কবিতা

বৃষ্টি

  • শ্যামলকান্তি দাশ

     

    দিনভর লম্বা লম্বা বৃষ্টি।

    সেনবাড়ির মেয়েরা কেউ বাইরে বেরোতে পারছে না।

    কী জ্বালাতন বলুন তো!

    পেঁপেগাছের তলায় ভিজছে গুল্ম, আর

    লম্বা লম্বা লোকজন।

     

    ছোট ছোট বাক্যে শেষ হয়ে এল

    বাংলার নতুন কবিতা।

    কবির মুক্তি বোধহয় এরকমই।

    ধরাছোঁয়ার বাইরে এবং আকস্মিক।

     

    দু’চোখ ভরে বৃষ্টির খেলা দেখছে

    লম্বমান শহরতলি।

    তুমি খানিকটা হতভম্ব,

    আমি কে বলো তো, সুবর্ণলতা?   

     

    .....................................................

    গোপন পাপ

     

    গৌতম কুমার ভাদুড়ি

     

    আমরণাত্‌ কিং শেলম্?

    রহসি কৃতম্ দুষ্কৃতম্। (শঙ্করাচার্য)

     

    কোন কাজ আমরণ বেঁধে শেলসম?

    সেই পাপ যা আমার একান্ত গোপন।... (?)

    হবেও বা

     

    নইলে

    আত্মজার বান্ধবীকে হাত ধরে নিয়ে যাওয়া সিমলা পাহাড়ে

    মুহূর্তেই পরিণত করে তোলা তাকে

    কেন বারবার পোড়ায় আমাকে?

    সে বালিকা নারী হয়ে চলে গেছে কবে কোনখানে

    কে জানে! তবু

    আমার সমস্ত স্বপ্নে ফিরে আসে সেদিনের দৃশ্যপটগুলি

    সুতীক্ষ্ন শেলের মতো বেঁধে যেন বুকের গভীরে

    প্রাচীন পাপের কাছে আমাকে কি নিয়ে যায় তারা

    বারেবারে? স্মরণ করায় গুপ্ত অধর্মতা?

     

    হবেও বা

    .....................................................

    মা চলে যাবে

     

    তৈমুর খান

     

    বাবা রোজ মাকে ডাকে

    মা সেই ডাক শুনতে পায়

    ভোররাতে স্বপ্ন দেখে জেগে ওঠে

    আর ঘুম আসে না কিছুতেই তার

     

    মা-ও চলে যাবে-

    বাক্সভর্তি পুরনো কাপড়চোপড়গুলি

    একে একে বউ-বিটিদের বিলি করে দেয়

    থালা-বাটি-ঘটি যা ছিল সব ভাগ হয়

    শুধু পানের বাটাটি থেকে যায় মা’র

     

    পানের বাটা কে নেবে মা?

    জানি না, জানি না আমি!

     

    আমরা কেউ পান খাওয়া শিখিনি

    আমরা কেউ জরদা খাওয়া শিখিনি

    মা কথা বললে পান-জরদার গন্ধ পাই

    এখনও

     

    মা চলে যাবে-

    বহুপথ হাঁটা ক্ষয় হওয়া বাবার চপ্পল জোড়া

    মা দ্যাখে আর

    বলে, আমিও খালি পায়ে যাব...

     

    আমাদের মাথার ওপর রাত আসছে

    রাতের আয়োজন টের পাচ্ছি

    বাবা দরজায় দাঁড়িয়ে আছে মায়ের অপেক্ষায়

    ...............................................................

    অক্ষরযোজনা

     

    রঞ্জিতকুমার সরকার

     

    গোধূলির ফিকে আলো ছড়িয়েছে কবির জামায়

    গেঁয়ো কবি আলোটিকে নির্ভেজাল অক্ষরে নামায়।

     

    সে অক্ষরে তীব্র জ্বালা, বাক্যবন্ধে প্রবল সন্ত্রাস,

    যন্ত্রণার সারটুকু কোনখানে তুলে নিয়ে যাস?

