প্রবন্ধ

নিঃশব্দ জাগরণ

সুমন সেনগুপ্ত

  • তত্ত্বগত দিক দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা আপেক্ষিক শব্দ নয়, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির বিষয়টি বেশ আপেক্ষিক। লঘুতা এবং গরিষ্ঠতা গাণিতিক নিয়মে বিপরীতমুখী। এই বিপরীতমুখিনতা থেকে বৈরিতা জন্ম নেয়।

    “And so tonight-to you, the great silent majority of my fellow Americans-I ask for your support” ১৯৬৯ সালের ৩ নভেম্বর তদানীন্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এক বক্তৃতায় এ কথা বলেছিলেন। মার্কিন জনগণের যে-অংশ কাউন্টার-কালচারের শরিক হননি অথবা আরও স্পষ্ট করে বললে ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরোধিতায় সোচ্চার হননি মূলত সেই মধ্যবিত্তদের উদ্দেশেই নিক্সনের এই বক্তব্য। মার্কিন জনসংখ্যার নিরিখে সংখ্যালঘুরা বরং তদানীন্তন মার্কিন সংবাদমাধ্যমের সমর্থন পেয়েছিল এবং এই সোচ্চার সংখ্যালঘুদের আবছায়ায় চাপা পড়েছিলেন সমাজের মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট এঁদের কাছেই সাহায্যের জন্য নতজানু হয়েছিলেন।

    নিক্সন silent majority কথাটিকে অসম্ভব জনপ্রিয় করেছিলেন। এর প্রয়োগ করেছিলেন আরও ব্যাপকার্থে। একথা ঠিক যে, তত্ত্বগত দিক দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা আপেক্ষিক শব্দ নয়, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির বিষয়টি বেশ আপেক্ষিক। লঘুতা এবং গরিষ্ঠতা গাণিতিক নিয়মে বিপরীতমুখী। এই বিপরীতমুখিনতা থেকে বৈরিতা জন্ম নেয়। আর তা হয় বলে পারস্পরিক অসূয়াস্পৃহাও তৈরি হয়। দেশ-কাল-সমাজ নির্বিশেষে এ পরম্পরা বাহিত হয়ে এসেছে। এ কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনাক্রম নয়, লঘু-গুরুর জ্ঞান না-করার ভর্ত্‌সনা আমাদের প্রায়শ তাড়িত করে বেড়ায়। তারতম্য করা অথবা না-করার মধ্যে ফারাক বহু। লঘু এবং গুরুর মধ্যে আজন্ম-লালিত এক সংস্কারের বীজ বুনে দেওয়া হয়। সেই সংস্কারের মধ্যে কোথাও-বা থেকে যায় অসন্তোষ, অবিশ্বাসের দীর্ঘশ্বাস। যা কিনা একদিন দেখা দেয় হিংসা-দ্বেষ-অভিমান এমনকী, হন্তারক মনোবৃত্তির মাধ্যমে। ইতিহাসের সাক্ষ্য এমনটাই। প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, প্রতিযোগিতা নয়, তার বদলে শত্রুতা, বৈরিতা চুঁইয়ে পড়ে পরস্পরের থেকে।

    গরিষ্ঠ-লঘিষ্ঠের এই অহৈতুকী বিবাদ থেকে সমাজ-গবেষণার নানা মর্মস্পর্শী উপকরণাদি মেলে। চর্চা এবং চর্যায় এর প্রসঙ্গ এসে পড়ে। আবার কখনও তুল্যমূল্য বিচারে লঘু না গুরু- কে লাভবান বেশি, তা নিয়ে শুরু হয় আনুপূর্বিক যুক্তিনিষ্ঠ পর্যালোচনা। এতে ডিসকোর্স তৈরি হয় হয়তো, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ অথবা সংখ্যালঘিষ্ঠ- যে-কোনও পক্ষের অভিপ্রায় সেখানে অধরা থাকে। সমাজতত্ত্বে এক ঝুঁকিপূর্ণ সমাজের কথা বলা হয়। সে সমাজে আছে পাবলিক স্ফিয়ার এবং প্রাইভেট স্ফিয়ারের অস্তিত্ব। রাষ্ট্র এবং রাজনেতিক দলগুলির বাইরে তৃতীয় পরিসর যেটি, সেখানে এ নিয়ে আলোচনা চললে silent majority-র মতো বিপরীত বিশ্বের বহু অভিজ্ঞতার বিনির্মাণ সম্ভব। সমাজতত্ত্বের পাঠকৃতির বাইরে বেরিয়ে জনক্ষেত্রটি সেই বিনির্মাণের ফলে দিশালাভ করলে তাতে আখেরে লাভ সমাজের- এর চেয়ে বড় সত্য আর কিছু হতে পারে না।

