শেষকথা

হায় আদি-অন্ত শঙ্করাচার্য!

হর্ষ দত্ত

  • ধর্মমতনির্বিশেষে মানুষ কাকে পুজো করবে, শ্রদ্ধা জানাবে, সেটা তার মৌলিক অধিকার।

    ঊনবিংশ শতকীয় কলকাতা-কেন্দ্রিক রেনেসাঁসের সমসময়ে শুধুমাত্র পাঠশালায় পড়া এক পূজারী ব্রাহ্মণ ধর্মভাবনায় নিঃশব্দ বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। বিভিন্ন ধর্মমতকে নিজের জীবনচর্যায় প্রয়োগ করে, উপলব্ধি-সঞ্জাত এই সত্য তিনি ব্যক্ত করেছিলেন- যত মত তত পথ। যে-কোনও ধর্মমত ও ধর্মপথ অবলম্বন করে মানুষ ঈশ্বরের কাছে পৌঁছতে পারে। কোনও মত বা পথই একমাত্র বা অদ্বিতীয় নয়। সনাতন হিন্দুধর্মের অন্যতম মান্য গ্রন্থ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায়ও শ্রীকৃষ্ণের কণ্ঠে এই সত্য উচ্চারিত হয়েছিল: যে যেভাবে আমার উপাসনা করে, আমি তাকে সেভাবেই অনুগৃহীত করি। গীতায় ঈশ্বরের নাম শ্রীকৃষ্ণ। অন্যান্য ধর্মে ঈশ্বরের অন্য নাম। এছাড়াও তাঁর বহু পরিচয় তিনি সাকার, আবার নিরাকার।

    দুঃখের বিষয়, ঈশ্বর উপাসনার ক্ষেত্রে শ্রীরামকৃষ্ণের ওই অনুভবী মতাদর্শকে আমরা নিঃসংশয়ে গ্রহণ করতে পারিনি। হিন্দুধর্ম আজও তার শাস্ত্রগ্রন্থ অনুযায়ী সমস্ত প্রাণীর প্রতি দ্বেষহীন, মিত্রভাবাপন্ন, দয়ালু, আত্মপরতাশূন্য, নিরহংকার, সুখে-দুঃখে সমভাবাপন্ন ও ক্ষমাশীল হতে পারেনি (দ্রঃ গীতা, ভক্তিযোগ, শ্লোক-১৩)। এর শেষতম উদাহরণ, শিরডির সাইবাবার বিরুদ্ধে দ্বারকায় অবস্থিত অন্যতম শংকর মঠের বর্তমান শংকরাচার্য স্বরূপানন্দ সরস্বতীর সাম্প্রতিক উক্তি ও হুঙ্কার। এতদিন পরে হঠাত্‌ তিনি বলতে শুরু করেছেন, শিরডির সাইবাবা আসলে একজন ‘মুসলমান ফকির’ ছিলেন। অতএব তাঁকে শিব বা বিষ্ণুর মতো পুজো করা হিন্দুশাস্ত্র বিরোধী। সাইবাবার কোনও মন্দির থাকাও উচিত নয়। দ্বারকাপীঠাধীশ্বর এই বলে হুমকি দিয়েছেন, হিন্দুধর্মের পবিত্রতা রক্ষার জন্যে যদি তাঁকে জেলে যেতে হয়, তাতেও তিনি প্রস্তুত!

    স্বরূপানন্দের এই অসহিষ্ণুতা ও বিদ্বেষ ধর্মপ্রাণ সমস্ত মানুষের সহাবস্থানকে যে-কোনও মুহূর্তে নষ্ট করে দিতে পারে। তার চেয়েও বড় কথা, ধর্মমতনির্বিশেষে মানুষ কাকে পুজো করবে, কাকে শ্রদ্ধা জানাবে সেটা তার নিজস্ব বিষয়, নিজস্ব ধ্যান-ধারণা। এ তার মৌলিক অধিকার। এ সম্পর্কে শংকরাচার্য নিষেধাজ্ঞা জারি করছেন কোন অধিকারে? কোন ক্ষমতায়? ‘মুসলমান ফকির’ যদি দেবতুল্য হিন্দু মহাপুরুষ রূপে পূজিত হন, তাহলে তো বলতে হবে অনেক খামতি সত্ত্বেও হিন্দুধর্ম শুধু উদার, সহিষ্ণু নয়, একই সঙ্গে সর্বগ্রাহী। স্বরূপানন্দ যদি সত্যিকারের সমদর্শী হতেন, তাহলে সাইবাবার পথও যে ঈশ্বর-ভজনার একটি পথ, এই সত্য উপলব্ধি করতেন। মন্দির-মসজিদ-গির্জার চেয়েও ঈশ্বরের সবচেয়ে বড় আবাসস্থল মানুষের হৃদয়। সেই হৃদয়ে কি বিদ্বেষের বিষ ঢেলে দেওয়ার অপচেষ্টায় মেতে উঠেছেন স্বরূপানন্দজি? এই প্রশ্নে সারা দেশ উত্তাল। অদ্বৈত বেদান্তবাদী আদি শংকরাচার্য বলেছিলেন, জীব স্বরূপত ব্রহ্ম। ব্রহ্ম ও জীব অভেদ। সমগ্র জীবসত্তা যদি ব্রহ্ম হন, তাহলে সাইবাবাও কি ব্রহ্মস্বরূপ ছিলেন না? এই বিচারে, তিনি মুসলমান না হিন্দু, সেই অনুসন্ধান আজ গৌণ। অতএব তাঁকে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে অসুবিধে কোথায়? স্পষ্টতই বাহ্যিক ধর্মকে প্রাধান্য দিয়ে, এক জাগতিক অনৃত তথ্যকে দ্বারকার শংকরাচার্য প্রতিষ্ঠা দিতে চাইছেন। এই প্রবণতা ভয়ঙ্কর ও বিধ্বংসী।