Travelogue

মহান সূর্যের পল্লীতে

মল্লিকা ধর

  • শহরটির নাম ন্যাচেজ (Natchez)। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি রাজ্যে মিসিসিপি নদীর তীরে পুরনো শহর। তবে কলম্বাসের খুঁজে পাওয়া নতুন পৃথিবীর হিসেব কিনা, এই হিসেবে তিনশো কি চারশো বছর  হলেই বলে ঢের পুরনো।

    এই ন্যাচেজ শহর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ফরাসি ঔপনিবেশিকদের দ্বারা, ১৭১৬ খ্রিস্টাব্দে। মিসিসিপি নদীর দক্ষিণাংশের উপত্যকার প্রধান পুরনো শহরগুলোর মধ্যে এই শহর অন্যতম। ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণও বটে।

    তবে ওই জায়গাটিতে প্রাচীন নেটিভ আমেরিকানদের (যাদের আগে রেড ইন্ডিয়ান বলা হত) সমাধিভূমি আছে, জায়গাটি সত্যিই বহুকাল যাবত্‌ মানুষের তৈরি জনপদ ছিল,  ইউরোপীয়রা আসার আগে ওই অঞ্চলে ন্যাচেজ নামের জনজাতি বাস করত। হাজার বছরেরও পূর্বেকার তাদের বসবাসের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছে ওইখানে।

    বসন্তের শেষদিকে এক সকালবেলা, আবহাওয়া ভারী চমকার! বসন্তপল্লবিত গাছেদের নতুন পাতায় পাতায় ঝলমল করছে সোনালি রোদ, তুলোমেঘ ওড়া নীল আকাশে পাক খাচ্ছে চিলেরা। বেড়াতে যাবার পক্ষে আদর্শ দিন।  ন্যাচেজ শহরের উদ্দেশে সকাল-সকাল  রওনা দিই আমরা। সঙ্গে ভ্রমণগাইড হিসাবে একটি ক্ষুদ্র পুস্তিকা, যাতে শহরটির দ্রষ্টব্য ইত্যাদি আর হোটেল-রেস্তরাঁর বর্ণনা আর ম্যাপ।

    ফ্রিওয়ে দিয়ে হু হু করে চলেছে গাড়ি, দু’পাশে ঘন সবুজ দীর্ঘদেহ পাইনগাছের আড়াল, মাঠ বা চারণক্ষেত্র দেখতে দেয় না। এই সুন্দর সবুজ দেশে কেবল এইটাই কষ্ট অনুভব করি, আদিগন্ত খোলা মাঠের ওইপারে সূর্য, এই জিনিসটা মিস করি। এদেশের পশ্চিমের দিকে বা মধ্যিখানেও অমন নাকি আছে হাজার হাজার মাইল দীর্ঘ খোলা মাঠ, তার ওইপারে আবিরলাল সূর্য অস্ত যাচ্ছে, মেঘে মেঘে আকাশকুসুমের অঞ্জলি দিতে দিতে। একদিন হয়তো দেখা হয়ে যাবে তাও।

    ন্যাচেজ শহরটির নাম ন্যাচেজ নামের নেটিভ আমেরিকান জনজাতির নামে, যদিও জনজাতির  উচ্চারণ নাকি নোচি। ওরা সমাধির উপরে স্তূপ বানাত, যার উপরিভাগ সমতল। ওদের দলনেতাকে বলতো মহান সূর্য।

    নোচি শুনে আমার কঠোপনিষদের বালক নচিকেতাকে মনে পড়ে, যে মৃত্যুপুরী থেকে ফিরে এসেছিল স্বয়ং যমের কাছ থেকে আত্মজ্ঞানের অমৃত লাভ করে। দেখা যাক, এখানের ওই হারিয়ে যাওয়া নচিকেতাদের কোনও চিহ্ন কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় কিনা।

