গ্রন্থ সমালোচনা

সজীব, সপ্রাণ চিত্রালেখ্য

হর্ষ দত্ত

  • স্মৃতি কথা
    ........................

    নিজস্বী
    সবিতেন্দ্রনাথ রায়
    মিত্র ও ঘোষ
    কল-৭৩।
    ২০০.০০

    ........................

    প্রকাশকের স্মৃতিতে ছবির মতো স্পষ্ট ফুটে উঠেছেন বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির সেই সব স্রষ্টা, যাঁরা বাঙালিকে ঋণী করে রেখেছেন।

    মোবাইল ফোনে ভরে দেওয়া ক্যামেরার কারিকুরি এখনও পর্যন্ত ‘সেলফি’-তে গিয়ে পৌঁছেছে। সেলফ (Self) থেকে সেলফি (Selfie)। সেলফির অর্থ এককথায়— ‘নিজের ছবি নিজে তুলুন’। যেমন, ‘নিজের ঢাক নিজে বাজান’। সম্ভবত আনন্দবাজার পত্রিকার সৌজন্যে সেলফি শব্দটির বঙ্গীয়করণ ‘নিজস্বী’। নিজস্ব ছবি তোলার এমন সহজসাধ্য ক্যামেরা সত্যিই এক আশ্চর্য আবিষ্কার। উপরন্তু, হাতের মুঠোয় নিজেকে ধরে রাখার তাৎক্ষণিক উপায়। মধ্যযুগে সেলফ পোর্ট্রেট বা আত্মপ্রতিকৃতি এঁকেছেন স্মরণীয় শিল্পীরা। আয়নায় বা অন্য কোনও ধাতুতে নিজের প্রতিফলন দেখে নিজেকে যে-চিত্রভাষায় তাঁরা লিখে রেখেছেন, তা তুলনাহীন। এরপর আধুনিক যুগ থেকে আধুনিক কাল পর্যন্ত আত্মপ্রতিকৃতি আঁকায় এখনও ছেদ পড়েনি। বরং তা আরও চিত্রবিচিত্র হয়েছে, অঙ্কনরীতির ভাঙচুরে শিল্পী প্রতিভাত হয়েছেন অন্যরূপে, বাইরের অবয়ব থেকে ভেতরের (Inner) অবয়বে। ক্যামেরা আবিষ্কারের পরবর্তীকালে অনেকে কায়দা করে শাটার অন করে নিজের বা অন্যদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে কিংবা বসে নিজের ছবি তুলেছেন। তার অনেক নমুনা আছে। সেলফি অবশ্য এখনও যৎ প্রতিফলিতং তৎ রূপায়িতম্। এর অন্যথা নেই। বরং অনেক সময় সেলফি ব্যক্তিমানুষের আননটিকে যথাযথ আনয়ন করতে পারে না। একটু-আধটু বিকৃতি ঘটে যায়। যদিও তৎক্ষণাৎ খারাপ ছবিটি মুছে দিয়ে পুনরায় চিত্রগ্রহণ করার সব ব্যবস্থা মোবাইলে সুলভ্য। সেলফি দেখে কেবল একটা কথাই মাঝে-মাঝে মনে হয়, ক্যামেরা আবিষ্কার এবং তার পরিমার্জনায় বিজ্ঞানের জয়জয়কার। কিন্তু এই ক্যামেরা যদি মানুষের অন্তর্লোকের ছবি তুলতে পারত! তা এখনও অধরা।

    এই আক্ষেপটুকু মাথায় রেখে, সবিতেন্দ্রনাথ রায়ের (ভানুবাবু নামে অধিক পরিচিত) লেখা ‘নিজস্বী’ বইটি পড়তে-পড়তে মনে হল, লেখক কেবল নিজের আলোকচিত্র দিয়ে বইটি সাজাননি। তাঁর কলম-ক্যামেরায় তুলেছিলেন যেসব দুর্লভ, দুষ্প্রাপ্য ছবি, তাদেরও এই অ্যালবামসম বইটিতে সাজিয়ে দিয়েছেন। বইটির ভেতরে একটাও আর্টপ্লেট নেই। কিন্তু তাঁর রচনার গুণে ছবির মতো স্পষ্ট ফুটে উঠেছেন বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির সেই সব স্রষ্টা, যাঁরা বাঙালিকে ঋণী  করে রেখেছেন।