    এই আবহে এবারের লোকসভা নির্বাচনের কথা ধরা যাক। নরেন্দ্র মোদীর কুশলী নেতৃত্বদানের ফল- বিজেপি-র আশাতীত নির্বাচনী সাফল্য। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছেন মোদী একাই। আসমুদ্রহিমাচল তাঁকে ভোট দিয়েছে। বিজেপি-র জন্যে নয়, ভোট হয়েছে নমো নামের ধারে ও ভারে। তাই এ জয় তাঁর ব্যক্তিগত জয়। পরবতী পাঁচ বছরে তিনি সফল হবেন না ব্যর্থ হবেন- তার দায়ও সম্পূর্ণ তাঁর স্কন্ধে বর্তাবে। কারণ, তিনিই এবারের নির্বাচনে আদি এবং একই সঙ্গে অনন্ত। বিগত তিন দশকে যে-আবহে এদেশে নির্বাচন হয়েছে, তার প্রেক্ষিত ছিল জাতপাত-বর্ণ-ধর্ম-ভিত্তিক সমীকরণে পূর্ণ। সেখানে ভোটের প্রচারপর্ব থেকে শুরু করে যাবতীয় অনুষঙ্গে জাত এবং ধর্মভিত্তিক মাপকাঠি কাজ করত। অথবা বলা ভাল সেই মাপকাঠি মেনে কাজ করিয়ে নেওয়া হত। যেমন করিয়ে নেওয়া হত ভোটও! সংখ্যালঘু, পিছড়ে বর্গ, সংরক্ষিত জনজাতি প্রভৃতির জন্য কৌশলী দলগুলির দুঃখ ও মনোকষ্ট ছিল চোখে পড়ার মতো। তাঁদের হিতকল্পে তাঁদেরই এক শ্রেণির জন্য বিশেষ ভাতা প্রদান-সহ একাধিক প্যাকেজ-সংস্কৃতির দাপট ছিল তুঙ্গে। দেশের নানা প্রান্তে বিভিন্ন রাজ্য সরকার নিজ-নিজ সুবিধেমতো এই বন্দোবস্ত করে নিয়েছিল। নির্বাচনের আগে এ ধরনের ব্যবস্থা-বন্দোবস্ত ইত্যাদি ঘিরে চলত এলাহি আয়োজন। বিরোধী মহলে এ নিয়ে যথারীতি তোষণের অভিযোগ উঠত। চলত দু’পক্ষের তরজা। চলত বললে অবশ্য ভুল বলা হবে, এই তরজা চলছে এবং ভবিষ্যতেও চলবে। আর গোটা ঘটনায় সংখ্যাগুরুদের নিয়ে ভাবনাচিন্তা ছিল না কোনও পক্ষেরই। না শাসকের, না বিরোধীর- লঘিষ্ঠ মহল্লায় দিন-রাত এক করে ফেলতে গিয়ে পাশের গলিতে গরিষ্ঠদের কথা নেতৃবৃন্দ বেমালুম বিস্মৃত! অথচ তাঁরাও ভোটার। তাঁদের ভোটের মূল্য একেবারেই কম নয়। অথচ কারও ভ্রুক্ষেপ নেই। গরিষ্ঠরা যেন নিজভূমে পরবাসী!

    প্রবন্ধের শুরুতে যে-পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং অসূয়ার কথা বলা হয়েছিল, এখানে তার পূর্বানুবৃত্তির প্রয়োজন। এই যে নিজভূমে পরবাসের যন্ত্রণা, এর থেকে জন্ম নিয়েছে হতাশা এবং তত্‌পরবর্তী সময়ে ক্ষোভ। সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ যদি ভোটযন্ত্রে হয়, তাহলে কার সাধ্য তাকে ঠেকায়! এবারের নির্বাচনে আসমুদ্রহিমাচল জুড়ে মোদীর সমর্থনের নেপথ্যে সেই সংখ্যাগরিষ্ঠের উপুড় করা সমর্থন আছে বললে খুব ভুল বলা হবে কি? গরিষ্ঠের স্বার্থ উপেক্ষিত, গরিষ্ঠের দাবি অবহেলিত, গরিষ্ঠের ন্যায্য প্রাপ্তির দুর্লভতা সেই অংশের মানুষকে বীতশ্রদ্ধ করে তুলেছে। ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ বলতে কি গরিষ্ঠের প্রতি উদাসীনতা বোঝায়? গরিষ্ঠকে অবদমিত করে রাখা অথবা উপেক্ষা-অবহেলা করার মধ্যে গৌরব নেই, শ্লাঘাও নেই। বরং গরিষ্ঠের সম্মিলিত জবাব প্রত্যাঘাতের চেয়েও শক্তিশালী হতে পারে। গরিবগুর্বো, জেলে-মালা-মুচি-মেথর-মত্‌স্যজীবী-কৃষক-ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সে কারণে এই ভোটে এককাট্টা হয়েছেন। এঁদের কথা শোনার মতো এতদিন কেউ ছিলেন না। বরং এতদিন, মণ্ডল কমিশনের কথা, অনগ্রসর জনজাতির কথা, সংখ্যালঘুদের কথা শোনার মতো নেতারা ছিলেন। ছিলেন না শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের কথা শোনার মতো কেউ। শুধু এঁরা নন, ছাত্র ও যুবসমাজও এই নির্বাচনে তাদের উজাড় করা সমর্থন দিয়েছে মোদীকে। কারণ, এতদিন ধরে শিক্ষাক্ষেত্রে এবং চাকরির বাজারে সর্বত্র সংরক্ষণের ধাক্কায় মধ্যমেধার বাড়বাড়ন্ত হয়েছে। পানসে প্রতিভাধারীরা প্রকৃত প্রতিভাধারীদের টপকে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছেন। আর এতে প্রকৃত মেধাবীদের বঞ্চনার যন্ত্রণা ক্রমশ বেড়েছে। সেই যন্ত্রণা থেকে মুক্তিলাভের আশায় তাঁরাও মোদীকে ভোট দিয়েছেন।

