Home >> Story >> সংগীত

শিল্পসংস্কৃতি

সংগীত

চন্দন বসু রায়

  • আচার্যের ছায়ায় ছায়ায়

    সুগায়কের প্রতিটি প্রয়োজনীয় গুণাবলী তাঁর আয়ত্তে, কিন্তু শেষ অবধি অনুরূপায়ণের বেড়া ডিঙোতে পারেন না।

     

    সংগীত গুরুমুখী বিদ্যা। কিন্তু গুরু অনুসারী শিষ্য নিজের পথে না চলে গুরুর পথেই যদি নিজেকে ক্রমাগত সঞ্চালিত করতে থাকে, অনুসরণ তখন অনুকরণে পর্যবসিত হতে চায়। আপাত ভঙ্গিতে শিষ্যের গান গুরুর গানের মতো মনে হলেও, গুরুর মৌলিক গানের পুলকসঞ্চারী ভাবরস, অনুকৃত গানের সীমাবদ্ধতা পেরতে পারে না। সম্প্রতি জি ডি বিড়লা সভাঘরে সুবিনয় রায়ের পুত্র সুরঞ্জন রায়ের একক রবীন্দ্রসংগীতের আসরে এই ভাবনায় মন আলোড়িত হচ্ছিল।

    আসরটি ছিল সুবিনয় রায়ের ৯২তম জন্মবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে শ্রুতি পরিষদ নিবেদিত, আলাপচারিতা সহযোগে একক রবীন্দ্রসংগীতের এক অনুষ্ঠান। সংলাপের বিষয় সুবিনয় রায়। রবীন্দ্রসংগীতে সিক্ত এই ব্যক্তি সম্পর্কে অজানা কিছু তথ্য প্রাপ্তির আশায় মন উদ্গ্রীব হয়েছিল। সংলাপ-সঞ্চালিকা শর্মিষ্ঠা গোস্বামী চট্টোপাধ্যায় সেদিকে বিশেষ রেখাপাত করেননি। গানের ফাঁকে গায়কের সঙ্গে তাঁর কথোপকথনগুলি সারবস্তুহীন ফাঁপা কথায় ক্লান্তি এনে দেয়।

    সুরঞ্জন রায়ের কণ্ঠ উত্তম যোগ্যতাসম্পন্ন এক সুগায়কের প্রয়োজনীয় গুণাগুণে সমৃদ্ধ। ভরাট কণ্ঠস্বরে তাঁর সুরবিন্যাস গভীর ও সুমধুর। এই আসরের গানগুলি তিনি চয়ন করেছিলেন তাঁর পিতৃদেবের গাওয়া গান দিয়ে- এবং ইতস্তত, কোনও ধারা বজায় রেখে নয়। শুরুতে সমবেত কণ্ঠের দু’খানি গান, ‘সুন্দর বহে আনন্দ মন্দানিল’ ও ‘জানি জানি কোন আদিকাল হতে’ সঠিক টানটান লয়ে প্রাণবন্ত হয়েছিল। সুবিনয় রায়ের কণ্ঠধ্বনিতে ‘ওঁ পিতা নোহসি পিতা নো বধি’ বৈদিক মন্ত্রটি, যন্ত্রসম্প্রসারণায় অনুরণিত হয়ে ওঠে। পিতার প্রথম রেকর্ডের দু’টি গানের কথা উল্লেখ করে সুরঞ্জন গাইলেন, ‘তুমি ডাক দিয়েছ কোন সকালে’ এবং ‘এই করেছ ভাল নিঠুর হে’। গানের চলন ও গাওয়ার ধরনে চকিতে সুবিনয় রায়ের গায়কি স্মরণে আসে। প্রাথমিক অবস্থায় এক চমত্‌কারিত্বের অনুভূতি হয়। ক্রমে মনে হয়, এই তেজস্বী কণ্ঠের গান কেবল পিতৃসদৃশ অনুরূপায়ণে ব্যাপৃত হয়ে আছে। এই সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে পারলে এ গান উল্লসিত হয়ে শ্রোতাকে মুগ্ধ করতে পারে। শেষ অবধি এই ধারণা নিয়েই সভাগৃহ ত্যাগ করতে হয়েছিল।

    গায়কের কণ্ঠে ‘বহে নিরন্তর অনন্ত আনন্দধারা’, ‘বীণা বাজাও হে মম অন্তরে’, ‘অজানা খনির নূতন মণির’, ‘এ কী সুধারস আনে’, ‘তিমির অবগুণ্ঠনে’, ‘এরা পরকে আপন করে’, ‘ওগো স্বপ্নস্বরূপিণী’, ‘কখন বসন্ত গেল’ ইত্যাদি মোট ২১টি গান, ছন্দে লয়ে সাধিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের গানে সঠিক লয়টি ধরতে না পারলে সে গান রসোত্তীর্ণ হয় না। এই লয় গুণটি সুরঞ্জনের আয়ত্তে। বহু গানে উদারা ও তারার সপ্তকে, তাঁর কণ্ঠস্বর সুরের সঙ্গতি রাখতে পারেনি। মধ্যসপ্তকে কণ্ঠ অবাধ স্বচ্ছন্দ। ‘অনেক পাওয়ার মাঝে মাঝে’ ও ‘এখনো কেন সময় নাহি হল’ টানা সুরেলা চলনে অভিব্যক্ত। ‘এ মোহ আবরণ’ খানিক অস্বচ্ছ সুরবিন্যাসে আড়ষ্ট হয়েছে। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আজ আনন্দে প্রেম-চন্দ্রে নেহারো’ ব্রহ্মসংগীতটি সুগীত।