Travelogue

রসিকবিল স্যাংচুয়ারি

অরুণাংশু চট্টোপাধ্যায়

  • পরশুরামের ‘বিরিঞ্চিবাবা’ মানে সত্যজিৎ রায়ের ‘মহাপুরুষ’। মহাশয় সূর্যদেবকে হাত নেড়ে বলছেন ‘ওঠ ওঠ ওঠ...।’

    তারপরই ঝুপ করে নবারুণ উদয় হলেন।

    রহস্যটা জানা আছে। কালের নিয়মে এমনটা হয়।

    তাই প্রভাতের এ‌ই রূপ সচরাচর দেখা হয়ে ওঠে না। তাই হয়তো জীবনের তেমন কোনও মানেই ছিল না। সেটা ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে বুঝতে পারলাম। তপ্ত কনকাভরণের রঙে দীপ্ত কনক আভা। ঢেকে গেল গোটা আকাশ।

    ঘন সবুজ চা বাগান। তাতে ঘুরন্ত অবিরত জলের ধারা যৌবনোচ্ছল করে তুলেছে চা-গাছগুলোকে। লেপচা-নেপালি-মদেশিয়া সুন্দরীদের নরম গরম হাতের ছোঁয়া দু’টি পাতা একটি কুঁড়ি। সেই জন্যে বুঝি চায়ের কাপে তারা প্রাণোচ্ছল হয়ে ওঠে।  

    এটাই রূপসী প্রকৃতির প্রেমে পড়বার মোক্ষম সময়।

    ট্রেনটা নিউ জলপাইগুড়ি ছেড়ে মাল জংশন হয়ে চলেছে। এক দিকে পাহাড়। অন্য দিকে চা বাগান। সঙ্গে নদী জঙ্গল। সবটাই এই পথের উপরি পাওনা।

    ইস্পাতের দুই ঝকঝকে ফলা গাঢ় সবুজের বুক চিরে এগিয়ে চলেছে গন্তব্যের দিকে। থমথমে জঙ্গল। মৌনতা ভেঙে ভস্ ভস্ শব্দ। নীরস লাগতে পারে। জঙ্গলের ভেতর ইস্পাত-দৈত্য হুইসেল দিয়ে সাবধান করে দেয়। ‘পশুর দল আমার কাছে এসো না। আমি তোমাদের ভালবাসি।’

    আলিপুরদুয়ার। বেশ জমাটি মফস্সল। বাজার-দোকান সবই রয়েছে।

    কালো আঁকাবাঁকা পিচের রাস্তাটা যেন অপটু হাতের আঁকা। একসময় এখানে ঘন দুর্ভেদ্য জঙ্গল ছিল। কিন্তু তা এখন ইতিহাস। তবু রাস্তার দু’পাশে নয়নাভিরাম কিছু সবুজের সারি। মন ভাল করে দিল।

    অজানা ফুলের দল সমবেত ভাবে দুলে দুলে বার্তালাপ করে চলেছে। কী ঠান্ডা কী গরম! বোগেনভিলিয়া সদা হাস্যময়।

    ছোট্ট মাটির ছিটেবেড়ায় চায়ের বিরতি।

    সাঁওতাল রমণীরা মাথায় কাঠের বোঝা নিয়ে ‘ঘরকে’ চলেছে। অদ্ভুত ব্যালেন্স! জঙ্গলে শুকনো কাঠ কুড়োনো তাদের জীবিকা। কাঠের আগুনে এখনও রান্না সারে।

    আদুল গায়ে ছোট ছেলেরা ছুটে ছুটে খেলা করছে। বয়স্ক এক ভদ্রলোক খাটিয়ায় বসে বিড়ি ফুঁকছে। তার পায়ের তলায় শোয়া নেড়িটা দিব্বি ল্যাজ নাড়ছে। মাটির পাঁচিলে একটা মোরগ উড়ে এসে জুড়ে বসল। পালক ফুলিয়ে দুর্দান্ত মুরগিটাকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে।

    হালকা মাদলের সুর ভেসে আসছে। গোবর দিয়ে নিকোনো খড়ের চাল দেওয়া ঝকঝকে মাটির বাড়িগুলো। এটাই এখানকার বৈশিষ্ট্য।

    আমরা কোচবিহার জেলার তুফানগঞ্জ থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে রসিকবিলে এসেছি। ১৭৫ হেক্টর ব্যাপ্তি নিয়ে বিলটার বিস্তার। ঠিক হিমালয় রেঞ্জের সিনটুরা পাহাড়ের পাদদেশে। পাঁচটা বিল। নাম, নিলডাবা, বোচামারি, রাইচাংমারি, শঙ্খডাঙা, রসিকবিল।

    চারদিকটা যেন ঘন জঙ্গলের ঘেরাটোপ। নাগুরহাট, আটাশমোচার, বোচামারি জঙ্গলের আঁচলে লেপটে রয়েছে। এখানে সারবাঁধা কদম, মিনজুরি, শিশু, শাল, জিয়ল গাছ লক্ষ করার মতো।