    বইটির প্রচ্ছদ সোজাসাপটা ও ভারী উপভোগ্য। হালকা ও গাঢ়, ধূসরের সন্ধিস্থলে একটি হাত, আনুভূমিক পদ্ধতিতে ধরে রেখেছে একটি কালো রঙের মোবাইল। মোবাইলের স্ক্রিনে দশজন স্বক্ষেত্রে বিখ্যাত বাঙালির ছবি। আরও একটি ছবি আছে, সেটি স্বয়ং লেখকের। প্রচ্ছদশিল্পীর তারিফ করব, কেননা তিনি লেখকের নিজস্বীটিকে বাদ দেননি। তবে একটি সত্য বলতেই হবে, প্রচ্ছদে ব্যবহৃত কোনও ছবিই নিজস্বী নয়, এমনকী, স্বয়ং রচয়িতার ছবিটিও নয়। তা হলে এই বইয়ের নাম ‘নিজস্বী’ কেন? লেখক জানেন, সেলফি আসলে ‘নিজের আলোকচিত্র, বিভিন্ন পরিবেশে কেমনভাবে আছি,...যন্ত্রটিতে ধরে রাখতে পারি।’ মুদ্রিত ছবিগুলি, যেমন সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, লীলা মজুমদার, বিমল মিত্র, রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্ত প্রমুখের আলোকচিত্র, সেলফি নয়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কয়েকবছর আগে প্রয়াত হয়েছেন, আর সমরেশ মজুমদার এখনও সৃষ্টিশীল। এই দু’জনের ছবিও সেলফি নয়। তা হলে? লেখক ভূমিকায় নিজেই এর একটি উত্তর দিয়েছেন, ‘সেলফি শব্দকে অনুসরণ করে এই গ্রন্থের নাম রাখা হল নিজস্বী। এতে আমার ব্যক্তিগত লাভ হয়েছে কিছু। গ্রন্থে উল্লিখিত ব্যক্তিদের তুলনায় নিজে কত ক্ষুদ্র বোঝা যায়। একটা আত্মোপলব্ধি ঘটে।’



    লেখকের এই নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের পর বইয়ের নাম নিয়ে সমালোচনা করা বৃথা বাক্যব্যয়। বরং একথা বলি, ‘নিজস্বী’ শব্দটি কোনও বইয়ের নাম হিসেবে সম্ভবত এই প্রথম ব্যবহৃত হল। বইটি আদতে লেখকের স্মৃতিকথা ও স্মৃতি-উপহার। প্রখ্যাত বাঙালিদের সঙ্গলাভ করে সেই যৌবন থেকে আজ পর্যন্ত তিনি কীভাবে প্রাণিত হয়েছেন, কতটা ধন্য হয়েছেন, তারই নিবেদন বিভিন্ন মাপের রচনাগুলি। যে-সমস্ত সাহিত্যিককে নিয়ে তিনি স্মৃতিচারণা করেছেন, তাঁদের মধ্যে অনেকেই প্রবাদপ্রতিম মানুষ। রচনাগুলির অধিকাংশই এঁদের প্রয়াণের পর লেখা। তবে সাহিত্যস্রষ্টাদের সৃষ্টি নিয়ে কোথাও লেখক বিশেষজ্ঞের অভিমত দেননি। বরং জোর দিয়েছেন তাঁদের জীবন ও সান্নিধ্যের উপর। প্রকাশকদের চোখ দিয়ে তাঁদের দেখেছেন, সমালোচকের দৃষ্টিতে নয়। ‘দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার’ শীর্ষক রচনাটি থেকে একটি উদাহরণ: ‘অনেক প্রকাশক ওঁকে ঠকিয়েছিল। যা চুক্তি হত, তার থেকে বেশি ছাপাত। তখন আমাদের কাছে প্রতি সংস্করণে ঠাকুরমার ঝুলি ছাপা হত ৩৩০০ কপি, ঠাকুরদার ঝুলি ও দাদামশাইয়ের থলে ২২০০ কপি করে। আমি মিত্র-ঘোষে যাওয়ার আগে ১৯৪৪ থেকে এসব বই ছাপা হচ্ছে।...তখন ছাপা হত ৩৩০০, এখন প্রায় এক বছরে ছাপা হয় সাড়ে দশ হাজার। আমি যখন কাজে যোগ দিই, দাম ছিল আড়াই টাকা। এখন দাম প্রতি কপি একশো সত্তর টাকা। কী অসাধারণ জনপ্রিয়তা।’

    এই বইয়ের শেষ লেখা ‘আমার বন্ধু সমরেশ’। এখানে সাহিত্যিক সমরেশ মজুমদারের চেয়ে বেশি উদ্ভাসিত হয়েছেন সেই সমরেশ, যিনি জীবনপ্রেমিক, গ্রন্থরচয়িতার অন্তরঙ্গ ভ্রাতৃপ্রতিম সখার পরিসরে। সমরেশের জীবনযাপনের টুকরো টুকরো কাহিনি বলতে বলতে ভানুদা এক জায়গায় লিখছেন: ‘মিশনের ভরত মহারাজ ওকে (সমরেশ) খুব স্নেহ করতেন। মাঝেমাঝেই ডেকে পাঠাতেন। এই রকম একদিন গেছেন, ভরত মহারাজের সেবক বললেন, একটু বসবেন? একজন আছেন মহারাজের কাছে। তিনি বেরোলে আপনাকে যেতে বলেছেন।

