কবিতা

কীভাবে জীবন ধুতে হয়

  • চৈতালী চট্টোপাধ্যায়

    প্রথম বছর। কপোত-কপোতী ঠোঁট! নয়নের মণি!

    রোজ-ই নতুন, পাশবালিশের খাঁজে

    সুখ ও সুখের নদী। ভেসে যায় প্রেমের তরণী।

     

    দ্বিতীয় বছর। খুশি, ন্যাচারালি। ঘরে খুকিটি আসছে।

    খোকা চেয়েছিল ওরা? তা হোক! তা হোক!

    ‘ঘুমোও লক্ষ্মী, কাঁথা পালটে দেব আমি।’ চাঁদও হাসছে...

     

     

    তৃতীয় বছর। ও গেছে বাথরুমে। সেই ফাঁকে

    ওর মোবাইলে, চোখ। ওর ইনবক্সে, সন্দেহ।

    কলহপ্রবণ বেলা গড়াতে থাকে।

     

    চতুর্থ বছর। একজন উত্তরে গেল। অন্যে, দক্ষিণে।

    এ বলল, ‘দেরি হবে’, সে বলল, ‘রাতে ফিরব না’,

    ভুরু কি উঠল কারও? সুর কাটল মনে?

     

    পঞ্চম বছর। হাত ধরাধরির আগেই

    অনন্ত শূন্য মাঝখানে।

    আমাদের মধ্যে আর এককুচি কথারও সেতু নেই!

     

    অসুবিধে হয় না কিছু। এভাবে চললে, কোনও দাগও লাগে না

    - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -

     সংশয়

     উত্থানপদ বিজলী

     

    শুধু একবার দেখে নিতে চাই

    বুঝলে নিতাই!

    কতখানি খরায় পুড়েছ, কতখানি ভিজেছ বর্ষায়।

     

    কতখানি হয়েছ দগ্ধ, সিক্ত হয়েছ কতখানি

    দাঁড়িপাল্লায় এদিক-ওদিক

    শুধু দেখে নিতে চাই।

    তারপর কিছু কথা, তারপর কিছু হাসা

    তারও পরে হবে ভালবাসা।

     

    দাবায় আসন আছে পাতা

    ওইখানে বসো, আমি শুধু দেখে নেব খাতা

    কতখানি হিজিবিজি আর কতখানি কাটা...

    ভালবাসা অত সোজা নয়

    দশদিকে থাকে সংশয়।

    - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -

     

     

    অপরিচিত

     তীর্থঙ্কর দাশ পুরকায়স্থ

     

    একটি জীবন অপরিচিত।

     

    যা ছিল বলার, ভুল বলা হল,

    আলো সরে যায় সন্ধ্যার দিকে বিকেলের,

    তুমি চলে গেলে, বুকে কুয়াশার মেঘ,

    বলা হয়নি তা, সহজে যা বলা যেত।

     

    আজন্ম শুধু মেলায় ঘুরেছি মুখোশের,

    হাসি বিনিময়, চোখের রুপোলি অশ্রু

    দাম দিয়ে কেনা, নদীর কিনারে একদিন

    যদি দেখা হত, মুছে ফেলা যেত সব রং,

     

    হয়তো আপন মুখের লাবণি একবারও দেখা যেত!  

    - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -

     

     ছায়া

     জয়নাল আবেদিন

     

    দুপুরের ছায়া জড়ো করতে করতে যখন সে

    হাঁপিয়ে ওঠে তখন আমার ভীষণ ভয় হয়,

    যদি আছাড় মারে, আমি তো দীর্ঘদিন

    ছায়ার পাশে পাশে আছি।

     

    নদী জানে কতটা শিখেছি সাঁতার

    রাত জানে ঘুম কাকে বলে,

    সে কি জেনেছে শরীর জুড়ে কতটা জ্বর,

    কতটা ব্যথা!

     

    বিকেল কুড়োতে গিয়ে যখন সে দেয়ালে

    ধাক্কা খেল তখন আমাকে বলতেই হল,

    জানো, মা এখন খেতে দিয়ে সামনে বসে না,

    বলে না খোকা আর কিছু লাগবে?  

    - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -

     

    মৃত্তিকা

     শফিক আলম মেহেদী

     

    তোমাকে নিয়ে কোথায় পালাব মৃত্তিকা

    যত কৃষ্ণ হোক এ তো আমার দেশ

    এখানে জীবন বাঁচে মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে

    এখানে বাতাসে লাশের গন্ধ ভেসে বেড়ায়

    এখানে সূর্যকে ঘিরে থাকে মেঘের কুটিল চোখ

    এখানে জ্যোত্‌স্নাকে ধাওয়া করে অমাবস্যা-রাত্রি

     

    এখন এখানে দিনের আলো নেই

    কেবলই সাঁঝবেলা আলো-আঁধারির খেলা

    আমাদের ভালবাসা তবু জীবনের দিকে

    আমাদের অভিসার তবু আলোর দিকে

    তোমাকে নিয়ে কোথায় পালাব মৃত্তিকা

    যত কৃষ্ণ হোক এ তো আমার দেশ

    আমারই মা মাতৃভূমি!

    - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -

     

     বোধন

     সুকুমার মান্না

     

    করঞ্জিয়া থেকে আরও দূরে, শাল-সেগুনের বিস্তৃত বনভূমির মাঝে বৈতরণ নদী পেরিয়ে এলাম। মহাষষ্ঠী আজ। এ নদীর পাড়ে কাশের বন নেই কোথাও। পিছনে পড়ে রইল ময়ূরভঞ্জ। আরও পিছনে বহুদূরে, বাংলার শারদোত্‌সবের উচ্ছ্বসিত কোলাহল। সন্ধে হয়ে এল। দুর্গম বিশোই-রেঞ্জ পেরিয়ে এসেছি দুপুরবেলায়। তারপর থেকে পথের দু’পাশে লাগাতার অরণ্যের শাসন। বৈতরণ নদী পার হয়ে, কেওনঝাড়ের উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথে যাই। দু’-একটা আদিবাসী গ্রাম। নিকানো উঠোনে পাথরপ্রতিমার মতো যুবতী বধূ। অরণ্যের এই নিঝুমে আঁধার নেমে আসে অবশেষে। সাঁঝবাতি জ্বলে না কোথাও। ঢলানি-চাঁদ, মেঘের আড়ালে অভিসারে চলে গেলে, জ্বলে ওঠে জোনাকির ঝাঁক। জোনাকির আরতিতে, সেগুনমঞ্জরির গন্ধে আজ পাথরপ্রতিমার বোধন!

    - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -

     

     

    সাইকেল

     সোমেন মুখোপাধ্যায়

     

    উনিশের যুবক

    তুমি জেনেছ ক্ষয় ও মেরামত।

    জেনেছ, প্যাডেলের ঘূর্ণনে

     

    কীভাবে হাওয়ায় ওড়ে হলুদ ওড়না,

           সাইকেল চড়া বালিকার বুকে

           ছোট ছোট ঝাঁপ।

    ‘এখানে সাইকেল মেরামত করা হয়’

    এমন দোকানের মুখোমুখি বালিকা বিদ্যালয়।

     

    সারাদিন ঠুকঠাক, ক্রিং ক্রিং

    চাকাও ঘুরতে চায় টো-টো...

             ক্লাসের ভেতরে দশমিকের অঙ্ক, নাকি

    দু’টি সরলরেখা সমান্তরাল চলে যায়।

     

    ধানখেতের পাশে উঁকি দিচ্ছে কাশের বন

          স্নিগ্ধ, সাদা বকের মতো,

    ছুটির ঘণ্টা বেজে ওঠা পড়ন্ত বেলায়

          ঘরে ফিরছে দু’দিকে বিনুনি।

     

    চাকা বসে যাওয়া সাইকেলের কাছে

    নিজেকে কর্ণ মনে হয়, সারাইওলার।

    - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -

     টানাপোড়েন

     উত্তমকুমার মোদক

     

    দুঃখ যদি বিষাদ ঢালে বুকে

    কষ্ট আরও নিংড়ে তোলে শোক

    রেলিং ধরে বিপজ্জনক ঝুঁকে

    ব্যথার থাকে খাদের দিকে চোখ

     

    টানাপোড়েন এই ধরনের জুড়ে

    মনখারাপের হাঁটতে থাকা দিন

    গানেস্থিত অবগাহন ফুঁড়ে

    আচড়ে দেয়া উত্থিত হয় ঋণ

     

    শোক-দুঃখ তখন ব্যথা ভুলে

    গীতবিতান, মন ঢেলে নিই তুলে

    - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -

    এক পাঠকের উদ্দেশে

     শুভব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়

     

     

    এই বইটির দু’টি কপি কিনে নিন দোকান কিংবা ফুটপাথ থেকে,

    তারপর যে-কোনও একটির মাঝবরাবর ধারালো কিছুর সাহায্যে

    (আপনার অস্ত্র নির্বাচনে আমার পূর্ণ আস্থা আছে)

    ছোটখাটো একটা গর্ত করে ফেলুন এবং তার ভিতর দিয়ে

    সুতো ঢুকিয়ে দু’প্রান্ত বেঁধে দিন দড়িতে, দেখবেন

    যেন সুতোটা বইয়ের ভার বইতে পারে, অবশ্য

    গ্রন্থভার আর কতটুকুই বা!

