মন্তব্য

দৃষ্টিকোণ ১

সুমিত মিত্র

  • হিন্দুত্ববাদীদের বিজ্ঞান গবেষণা  

    প্রাচীন ভারতেই নাকি আবিষ্কৃত হয়েছিল আধুনিক বিজ্ঞান!

    এবারের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করার পরেই সঙ্ঘ পরিবার বুঝিয়ে দিয়েছে, তারা তাদের ভারত সম্পর্কিত ধারণা নিয়ে যে-কোনও সমঝোতায় রাজি নয়। আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত দূরদর্শনের সরকারি চ্যানেলে সম্প্রচারিত তাঁর বিজয়াদশমী (আরএসএস প্রতিষ্ঠা দিবস) ভাষণে বলেছেন, ভারত এক হিন্দু রাষ্ট্র। প্রাক-নির্বাচন প্রচারে এক শ্রীমান বলেছিলেন, যে-দুরাত্মা মোদীকে সমর্থন করে না, সে স্বচ্ছন্দে পাকিস্তানে চলে যেতে পারে। মন্তব্যটির রুচিবোধ নিয়ে আলোচনা নিষ্প্রয়োজন। তবে দেখার মতো ব্যাপার হচ্ছে অনতিবিলম্বে আলোচ্য বক্তার মন্ত্রিপদ লাভ। এঁদের মনের মধ্যে যে-সমীকরণটি কাজ করছে তা হল, বিরোধীদের জন্য ভারতে কোনও জায়গা নেই, সেক্ষেত্রে পাকিস্তান-ই তাদের উপযুক্ত আশ্রয়স্থল, মানে, এক ঢিলে দুই পাখি মারা। তিনি মনে করেন, তারা পাকিস্তানে সুখে বসবাস করবে। কারণ, তারা মুসলমান এবং বিরোধীদের ভারতে কোনও স্থান নেই। কথাটি প্রথমে শুনে হাস্যকর মনে হলেও এটি মনে রাখা উচিত যে, এই দর্শন গণতন্ত্রবিরোধী। তাঁরা বড়জোর গণতন্ত্রের বহিরঙ্গ, অর্থাত্‌ নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত। গরিষ্ঠতা পেলেই তারা খুশি। সংখ্যালঘুদের বিশ্বাস অর্জন করা আধুনিক গণতন্ত্রের অন্যতম, কারও কারও মতে মুখ্য কর্তব্য হলেও তাতে সাভারকর-ভক্তদের কিছু আসে যায় না।

    ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ নামক orchestra-র overture সবে শুরু হয়েছে। তাতেই হিন্দুসভ্যতা কত প্রাচীন ও উন্নত, তা প্রমাণ করার জন্য নতুন সরকারের কৃপাপ্রার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতার হিড়িক পড়ে গিয়েছে। আসছে পৌরাণিক কল্পকাহিনি-ভিত্তিক অবাস্তব সব দাবি। সম্প্রতি মুম্বইয়ে আয়োজিত ইন্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেসের ১০২তম সম্মেলনে জনৈক ক্যাপ্টেন আনন্দবর দাস যে-বক্তব্য পেশ করেছেন, তা শুনলে শুধুু জটায়ু নয় ফেলুদাও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাবেন। তাঁর মতে, বৈদিক যুগে নাকি উড়ত ২০০ ফুট লম্বা বিমান, যার ছিল চল্লিশটি ইঞ্জিন এবং বিমানটি ছুটতে পারত শুধুু সামনেই নয়, পাশাপাশি আর পিছনেও। ক্যাপ্টেন সাহেবের মতে, এটি নাকি ৭০০০ বছর আগে মহর্ষি ভরদ্বাজের আবিষ্কার। আর-এক ‘বিজ্ঞানী’র পঠিত পেপার অনুসারে মহাভারতের যুদ্ধে ওই পৌরাণিক প্লেনে চেপেই নাকি এক মহাবীর আর-এক মহাবীরকে তাড়া করেছিলেন প্রথমে চন্দ্র উপগ্রহে এবং তারপর মঙ্গলগ্রহে। ওই সভায় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হর্ষবর্ধন, যিনি চিকিত্‌সক এবং দিল্লির নির্বাচনে দল জিতলে মুখ্যমন্ত্রিত্বের দাবিদার, নিজেও পড়েন তাঁর মতামত। তাঁর মতে, গ্রিক দার্শনিক পাইথাগরাস-এর তিনশো বছর আগে তাঁর প্রায় সব আবিষ্কার লিপিবদ্ধ করেছিলেন প্রাচীন ভারতীয় দার্শনিক বৌধায়ন তাঁর সুত্রগুলিতে।

