সাধারণ মানুষের আগ্রহ ডেঙ্গির ওষুধ আবিষ্কার হয়েছে কি না— এমনকী ক্যানসারেরও নয়, মানুষ ধরেই নিয়েছে ক্যানসারের ওষুধ আবিষ্কার হবে না— ডেঙ্গির ওষুধ আবিষ্কার হয়েছে কি না সেটাই বড় খবর। ...

     

    সম্পূর্ণ সাক্ষাত্কারটি পড়ার জন্য সংগ্রহ করুন ‘বইয়ের দেশ’ অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০১৭ সংখ্যা।