    একটা সেতু রয়েছে ঝিলের উপর। ডান পাশে প্রায় তিরিশটা হরিণ খাঁচায় বন্দি। আর একটু এগিয়ে গেলে লেপার্ড উদ্ধার কেন্দ্র। চারটে লেপার্ড রাজত্ব চালাচ্ছে। আর সোজা কাঁচা রাস্তাটা স্থানীয় বস্তির দিকে চলে গেছে। রাস্তার পাশে বিশাল জিয়ল গাছ। তাতে পাহাড়ি টিয়া, মুনিয়া, বসন্তবৌরী, বৌ কথা কও, কোকিলের মজলিস চলছে। ঘড়িয়াল, পাইথন, ময়ূর ইত্যাদি খাঁচায় বন্দি। সাউথ খয়েরবাড়ির মতো এটাও একটা পুনর্বাসন কেন্দ্র।

    রাস্তার ওপারে ঝিলের কাছেই রয়েছে সরকারি টুইন কটেজ। খাবারের অর্ডার দেওয়ার জন্য রেস্টুরেন্টে যেতে হল।

    সামনেই নজরমিনার পাখপাখালি দেখবার জন্য। তবে বিশাল ঝিলে নৌকায় চড়ে পাখি দেখার মজাটাই আলাদা। ঝিলের টলটলে জলে নৌকা চাপবার ব্যবস্থা করে নিতে হলে স্থানীয় মাঝিরাই কাজে আসবে।

    প্রচুর মাছ চাষ হয় এই জিলে। শোল, বোল তো আছেই। ব্যাঙকে টোপ করে অনেক ছিপ ডোবানো রয়েছে। প্রয়োজনে অবশ্য টানা বা মাথা-ঘুরনি জাল ফেলেও মাছ ধরা হয়। মাছ এখানকার অর্থনীতির একটা বড় অংশ। সেসব চালান যায় আলিপুরদুয়ার, শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ির মার্কেটে।

    দেখতে পাচ্ছি দুটো রাজহাঁস আলাপনে ব্যস্ত। মাঝে মধ্যেই যেন ঝিলের জলে গার্গল করতে করতে গলা ঠিক করছে। যাযাবর পাখির দল উড়ে আসছে ঝিলের জলে। আবার গলার হুঙ্কারে ডানার ঝটপটানিতে উড়ে চলছে অজানার উদ্দেশে।

    বিশাল ঝিলটা দেশি-বিদেশি পাখিদের স্বাধীন বিচরণ ক্ষেত্র। আমরা এখানে অনাহূত। কাছে গেলে তারা প্রতিবাদ করে। ডানার ঝাপটায় আমাদের বয়কট করে। উড়ে চলে অন্য কোথাও নিরিবিলিতে। তবে লেন্স, ক্যামেরা থাকলে ভয় কী? কটন টিল, পিনটেল, হুইসলিং ডাক, পেন্টেড স্টর্ক, নর্দার্ন পিনটেল, আইবিস, করমোর‌্যান্ট, গ্রে-ল্যাগ গুজ ইত্যাদি। যেন পরিযায়ী পাখিদের সেমিনার চলছে। শীতকাল জুড়ে এদের রি-ইউনিয়ন উৎসব চলে।

    দেশি মাছরাঙা মনোনিবেশ করে রয়েছে জলের দিকে। কখন ভেসে উঠবে মাছ। সারা বিলে ফুটে রয়েছে ওয়াটার লিলি বা শালুক। তারা হাই ডেফিনিশন ছবির মতো রঙিন। মৌমাছির গুঞ্জনে সুরের মায়াজালে শালুক দিব্যি দুলছে। হাওয়ার পরশে গঙ্গাফড়িং কোমর দোলাতে দোলাতে শালুকের সবুজ পাতায় বসল। পানকৌড়ির ভেজা ডানার জলে তারা বারবার স্নান করছে। এরা রসিকবিলের সম্পদ।

    দিগন্তে দিবাকরের বিদায়ী পোজ়। বিলের জলছবি ঢেউ জর্জরিত। পরিযায়ী দলবদ্ধ হয়ে হাওয়ার ভেলায়। নতুন আলোকের অপেক্ষায়। কিছু দলছুট গাছের ডালে বিশ্রামরত। আগামী কাল ভোরবেলায় ভৈরবী রাগে তারা গান শোনাবে। তবে ধরণী জাগবে।

    একটু পরেই রাকাশশী তার জ্যোৎস্নার শামিয়ানায় পুরো বিলটাকে ঢেকে ফেলেছে। কটেজের কাছেই একটা শিয়াল অনবরত ডেকে চলেছে। নিশাচর পাখির ঝটপটানি সামনের গাছটায়। ঝিঁঝির নহবত। সত্যি রহস্যজনক! জোনাকের উড়ন্ত আলো বিলের জলে হালকা প্রতিফলিত হচ্ছে। তবে হাজার হাজার নক্ষত্রের প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট। একটা বেরসিক ব্যাঙ গ্যাঙর...গ্যাং... করতে করতে টুবুং করে জলে লাফিয়ে পড়ল। থিতু নক্ষত্ররাশি জলের ঢেউয়ে যেন অস্থির হয়ে উঠল।

You may like