     

    অক্ষরযোজনা আছে, আছে কিছু প্রিয় নান্দীমুখ

    চেনা ছকে উঁকি দেয় রক্তমুখী গোলাপের সুখ।

     

    কোথায় বিকোবে আলো? কোন খেতে ফলবান লতা

    লাঞ্ছনার কাঁথা পেতে ঢেকে রাখে চালু বিফলতা?

     

    দরাজ ফাঁকির মাঝে জ্বলে ওঠে রাঙা ফুলঝুরি

    মাঝে মাঝে সেখানেও মাথা তোলে খরশান ছুরি।

     

    জলবিভাজিকা ছেড়ে গোধূলিটি ঝোলে দোটানায়

    ক্ষয়াটে আলোয় কবি শেষরাতে অক্ষর শানায়।

    ...........................................................................

    সমুদ্র

     

    অসীমকুমার বসু

     

    জাহাজঘাটাতেই দেখা হয়ে গেল সেই বিদেশি নাবিকের সঙ্গে। পাশেই আঁকাবাঁকা গলির ভিতরে জীর্ণপ্রায় পানশালা। দিনেও ভিতরে আবছায়া অন্ধকার। কাঠের টেবিল জুড়ে এঁটো প্লেট, আঁশটে গন্ধ। জাগভর্তি ফেনাভরা বিয়ারে চুমুক দিতে দিতে গল্প হচ্ছিল দূর অজানা দ্বীপের, যেখানে নারকেল গাছের পাতারা কেঁপে যায় ভূমধ্যসাগরের হাওয়ায়। বহুদিন শহরে থাকলে আমাকেও সমুদ্র হাতছানি দিয়ে ডাকে। তার অন্তহীন জলরাশি, উড়ন্ত মাছেদের হঠাত্‌ হঠাত্‌ জাহাজের ডেকে এসে পড়া, কখনও বিকেলে নৈর্ঋত কোণ জুড়ে ঘন কালো মেঘের ছায়ায় উত্তাল ঢেউয়ের গর্জন মাঝে মাঝেই স্বপ্নের মধ্যে ফিরে আসে।

    আশেপাশে আমাদের মতোই উসকোখুসকো চুলের আর না-কামানো দাড়ির কিছু মলিন পোশাকের মানুষ বসে আছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে, তাদের কেউ কেউ জোরে হেসে উঠছে সম্ভবত নারীঘটিত রসিকতায়। মাঝে মাঝেই ছোট জানালার পরদা উড়িয়ে ঢুকে পড়ছে সমুদ্রের হাওয়া আর আমার নেশাগ্রস্ত আসন্ন ঘুমের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে সমুদ্রযাত্রার স্বপ্ন।

    .............................................................................

    দান

     

    মধুমিতা ভট্টাচার্য

     

    এই নাও পদ্মকুঁড়ি

    থইথই কাজল পলক,

    এই নাও জলজ জীবন,

    মেঘের বারান্দায়

    একরাশ ঝিলিমিলি

    চমক দমক নাও,

    সাথে নাও বজ্র-বাঁধন!

     

    আরও আছে, এই নাও

    সবুজের স্নানঘরে

    ঝরনা ঝরোখা,

    হিমেল রহস্য নাও

    এসো আজ একান্ত সখা।

     

    কুঞ্জবন, মধুমাস,

    শ্রাবণ ঝুলন।

    এই নাও ব্রজলীলা

    রাধাস্পর্শ, হোলিখেলা,

    আবির গুলাল নাও,

    বাহুবন্ধ, রাসলীলা,

    চাঁদনি চন্দন!

     

    এই নাও ফুল, হাসি,

    বেমিসাল সুখের বুনোট।

    এই নাও ভুখ,

    চোখের, মনের আর

    দেহের অসুখ!

     

    দেহজ বাস্তব নাও

    ভুলভ্রান্তি শোক সমন্বিত,

    নাও নাও সব নাও

    যাবতীয় সৃজনের

    অনিঃশেষ স্রোতে বিজারিত।

     

    এই নাও বিভিন্ন যাপন,

    দানপাত্রে ভরে দিই

    সমগ্র জীবন, আর

    আত্ম-সমর্পণ।

    .............................................................................

