মন্তব্য

অর্থনীতি

দীপংকর দাশগুপ্ত

  • কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা নন  

    স্থায়ী নীতি প্রণয়ন করায় তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই। 

    আনুমানিক ছ’ কোটি মানুষের রাজ্য গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী একশো কুড়ি কোটি মানুষের দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন বিপুল ভোটে জিতে। এতটাই তাঁর ওপর ভারতের নাগরিকদের আস্থা যে, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় জাদুসংখ্যা ২৭২ ছাপিয়ে শ্রীমোদীর নেতৃত্বে এনডিএ জোট রেকর্ড সংখ্যক ভোট পেয়েছে। উপরন্তু বিজেপি দলের একার আসনসংখ্যাই ২৮০ ছাড়িয়ে গিয়েছে। এমন সাফল্যের নজির স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে গত তিরিশ বছরে আর নেই। আমরা দুর্বল জোট সরকারের শাসনে বাস করতেই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। বিভিন্ন আঞ্চলিক দলের চাপে বিপর্যস্ত ও নীতিপঙ্গুত্বে আক্রান্ত ছিল বিগত কেন্দ্রীয় সরকারের ভেন্টিলেটরে শায়িত ভাবমূর্তি। সেই অমোঘ বাস্তবতার কবল থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য যে ভারতের আপামর জনতা বিজেপি দলকে দিল্লির মসনদে বসিয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই।

    এমনটাই যে হবে, তা বহু ভোট-বিশেষজ্ঞ অনুমান করেছিলেন। কারণ, নরেন্দ্র মোদীর সম্পর্কে একটি ব্যাপারে বিশেষ মতান্তর নেই। তিনি সুশাসক। প্রয়োজনে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পান না। প্রায় সকলেই মনে করেন যে, গুজরাত রাজ্য তাঁরই সুশাসনে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পেরেছে। অনেকেরই ধারণা, দেশের বহু রাজ্য যখন অনুন্নয়ন ব্যাধিতে ধুঁকছে, তখন গুজরাত মোদী নীতি অনুসরণ করে দেশি ও বিদেশি বড়-বড় শিল্পপতিকে সেখানে বিনিয়োগ করাতে সক্ষম হয়েছে। শিল্পের প্রসারের ফলে কর্মসংস্থানের চিত্রটিও ভাল। এছাড়াও নানা উন্নতির চিহ্ন গুজরাতে ছড়িয়ে আছে। অতি আধুনিক নগরোন্নয়নের কাজ এগিয়েছে কচ্ছ অঞ্চলে। সেই রাজ্যের ১৮ হাজার গ্রামের সবক’টিতে বিদ্যুত্‌ পৌঁছেছে। যদিও কেউ-কেউ মনে করেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যক্ষেত্রে গুজরাতে তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটেনি, তবুও শক্ত হাতে স্থায়ী নীতি প্রণয়ন করার ব্যাপারে মোদীর সমকক্ষ প্রায় কোনও নেতাই এখন ভারতে নেই।

    গুজরাত রাজ্যে যা সম্ভবপর তা কি সারা দেশে ঘটতে চলেছে? কত বড় এই দেশ। গুজরাতের ১৮ হাজার গ্রামের তুলনায় ভারতের গ্রামের সংখ্যা ৬ লক্ষেরও বেশি। ২০১২ সালের ৩০-৩১ জুলাই যে-বিদ্যুত্‌ সঙ্কট সৃষ্টি হয়, তাতে ৬০ কোটি মানুষকে নিয়ে প্রায় অর্ধেক দেশ অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছিল। এই ৬০ কোটির মধ্যে অন্তত ২০ কোটি কোনওদিন বিদ্যুত্‌ পরিষেবাই পাননি। তাঁরা আমাদের আগামী প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে আছেন। ঠিক কোন পথে গেলে তাঁদের আশা মেটানো যাবে, সেটা নিশ্চয়ই নতুন প্রধানমন্ত্রীকে চিন্তা করতে হবে।

