Travelogue

এক-পলক পালোলেম

অমিতাভ ঘোষ

  • সোনালি বালিতে আমার প্রিয় ক্যামেরাটা নিয়ে বসে আছি। আর উপভোগ করে চলেছি বালির সঙ্গে নীল জলের খুন্‌সুটি। অবাক হচ্ছি পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসা পর্যটকদের দেখে। সৌন্দর্যের টান এমনই।  

    দিন চারেক হল গোয়ায় পা রেখেছি। উত্তর গোয়া, দক্ষিণ গোয়া ঘুরে অবশেষে পালোলেম।  এসেই বুঝলাম, না এলে ঠকতে হত। বড় রাস্তা থেকে নেমে যাওয়া পথ সোজা সৈকতের দিকে চলে গেছে। একটু এগোতেই দু’পাশে কিছু দোকানপাট পেলাম, তাতে বিদেশি পর্যটকদের ভিড়ই বেশি। বিদেশি সিগারেটের দোকানও রয়েছে। একটু এগোতেই বালির পরিমাণ বাড়ছে দেখে বুঝলাম বেলাভূমির কাছাকাছি চলে আসছি।     

    নারকেল গাছের ছায়াঢাকা পথ শেষ হল সোনালি বালিতে। সারিবদ্ধ নারকেল গাছ সমুদ্র সৈকতকে অতিযত্নে ঘিরে রেখেছে। কোনওটি ছোট, কোনওটি লম্বা, কেউ আবার হেলে পড়ে জলের স্পর্শ পেতে চায়। দু’দিকে চোখ রাখলেই বোঝা যায় এই সৈকত অন্যদের মতো সরলরেখা বরাবর নয়; দু’দিকে বাঁক নিয়ে অর্ধচন্দ্রাকৃতি রূপ নিয়েছে। শুধু তাই নয়, সমুদ্রের মাঝখান থেকে একটা মস্ত পাহাড় জল থেকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। সে এক অসাধারণ দৃশ্য! ঢেউয়ের তীব্রতা নেই, জল নীল অথচ স্বচ্ছ। ঠিক যেন একটা প্রাকৃতিক সুইমিং পুল, যেখানে পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্যপিপাসু মানুষ মজা লুটছেন। নারকেলবীথির সামনে প্রকৃতির সঙ্গে মানানসই একতলা ও দোতলা কটেজ। তবে এখানে পঁচানব্বই ভাগ পর্যটকই বিদেশি। চারদিক দেখছি, উপভোগ করছি আর ধীর গতিতে এগিয়ে চলেছি মিহি বালির ওপর দিয়ে। কখনও কখনও ঢেউয়ের হালকা ছোঁয়ায় পা ভিজে যাচ্ছে। তবু বিদেশিনীরা, যদিও স্বল্পবাস, তাদের রঙিন পোশাক নীল জলে এক অপরূপ সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেছে। অনেকে জলে নামতে নারাজ। তাঁরা রৌদ্রস্নানেই তৃপ্ত।

    ডানদিকে সি-ফিশ ও পানীয়ের সম্ভারে ভরপুর একটা দোকান। তাতেও বেশ ভাল ভিড়। এক বয়স্ক বিদেশি পর্যটক, হাফ প্যান্ট খালি গায়ে হেলানো চেয়ারে বসে সাগর-সৌন্দর্যে মজে আছেন। সামনে বিদেশি ব্র্যান্ডের পানীয়। আরও একটু এগিয়ে চলি। কিছু বিদেশি পর্যটক বিচ ভলিবল খেলায় মত্ত।

    আমার বাঁদিকে রঙবেরঙের কয়েকটি নৌকা, একসঙ্গে বাঁধা। সামনে দৃষ্টি যেতেই দেখি বিশাল এক পাথর। এখানেই একটা নদী সাগরে এসে মিশেছে। তবে নদীতে হাঁটুরও কম জল। সমুদ্রে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়টাও এখান থেকে অনেক কাছে। অনেকটা ঘোরাঘুরির পর নীল জলে নেমে পড়ার লোভ সামলাতে পারলাম না। ফিরে এলাম আমার সঙ্গীসাথীদের মাঝে। নেমে পড়লাম জলে। আঃ কী আরাম! শরীর জুড়িয়ে গেল। পায়ের তলায় বালি বেশ শক্ত, জল স্বচ্ছ, ঢেউয়ের মৃদু ধাক্কা ঠিক যেন নরম হাতের আদর। এতক্ষণ সৈকত থেকে সাগরের সৌন্দর্য উপভোগ করছিলাম, এবার এক-কোমর জলে থেকে মুগ্ধ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম পালোলেম সৈকতের দিকে। অর্ধচন্দ্রাকার সৈকতের শোভা বোধহয় জল থেকেই সবথেকে বেশি উপভোগ্য।

             ঘড়ির কাঁটা কীভাবে তাড়াতাড়ি ঘুরে গেল আমি বলতে পারব না। দুপুরের খাবারের সময় হয়ে যাওয়ায় জল থেকে উঠতেই হল। নারকেলবীথির ছায়ায় ভোজনের ব্যবস্থা ছিল। খাওয়ার পরে  একটু বিশ্রাম। দেখতে দেখতে বিকেল গড়িয়ে সূর্যাস্তের সময় হয়ে এল। একটা মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি হল পালোলেমের বুকে। আলোর তীব্রতা কমতে কমতে হলুদ, কমলা ও শেষে লাল বলের মতো হয়ে সূর্যমামা আরবসাগরের জল ছুঁয়ে ফেলল। কারোর চোখের পলক পড়ে না । দুই পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে নীলজলকে কিছুক্ষণের জন্য রাঙিয়ে দিয়ে সূর্যমামা সেদিনের মতো বিদায় নিলেন। আলোর রেশ থেকে গেল আরও কিছুক্ষণ। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের প্রকৃতিপ্রেমিক পর্যটকেরা নিজের মতো করে ক্যামেরাবন্দি করে রাখলেন চোখজুড়ানো এই দৃশ্যকে। একদিকে দিনের আলো নিভে গিয়ে অন্ধকারের চাদরে ঢাকা পড়তে থাকল পালোলেম, অন্যদিকে ধীরে ধীরে সৈকতের দোকানগুলিতে আলো জ্বলে উঠল।