     লক্ষণীয়, নরেন্দ্র মোদী কিন্তু এবারের নির্বাচনী প্রচারে একবারের জন্যও অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণ কি রামরাজত্ব গড়ার কথা বলেননি। বরং বলেছেন উন্নয়নের কথা, সমৃদ্ধির কথা, সামগ্রিক বিকাশের কথা। অবশ্য শুধুমাত্র যে উন্নয়নের কথাতেই জয় এসেছে তা নয়। এসেছে এইজন্যে- তিনি সার্বিকভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠের আশা এবং আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে পেরেছেন। বস্তুত এদেশের গরিষ্ঠরা দীর্ঘদিন সংখ্যালঘু, সংরক্ষিত তথা অনগ্রসরদের ধারে ও ভারে চাপা পড়ে গিয়েছেন। অর্থহীনভাবে এই সব শ্রেণির স্বার্থরক্ষার নামে এক ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলে রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে। আর সংখ্যালঘু, অনগ্রসর এবং সংরক্ষিতদেরও দুর্ভাগ্য, তাঁদের নিয়েও ল্যাবরেটরিতে চলে নানা পরীক্ষানিরীক্ষা! কেউ বলে সংরক্ষণের কথা, কেউ বলে ভাতা প্রদানের কথা, কেউ-বা আবার এসবের বিরুদ্ধে রেগে গিয়ে তোষণের অভিযোগ তোলে। শেষেরটি সবচেয়ে মারাত্মক। এদেশে সংখ্যালঘু তোষণ আদতে perceived appeasement! এঁদের মধ্যে বেশির ভাগ মানুষ অবর্ণনীয় অবস্থায় জীবনযাপন করেন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে, বসবাসের অনুপযোগী জায়গায় দিনের পর দিন জীবনযন্ত্রণায় বিদ্ধ হয়ে তাঁরা বসবাস করেন। শিক্ষার আলো এঁদের মধ্যে অনেকের কাছে পৌঁছয়নি। কে দেবে আলো? কে দেবে শিক্ষা? যাঁদের দেওয়ার কথা, তাঁরাই তো এঁদের জন্য যাবতীয় বরাদ্দ আত্মসাত্‌ করে বসে আছেন। মুখে বলছেন এঁদের উন্নয়নের কথা, কিন্তু কাজের বেলায় করছেন উলটো। আত্মসাত্‌কৃত অর্থে যে এঁদের দিনাতিপাতের সামান্য হলেও উন্নতি ঘটত, সে কথা জেনেও এঁরা নিশ্চুপ থাকেন অথবা দানসত্র খোলার জন্যে গলাবাজি করেন। আর অন্যদিকে আর-একদল গলার শিরা ফুলিয়ে তোষণ হচ্ছে, তোষণ হচ্ছে বলে চিত্‌কার জোড়েন! এই বিবিধ বিড়ম্বনা আর দুঃখের মধ্যে পড়ে যন্ত্রণা সহ্য করতে হয় বেশির ভাগ দরিদ্র সংখ্যালঘু, অনগ্রসর এবং সংরক্ষিত মানুষজনকে। বিশেষ করে দরিদ্র সংখ্যালঘুদের। উন্নয়নের আলো পৌঁছনো তো দূরের কথা, উলটে তাঁদের নিয়ে অকারণে টানাহ্যাঁচড়া চলতে থাকে। পরিহাস এই যে, এদিকে আবার গরিষ্ঠদের মনেও ‘তোষণ’ সম্পর্কে প্রথমে শঙ্কা এবং পরে ক্ষোভ জমতে শুরু করে। যে-ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়ে এই প্রথম অনেক কিছু উলটেপালটে দিতে পেরেছে, যা এবারের ভোটের ফলাফলে দেখা গিয়েছে।

    মোদীর পক্ষে বিপুল জনাদেশ আসলে সংখ্যাগরিষ্ঠের নীরব বাঙ্ময়তা। তাঁদের এতদিনের না বলা কথা মূর্ত হয়েছে নির্বাচনী এই ফলাফলে। এদেশের ছ’দশকের নির্বাচনী ইতিহাসে এই ঘটনা নিঃসন্দেহে এক বড়সড় মাইলফলক।

    অঙ্কন: সুব্রত চৌধুরী

You may like