Home >> Story >> সংগীত

শিল্পসংস্কৃতি

সংগীত

রামানুজ দাশগুপ্ত

  • পঞ্চ কবির গান

    দ্বিজেন্দ্রলাল, রজনীকান্ত, অতুলপ্রসাদ ও নজরুল ইসলামের গানের চর্চাকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে সাধু উদ্যোগ।

    জ্ঞান মঞ্চে ‘পঞ্চ কবির গান’ নিবেদন করলেন ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘এ স্টেপ ফর মিউজিক’ সংস্থার আয়োজনে। উনিশ শতকের শেষ পাদ থেকে বিশ শতকের শুরুর কয়েকটি দশকে বাংলায় যে-ক’জন একই সঙ্গে গীতিকার, সুরকার ও গায়ক ছিলেন তাঁদের মধ্যে অবশ্যই সর্বাগ্রে থাকবেন রবীন্দ্রনাথ এবং তারপর, বয়সের ক্রমানুসারে দ্বিজেন্দ্রলাল, রজনীকান্ত, অতুলপ্রসাদ ও নজরুল ইসলাম। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ছাড়া বাকি রচয়িতাদের নাম ক্রমশ আবছা হয়ে যাচ্ছে। এঁদের গানের চর্চাকে সজীব রাখার দায়িত্ব নিয়েছেন মুষ্টিমেয় কিছু শিল্পী, ঋদ্ধি তাঁদের মধ্যে অন্যতম।

    মূল অনুষ্ঠান শুরু হল সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতাপাঠ দিয়ে, রবীন্দ্রনাথ রচিত ‘তোমার শঙ্খ ধূলায় পড়ে কেমন করে সইব’। ঋদ্ধি গাইলেন অনুষ্ঠানের প্রথম গান ‘তাই তোমার আনন্দ আমার পর’। মোট তিনটি রবীন্দ্রনাথের গান শুনলাম। এর মধ্যে ‘দাঁড়াও আমার আঁখির আগে’ সবথেকে ভাল লাগল।

    সুজয় প্রসাদের আকর্ষণীয় কণ্ঠের ভাষ্য পাঠের সঙ্গে শুরু হল অতুলপ্রসাদ সেনের রচনা পরিবেশন: ‘আমায় রাখতে যদি আপন ঘরে’। অনেক তথ্যের সন্ধান পেলাম। লখনউপ্রবাসী ব্যারিস্টার অতুলপ্রসাদ সেনের কাছে গানের তালিম নিতে যেতেন তরুণ পাহাড়ী সান্যাল। বিশেষ একখানি গানের তালিমের সময়ে অতুলপ্রসাদ পাহাড়ী সান্যালকে কী উপদেশ দিয়েছিলেন তা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ভাষ্যপাঠের মাধ্যমে এক অপূর্ব ছবির মতো চোখের সামনে ভেসে উঠল। গানটি হল ‘যাব না যাব না যাব না ঘরে’। ষাটের দশকের প্রথম দিকে এই আলোচকের সৌভাগ্য হয়েছিল এক অনুষ্ঠানে পাহাড়ী সান্যালের কণ্ঠে অতুলপ্রসাদের গান শোনার। তাঁর গাওয়া ওই গানটি এখনও আমার কানে বাজে। ওই গানটি সবাই দাদরা তালে গেয়ে থাকেন, ঋদ্ধিও তাই গেয়েছেন। কিন্তু পাহাড়ী সান্যালের কণ্ঠে এটি কাহারবা তালে একটি বিশেষ ছন্দের ওপর শুনেছি যেমনটি অতুলপ্রসাদী গানের স্বরলিপি কাকলিতে পাই। ঋদ্ধি অনুসন্ধানী গবেষক, তাই এ ব্যাপারে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। ‘একা মোর গানের তরী’ একটি সুন্দর পরিবেশনা।