    কাছাকাছি হতে থাকি রহস্যময় শহরের, বাতাসে নদীর গন্ধ পাই, বন্ধু  হেসে বলে ক্রফিশের গন্ধ। এখানে ক্রফিশ বলে একরকম চিংড়ি কাঁকড়ার মাঝামাঝি দেখতে জলজ জীব খুব আদরণীয় খাবার, ক্রফিশ-বয়েল নামে উত্‌সবও হয় খোলা মাঠে, যাতে গামলা গামলা ক্রফিশ সেদ্ধ এনে লোহার চৌবাচ্চার মতন বড় ট্রেতে ঢেলে দেয়, সঙ্গে থাকে আলুসেদ্ধ ভুট্টাসেদ্ধ ইত্যাদি। কাগজের প্লেটে ক্রফিশ আর সেদ্ধ আলুভুট্টা তুলে এনে মাঠের ঘাসের উপরে গোল হয়ে বসে সবাই মিলে ক্রফিশ ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে খাবার স্বাদই আলাদা, যেন ময়দানে সবাই মিলে ফুচকা খাচ্ছি।

    ন্যাচেজে পৌঁছে প্রথমেই খাবারের জায়গার সন্ধান করা হল, সেখানে বেশ ভালমতো লাঞ্চ সেরে তারপরে মিউজিয়ামে যাওয়া, সেখানে ন্যাচেজ জনজাতির  শিলনোড়া, মাটির ভাঙা পাত্র, হাতুড়ি-বাটালিজাতীয় কিছু যন্ত্র রাখা আছে প্রিজার্ভ করে, আর আছে ছবি। কিন্তু আমাদের উত্‌সুক মন এতে তৃপ্ত হয় না, আরও দেখতে চায়।

    এখানকার গাইডেড টুর বড় বড় প্রাসাদতুল্য ভবন দেখানোর জন্য, গত শতকে তৈরি সুন্দর সুন্দর বড় বড় ভবন, প্রত্যেকটার নাম আছে, গাইডেরা ঘুরিয়ে দেখায় ঘরদোর, আয়না, রুপোর টি-সেট, শোবার ঘরে পুরনো আমলের মস্ত মস্ত কারুকার্য করা খুঁটি আর পায়াওলা খাট।

    এক ভবনের বাগানে নীল ফুলের পাশে আমরা ভ্রমণকারী দলটা একটু জিরিয়ে নিতে গাছের ছায়ায় বসি। ভারী রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনটা। সকলেই ঘেমে উঠেছে এত ঘুরে।

    নচিকেতাদের রেখে যাওয়া কোনও চিহ্ন দেখতে মন ব্যাকুল, কিন্তু কোথায়? নিশ্চিহ্ন হয়ে মিলিয়ে গিয়েছে কি তারা? এত তাদেরই ভূমিখণ্ড, কত হাজার হাজার বছর ধরে তাদেরই মুক্ত দুনিয়া ছিল, কারা নতুন মানুষেরা এসে এমন করে খেদিয়ে দিল তাদের সবাইকে? কিছুই আর রইল না মনে করানোর মতন যে তারা ছিল? শুধু নামটা বিকৃত উচ্চারণে হলেও রয়ে গেছে কেমন করে!

    রোদ পড়ে আসা বিকেলে আমরা গিয়ে সেই সমাধিভূমিতে পৌঁছাই। সবুজ ঘাসে ঢাকা সেই সমতলশীর্ষ স্তূপের কাছে, দীর্ঘ দীর্ঘ ওক পাইন ম্যাগনোলিয়া ছায়া মেলে রেখেছে মাঠে। স্তূপের পায়ের কাছে গিয়ে বসি।

    মাঠের মধ্যে একটা খড়ের কুটির বানানো আছে, প্রাচীন ন্যাচেজরা কীরকম বাড়ি বানাত থাকবার জন্য, সেটা বোঝানোর জন্য।  খড়ের বাড়িটার কাছে গিয়ে ভাল করে দেখি। বাড়ির দরজাটা অত্যন্ত ক্ষুদ্র, ওরা কি হামাগুঁড়ি দিয়ে ঘরে ঢুকত নাকি?