    গ্রামীণ বৈদ্যুতীকরণের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত সেচ-ব্যবস্থা, গুজরাতে যা উন্নত। যে-মূল্যবৃদ্ধির বিষোদগারে ভারত জর্জরিত, কৃষিক্ষেত্রে অসাফল্য তার অন্যতম একটি কারণ। কাজেই কৃষিতে মাথাপিছু ফলন বাড়িয়ে খাদ্যদ্রব্যের মূল্যকে নিয়ন্ত্রণে আনা মোদী সরকারের কাছে বড় একটি চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনী সাফল্যের সুখানুভূতিকে টিকিয়ে রাখতে হলে সমগ্র দেশের জন্য কৃষিতে নতুন বিপ্লবের জোয়ার আনতে হবে। খাদ্যমূল্যবৃদ্ধি রুখতে না-পারলে যে-বিপুল জনাদেশ আজ মোদীর পক্ষে গিয়েছে, তাতে চিড় খেতেও দেরি হবে না।

    গুজরাতে শিল্পোন্নয়ন হয়ে থাকলেও সারা ভারতের নিরিখে শিল্পোত্‌পাদন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। বৃদ্ধির হার নেমে গিয়েছে অনেকটাই। শিল্পকে চাঙ্গা করতে না পারলে কর্মসংস্থানেরও সুরাহা হবে না। কাজেই দেশি-বিদেশি সমস্ত বেসরকারি সংস্থাকেই আকর্ষণ করে আনতে হবে। আর সে জন্য অগ্রাধিকার দিতে হবে আর্থিক সংস্কারকে। অর্থনৈতিক সংস্কারের অগ্রগতি, জমি-নীতির সরলীকরণ এবং সরকারি ও বেসরকারি ক্ষেত্রে দুর্নীতি অপসারণকেই অধ্যাপক জগদীশ ভগবতী গুজরাতের অর্থনৈতিক সাফল্যের বড় কারণ বলে মনে করেন। মোদীর কাছে ভারতের মানুষের আশা, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের চাহিদা অনতিবিলম্বে নীতিপঙ্গুত্বের অবসান হোক এবং গুজরাত মডেল ছড়িয়ে পড়ুক সমস্ত দেশে।

    রাজকোষ ঘাটতি ও বাণিজ্যিক ঘাটতি বিগত সরকারকে বিকল করে দিয়েছিল। সেদিকেও নতুন সরকারকে চোখ ফেরাতে হবে। সরকারের রাজস্ব আদায় কোন পথে বৃদ্ধি, পাবে সেটা অবশ্যই চিন্তার বিষয়, কারণ, গুজরাত সরকার শিল্পপতিদের নানা কর থেকে রেহাই দিয়েছে। যদি শিল্পকে জাগিয়ে তুলতে কর-কাঠামোকে এই উপায়ে শিল্পবান্ধব করে তুলতে হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে রাজকোষ ঘাটতির সমস্যা সহজে মিটবে না। এদিকে দেশের সমস্ত রাজ্য, বিশেষ করে উত্তর-ভারতের বিজেপি বিজিত রাজ্যগুলি, নিশ্চয়ই তাদের উন্নয়নের জন্য কেন্দ্রীয় অনুদান আশা করবে।

    বাণিজ্যিক ঘাটতির সমস্যাও সহজে সমাধান হওয়ার নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি নরেন্দ্র মোদীর পক্ষে রোখা সম্ভব নয়। রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা চলতে পারে। হয়তো সেই প্রতিযোগিতায় হাত পাকানোর পদ্ধতি নতুন সরকার উদ্ভাবন করতে পারবে। সেই সঙ্গে বিকল্প শক্তির ব্যবহারের দিকেও নজর দেওয়া দরকার।

    যে-পথেই চলা হোক না কেন, সুখের খবর হল, এই মুহূর্তে কেউই কেন্দ্রীয় সরকারকে চোখ রাঙাতে পারবে না। লোকসভায় আপাতত নরেন্দ্র মোদী আগামী পাঁচ বছরের জন্য অনড় থাকবেন, আর সে জন্য কোনও আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে আপস করতে হবে না। রাজ্যসভার চিত্রটা অবশ্য একটু অন্য ধরনের হবে। কিছুটা চাপ সেখানে মোদীকে নিতেই হবে। আশা করা যায় সে সবের মোকাবিলা করার উপায় আমাদের নতুন প্রধানমন্ত্রীর জানা আছে।           

You may like