    আরও কিছু কাজ বাকি আছে এখনও,

    প্রথমে বইয়ের দু’টি মলাট মেলে দিন- দু’ভাগে

    ছড়িয়ে পড়ুক রেক্টো আর ভার্সো, দেখতে যেন

     

    অনেকটা মনে হয় উড়ে-চলা পাখির ছড়ানো দু’টি ডানা।

    আপনার হাতে আছে অন্য একটি আস্ত বই,

    এবার সেই ঝুলন্ত বইটির নিচে বসে

    আপনি একটি-একটি করে কবিতা ধীরে-ধীরে

    স্পষ্ট উচ্চারণে অনুচ্চকিত কণ্ঠে পড়তে থাকুন...

     

    ম্যাজিক, ম্যাজিক ঘটতে থাকবে আপনার চোখের সামনে

    সেই ডানা-বই/পাখি-বই থেকে আপনি ঠিক দেখতে পারবেন

    নেমে আসছে রক্ত আর ফুলের পাপড়ি, কবোষ্ণ জল আর চোখের মণি,

     

    শুনতে পাবেন অবুঝ ভায়োলিন, কিউবিস্ট গিটার, মায়াবী পিয়ানো

    হয়তো দু’-একটা স্বপ্নও- যাকে আপনিই একমাত্র চিনতে পারবেন,

     

    কারণ সেগুলো আপনারই একান্ত ব্যক্তিগত- দেখবেন ট্র্যাপিজ়ে

    দোল খেতে-খেতে নেমে আসছে, গায়ে এসে বসছে নিশ্চিত,

    শুধু কবিতা পড়ার কাজটা থামাবেন না, পড়ে যান

    অক্ষর শব্দ রাগ ঘৃণা আত্মবিশ্বাস ভালবাসা ভালবাসা ভালবাসা

    একসময় দেখবেন- অনেক কিছু দেখতে-দেখতে ততক্ষণে

    আপনি যথার্থই হয়ে উঠেছেন দিদৃক্ষু- মিলিয়ে গিয়েছে

    সেই সুতোয় টাঙানো বই, কেবল মেঝেতে অবিন্যস্ত

    রক্ত আর ফুলের পাপড়ি, কবোষ্ণ জল আর চোখের মণি

    - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -

     

     স্নেহ

     তুষারকান্তি রায়

     

    দু’দিকে চায়ের বাগান রেখে নেমে আসা রাস্তায়

    আমাদের পথ পালটে গেল

     

    মাল্লাগুড়ির চৌরাস্তায় তখন বিকেল নামছে

    হাওয়ায় ভেসে যাচ্ছে এলোকেশী গাছ

    একঝাঁক ঘরে ফেরা পাখির পালক ছুঁয়ে

    নেমে আসছে লাজুক কুয়াশামাখা চাঁদ

     

    বাবা চলেছেন কলকাতায়

    সুস্থ হয়ে ফিরবেন আর খোকা চলেছে

    হঠাত্‌ ছুটিতে মামার বাড়ি

     

    মাথায় হাত রেখে বাবা বললেন, ‘ভাল থেকো’

     

    ঝিঁঝি ডাকা দোলতলা গ্রাম

    খোকার মামার বাড়িতে দিনরাত

    খোলা জানালা দিয়ে রোদ-চাঁদ-বাতাসের আনাগোনা,

    আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে নদী, পাড়ে বট,

    পানের বরজ, হঠাত্‌ ডেকে ওঠা পানকৌড়ি,

    বয়স্ক পুকুরের জলে বিলি কেটে যাওয়া

    হালকা বাতাস, অশথের হাওয়ায়

    লেজঝোলা সহজ-পাখি,

    রাতশেষে কোমল ঋষভ গাওয়া ভোর-বোষ্টমি,

    সব আছে আগের মতন

     

    হেমন্তের দিনে ঘুড়ি ওড়ালেই

    সন্ধ্যাতারার গন্ধ ভেসে আসে

    মনে হয়, বাবা বলছেন, ‘ভাল থেকো’

     

    স্নেহ ঝরে টুপ... টুপ... টুপ... টুপ

     

     

    অঙ্কন: সুব্রত চৌধুরী