    ‘আরণ্যক’ মনে পড়ে যায়। ইতিহাসের পরাজিতরা হারিয়ে যায় নিঃশব্দে, কোথাও কোনও বিচূর্ণ অস্থিকঙ্কালের রেখায় তবু থেকে যায় কিছু চিহ্ন কোথাও না কোথাও। আমরা তাদের খুঁজে পাই না। খুঁজতে চাইও কি তেমন করে? দিন আনা দিন খাওয়া ছাপোষা আমরা কেমন করেই বা খুঁজব এই সান্ত্বনা দিই।

    সমাধিমাঠ থেকে হাঁটতে হাঁটতে বিরাট নদীটির তীরের ফুলগাছের পার্কে এসে দাঁড়াই, বুক ভরে মিসিসিপি নদীর হাওয়া টেনে নিই। পার্কে অনেকগুলো সুন্দর সুন্দর গোল চেহারার চারিদিক খোলা লতাগৃহ, উপরে বাহারি চালা।  হয়তো বিগত দিনের মস্ত মস্ত স্কার্টপরা ছবির মতো সুন্দরীরা ওই মার্বেল পাথরের লতাগৃহে পালকের পাখা হাতে শুয়ে বসে দ্বিপ্রহরের নদীর দৃশ্য উপভোগ করতেন।

    নদীর উপরে দেখা যায় সুন্দর এক ব্রিজ, এ ব্রিজ মিসিসিপির দুই তীরের দুই শহরকে যুক্ত করেছে। এ পারে ন্যাচেজ, ওপারে ভিদালিয়া (Vidalia)। পার্কের সিঁড়ি ধরে নেমে গিয়ে চটি খুলে রেখে নদীর জলে পা ডুবাই, আহ! কী ঠান্ডা!  মিসিসিপির জলে আমার গঙ্গাধোয়া মন দুলে ওঠে, সীমানাচিহ্ন মুছে যায়, হরিদ্বারের খরস্রোতা গঙ্গার স্পর্শ পাই এই জলে, জাদু নাকি? ভ্রমণ-সঙ্গী বন্ধুরা ডাকছে, আমি উঠে আসি দ্রুত চটি পরে নিয়ে, এবারে ফেরার সময় হয়ে এল।

    ফিরে যেতে যেতে জাগর-স্বপ্নে হাজার বছরের পূর্বেকার নাচেজে ফিরে আসার জন্য প্রার্থনা করতে থাকি, তখন এইসব পথ ছিল না, প্রাসাদ ছিল না, পার্ক ছিল না, লতাগৃহ ছিল না, কিন্তু ছিল সবুজ মহারণ্য, ছিল ওই মহা বিপুলা নদী। ছিল সরল মুক্ত মানুষের দল, অজস্র পশুপাখীসরীসৃপ যাদের অনেকেই এখন বিলুপ্ত।

    তখন মানুষের নাম হত প্রকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে— বনকুসুম, বলাকা, ঋষভ, ঋক্ষবান... যাযাবর তারা পাড়ি দিত অরণ্য থেকে অরণ্যান্তরে...

    ডানহাতের মুঠোর মধ্যে ছিল ছিঁড়ে আনা সুগন্ধি ঘাসের গোছা, সন্তর্পণে হাত তুলে আনি নাকের কাছে... এই চিরঞ্জীব তৃণসৌরভ আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই ফেলে আসা বহুদূর অতীতে। বনজ্যোত্‌স্না উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, বনসুরভি ভেসে আসে হাওয়ায় হাওয়ায়, অরণ্য-মর্মর যেন বিরহীর দীর্ঘশ্বাস। সেদিনের কোনও এক ঋক্ষবান আর কোনও এক বনকুসুমির প্রেম-বিরহ-মৃত্যুবিচ্ছেদ জড়ানো গল্পের বীজ আমার ভাবনা অধিকার করে নেয়।

You may like