    রজনীকান্ত সেনের গান গাওয়া শুরু হল তাঁর বিখ্যাত রচনা ‘তুমি নির্মল কর’ দিয়ে। এর পর ‘যেখানে সে দয়াল আমার’ এবং সব শেষে ‘আমি অকৃতি অধম’। তিনটি গানেরই পরিবেশন সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন। সুজয়ের সুললিত কণ্ঠে ত্রিমাত্রিক ছন্দে নিবদ্ধ আবৃত্তি, ‘কুহেলীর দোলায় চড়ে এল ওই কে এলো রে’, এক নিমেষে মনকে দুলিয়ে দিয়ে যায়। বোঝা গেল, এবার গাওয়া হবে সেই কবির গান যাঁর এক হাতে বাঁশি ও অন্য হাতে রণতূর্য, কাজী নজরুল ইসলাম। এখানেও তিনটি গান শুনলাম। ‘আমি সূর্যমুখী ফুলের মতো’, ‘মোর ঘুমঘোরে এলে মনোহর’ এবং ‘চাঁদ হেরিছে চাঁদ মুখ তার’। দ্বিতীয় গানটি প্রসঙ্গে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় উল্লেখ করলেন শচীন সেনগুপ্ত রচিত ‘রক্তকমল’ নাটকের কথা, যার সংগীত পরিচালনা করেছিলেন নজরুল ইসলাম, গান গেয়েছিলেন তখনকার প্রথিতযশা গায়িকা ও অভিনেত্রী ইন্দুবালা। তিনি অন্যান্য গানের সঙ্গে উপরিউক্ত গানটিও গেয়েছিলেন। ওই গানটি আমিও শুনেছি এবং ঋদ্ধি তাঁর গাওয়া সুরটি অনেকটাই অনুসরণ করার চেষ্টা করেছেন। এই পঙ্ক্তিটি বইতে আছে ‘ঝম ঝম রম ঝম ঝম ঝম’, কিন্তু ইন্দুবালা দেবী গেয়েছেন ‘ঝম ঝম রম ঝম ঝম রম’। এই ‘ঝম রম’টা হয়তো অনেকের কানে লাগতে পারে, কিন্তু ঋদ্ধি সেটাই গেয়েছেন। এটা আমার কাছে প্রশংসার যোগ্য বলে মনে হয়।

    সুজয়ের ভাষ্য থেকে জানা গেল মাত্র বারো বছর বয়সে দ্বিজেন্দ্রলাল লিখেছিলেন ‘কোথা যাও নিশা নাথ’। এটি একটি পূর্বে না-শোনা দ্বিজেন্দ্রগীতি। আর দু’খানি অতি পরিচিত দ্বিজেন্দ্রলালের গান আমরা শুনতে পেলাম, ‘পতিতোদ্ধারিণী গঙ্গে’এবং ‘ধন ধান্য পুষ্প ভরা’।

    এটিকে শুধু মাত্র গানের অনুষ্ঠান বললে ভুল হবে, কারণ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও সুজয় প্রসাদের ভাষ্য পাঠে কাব্যরসের সঙ্গে অনেক না-জানা তথ্যেরও সন্ধান পাওয়া গেল। ভাষ্যটিও ঋদ্ধিরই রচনা এবং সত্যিই প্রশংসার যোগ্য।

    ঋদ্ধির কণ্ঠে আমার সব থেকে ভাল লেগেছে রবীন্দ্রসংগীত ও দ্বিজেন্দ্রগীতি। কয়েকটি গানে মনে হয়, বেশি আবেগের ফলে ভুল শব্দ উচ্চারিত হয়েছে, যদিও পুনরাবৃত্তির সময়ে তা শুধরে নেওয়া হয়। কখনও বা দম নেবার অসুবিধার জন্য গানের কথার মধ্যে শ্বাস নিতে হয়েছে। তুলনায় নজরুলের গান তেমন ভাবে তাঁর গলায় আকর্ষণীয় হয়ে ওঠেনি। আশা করব ভবিষ্যতে ঋদ্ধির গানে আরও গভীরতা থাকবে, তাকে নিঁখুত করার প্রচেষ্টা থাকবে।