    বিষাদ লেগে আছে

     

    রাহুল ঘোষ

     

    আড়াল বুঝেছি আমি, বুঝিনি কোথায় অনিচ্ছা লেগে আছে

    হাওয়ায় তীব্র বিষ, তবু উড়ে যেতে চায় পাখি

    পড়ন্ত বিকেলে আরও ম্লান হয়ে আসে আলো

    আমার চারপাশে মৃত মানুষের চোখ ভাবলেশহীন চেয়ে থাকে।

     

    তুমি কি জানো না, কোথায় রেখেছ আঘাত?

    কোথায় সুতো ছিঁড়ে ঝরে পড়ল ঘাম-রক্ত-গ্লানি

    কেন আজ প্রিয় অরণ্য ঘিরে দহন সর্বনাশা খেলায়

    কেন দাঁড়িয়ে থাকবে না জেনেও বারবার ফিরে তাকাতে হয়...

     

    প্রতিটি সঙ্গমে আমি না-হয় তোমার প্রত্যাখ্যান বুঝিনি

    তুমিও বোঝোনি, চুম্বনে আমার বিষাদ লেগে আছে।

    .............................................................................

    আমার মা ও আমি

     

    টোকন মান্না

     

    অনেকদিন পর গ্রামের ছবি আঁকব। হাতে কলাপাতা

    রং কেবল নদী-পাহাড়-দুই হাতে বালি

    বালির নাম থর

    কিন্তু অনেকদিন তো গ্রাম দেখিনি

    গ্রাম তুমি কেমন? ডোবা আছে। পুকুর আছে।

    লাল মাটি আছে। বৃষ্টি হলে কাদা হয় পা।

     

    অনেকদিন পর মায়ের ছবি আঁকব। হাতে মায়ের নাকছাবি

    রং কেবল বাড়িটি-বাগানটি-আমগাছ-নিমগাছ

    এদের নাম দিয়েছি মায়ের মেয়ে

    কিন্তু অনেকদিন মায়ের মুখ ভেসে ওঠেনি

    কেবল ব্যস্ততা। বউয়ের শাসনে মায়ের অ্যালবাম

    আবছা হতে থাকে পুরনো বাসনের মধ্যে।

    মায়ের ছবিটিও বাঁশপাতার মধ্যে বসে থাকে একা

    আর আমি ছাগলটি নিয়ে খোলামাঠে ছুটতে থাকি...

    .........................................................................

    নিয়তি

     

    মণীশ সিংহ রায়

     

    মানুষের আশ্চর্য নিয়তি এই যে

    যে-বাড়িতে তাকে কেউ বোঝে না

    সেই বাড়িতেই আমৃত্যু তাকে থেকে যেতে হয়

     

    সে তো সেই বাড়ি ছেড়ে চলেই যেতে পারে

    কিন্তু যাওয়া হয় না কখনও

     

    অভ্যাসের অন্ধকার বন্ধনে পড়ে টান।

     

    যদি কোনও মানুষ সেই বন্ধন ছিঁড়ে

                    চলেও যায় অন্য কোথাও

                    দূরে অন্য কোনও ঘরে

    সেখানেও তার জীবন ঘিরে

                    ধীরে ধীরে ছায়ার মতো

                    গজিয়ে ওঠে কিছু মানুষ

     

    যারা কেউই সেই মানুষটিকে

                    বোঝেনি কখনও।

    .............................................................................

    দু’টি কবিতা

     

    সঞ্জীব প্রামাণিক

     

    স্তব

     

    একটি প্রদীপ আমি রেখে দিই রাত্রির শিয়রে

    যাতে সন্তানসন্ততি আলো পায়

    ধান ও দূর্বার দেশ, কমলবাসনা আলো, শান্ত সরোবর

    কী আর চাইতে পারি রাত্রির দেবীর কাছে

                            নির্মল, আলোকিত ভোর

    পার্থিব বাসনা যাতে শিখা হয়ে জ্বলে ওঠে

                                        রাত্রির ভেতর।

     

    শরীর

     

    সে এক আদিম গাছ

    আমি দেখি তার ফুলফল

    খিদে পায়, খুব খিদে পায়

    গাছের বাকল খুলে

    বসে থাকি গাছের তলায়

    .....................................................................

    অঙ্কন: সুব্রত চৌধুরী

     

     

     

You may like