    ‘সমরেশ পাশের ঘরে বসে শুনছেন, অল্প একটু কান্নার আওয়াজ, নারী কণ্ঠের।

    ‘কিছুক্ষণ পরে ভদ্রমহিলা চোখ মুছতে মুছতে বেরোলেন। বেরোবার সময়ে একঝলক সমরেশের দিকে মুখ ফেরালেন। সমরেশ চমকে উঠলেন, এ মুখ কি ভোলা যায়! স্বয়ং সুচিত্রা সেন।’

    কথাশিল্পী হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, মহাশ্বেতা দেবী, প্রাবন্ধিক শৈলেশকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, সাহিত্যসমালোচক অরুণকুমার বসু, সম্পাদক আনন্দগোপাল সেনগুপ্ত, জ্ঞানান্বেষী গ্রন্থাগারিক চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রকাশক বাদল বসু সম্পর্কিত লেখাগুলি সুখপাঠ্য, অজানা ঘটনার ঝলকে দীপ্যমান। এই সঙ্গে পাঠকের প্রাপ্তি মিত্র ও ঘোষ প্রকাশনার অফিস-ঘরে বৈকালিক সাহিত্যের আড্ডা নিয়ে রসময় নানা মুহূর্ত। সাহিত্যের আড্ডা এখন ইতিহাসের পাতায় স্থান পেয়েছে। অথচ পঞ্চাশ, ষাট, সত্তর এমনকী আশির দশকেও সাহিত্যিকরা একজায়গায় জমায়েত হয়ে গালগল্পের ঝুলি উজাড় করে দিতেন। আলোচনা হত সাহিত্যের ভালমন্দ, ভূত-ভবিষ্যৎ নিয়ে। অধ্যাপক রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্তের মতো রাশভারী শিক্ষক একসময় মিত্র-ঘোষের আড্ডায় নিয়মিত আসতেন। ওঁকে আসার জন্যে প্রথমে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন প্রমথনাথ বিশী। সেই নিমন্ত্রণ গ্রহণ করেছিলেন রবীন্দ্রকুমার। সবিতেন্দ্রবাবু স্মৃতি থেকে উদ্ধার করে এনেছেন এই অংশটি: ‘দু-একদিন পরে দীর্ঘদেহী এক সুদর্শন মানুষ ঘরে ঢুকলেন। ঢুকেই বললেন, আমি রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্ত।
     

    ‘সবাই শশব্যস্তে অভ্যর্থনা জানালেন। প্রমথবাবু এসে পড়লেন একটু পরেই। পরে পরেই কবিশেখর কালিদাস রায়, কৃষ্ণদয়াল বসু, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, প্রবোধকুমার সান্যাল। জমজমাট হয়ে উঠল আড্ডা। রবিবাবু যে আড্ডায় নবাগত তা আর মনেই হল না।’

    অন্তত সাতটি গ্রন্থভুক্ত প্রবন্ধ সাহিত্যিক বা কোনও ব্যক্তিত্বকে নিয়ে নয়। এই রচনাসমূহ লেখকের নিজস্ব চিন্তাভাবনার ফসল। এই রচনাগুলির মধ্যে লেখকের অন্য সত্তার পরিচয় পেয়ে পাঠক মুগ্ধ হবেন। শুধু ঘটনার বিবরণ বা স্মৃতির ঝাঁপি খুলে দেওয়া নয়, এই লেখাগুলিতে আছে প্রাবন্ধিকের মতো যুক্তি, বিষয়বস্তুর বৈচিত্র। যেমন, ‘আমরা বাঙালিরা ও সেকালের শারদ সাহিত্য’র পাশে আছে ‘দাম্পত্য জীবন ও শারীর সম্পর্ক’। গ্রন্থভুক্ত দীর্ঘতম রচনাটির নাম ‘স্বল্প ব্যয়ে আনন্দের ভ্রমণ’। পঁচিশ পৃষ্ঠাব্যাপী এই ভ্রমণকাহিনিটি পড়ে, ব্যয়সংকোচ করে ভ্রমণরসিক বাঙালি বেরিয়ে পড়লে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। চিরভ্রামণিক উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গ যিনি করেছেন, তাঁর হাত দিয়ে এমন রচনা বেরনো আশ্চর্যের কিছু নয়। সবিতেন্দ্রনাথ স্মৃতিকথার ফাঁকে ফাঁকে প্রবন্ধ ও ভ্রমণকাহিনি লিখলে মন্দ হত না। পাঠক অন্যতর স্বাদ পেতেন।

    বানানের সেই অবিতাড়িত ভূত এই বইয়েও পা ঝুলিয়ে বসে আছে দেখে একটু অবাক হলাম এবং তেনারা সংখ্যায় কম নন। আনন্দের শুদ্ধ অভিযাত্রায় দেখছি হৃষীকেশ আগাগোড়া হয়ে আছে হৃষিকেশ। কখনও ডান্ডীওলা, কখনও ডান্ডিবাহক। আরও কয়েকটি ভুল আছে। অবশ্য এনাদের জন্যে ‘নিজস্বী’র কোনও ক্ষতি হবে না। চিত্ররূপের বিকৃতি যেখানে নেই, সেখানে সুন্দরের অবস্থান চিরায়ত।