    আশ্চর্যের বিষয় হল, এই সব গল্পই আপনি গুগ্ল খুঁজলে পাবেন। গুগ্ল তল্লাশ করলে দেখা যাবে বিমান সম্পর্কে গল্পগুলি ‘বৈমানিক শাস্ত্র’ নামে বিংশ শতকে ‘আবিষ্কৃত’ একটি  সূত্রের উপর নির্ভরশীল। কোনও এক সুব্বারাইয়া শাস্ত্রী নাকি ১৯১৮-১৯২৩ সালে প্ল্যানচেট গোছের কোনও একটা উপায়ে ঋষিদের বাক্য কানে শুনে লিখে ফেলেছিলেন ৩০০০ শ্লোক সমেত এই মহাগ্রন্থ। শুধু সেই গ্রন্থ অবলম্বন করে ১৯৫২ সালে একটি জনপ্রিয় ইংরেজি বইও লেখা হয়েছিল। ওটি যে গাঁজায় দম দিয়ে লেখা, তা নিয়ে একটি পূর্ণ তদন্তও হয়েছিল। ঋষি ভরদ্বাজের আবিষ্কার বলে কথিত এই মহাবিমান কোন জ্বালানি ব্যবহার করে গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে উড়ে বেড়াত, তার উল্লেখ নেই। জানা নেই কোন উপায়ে পৃথিবী-কেন্দ্রিক মহাকাশ-ধারণার বশবর্তী বৈদিক astronaut-এর দল মহাশূন্যে নিয়ন্ত্রণ করতেন তাঁদের যানের অভিমুখ। তবে এই জুয়াচুরি ধরা পড়ে বেঙ্গালুরু-র Indian Institute of Science-এর এক তদন্তে। তাঁরা বললেন, এইটি pure concoction  ছাড়া আর কিছু নয়। আরও বিস্তৃত করে বলা হয়, যারা এই জাল পুঁথিটি বানিয়েছে, তাদের বিমানবিদ্যা সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞানই নেই। ওদিকে হর্ষবর্ধনের বিদ্যের দৌড়ও মনে হয় গুগ্ল-এর বেশি নয়। সেখানেই আছে বৌধায়ন-এর গাণিতিক সূত্র, যেটি অনুসারে একটি চতুষ্কোণের তির্যক-এর সমচতুর্ভুজের বর্গফল ওই চতুষ্কোণের দুই বাহুর বর্গফলের সমান। এটি পাইথাগোরাসের একটি থিওরেমও বটে। তবে তফাত হচ্ছে ওই গ্রিক উপপাদ্যটি উপপাদ্যই, অর্থাত্‌ প্রমাণ নির্ভর। কিন্তু বৌধায়ন রেখে গিয়েছেন সূত্র, যা প্রমাণহীন আপ্তবাক্য।

    কিন্তু হিন্দুত্ব যে এক প্রাচীন সভ্যতার নাম, তা তো জানা কথা। ব্যবিলনীয় ও সুমেরীয়দের মতো হিন্দুরাও যে ছিলেন নানা বিশেষ জ্ঞানের অধিকারী তা-ও জানা তথ্য। কিন্তু নানাবিধ মিথ্যাগল্পের আশ্রয় নিয়ে মোদী-ভক্তরা হিন্দু ভারতের এক অলীক ইতিহাস রচনায় মেতেছেন। কী তার উদ্দেশ্য?

    মোদী কিন্তু এক প্রতিভাবান রাষ্ট্রনেতা। মাত্র সাত মাসের মধ্যে তিনি দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে এমন সব পরিবর্তন এনে দিয়েছেন, যা শুধু ইউপিএ বা মিলিজুলি সরকারের পক্ষে নয়, এমনকী বাজপেয়ীর আমলেও ভাবা সম্ভব ছিল না। নেতার ভূমিকায় তিনি সাহসী। অপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা হন না। তাঁর চরিত্রে দৃঢ়তা আছে, যে-কারণে এককভাবে কোনও ধর্মনিরপেক্ষ বা বামপন্থী নেতাই তাঁর সঙ্গে টক্কর দিতে সাহস পান না। আন্তর্জাতিক অর্থনীতি এখন চূড়ান্ত টলমলে অবস্থায় চলছে। যখন সে সামলে উঠবে, তখন মোদীর নেতৃত্বে ভারতের অর্থনীতি হয়তো দৌড়বে গত দুই দশকে চিন যেভাবে উন্নতি করেছিল সেই গতিতে। কিন্তু সাভারকর-প্রেমী মোদী পালটে দিচ্ছেন গাঁধী অঙ্কিত ভারতের সহিষ্ণুতার মানচিত্র। সেই মানচিত্রে আছে বহু শতাব্দ ব্যাপী বহু মানুষের অসংখ্য বিশ্বাসের সহাবস্থান। তার বিকল্পটি কিন্তু কারওই তেমন জানা নেই। মোদীর ঈশ্বর সাভারকর ছিলেন অত্যন্ত কৌশলী নেতা। কিন্তু তিনি না ছিলেন বহুত্ববাদী না পরধর্মসহিষ্ণু। তাঁর কি জানা ছিল, বেদ-কথিত পুণ্যভূমি থেকে প্রায় ২৫ কোটি অ-হিন্দুকে বিতাড়িত, বা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করলে তার কী প্রতিক্রিয়া হবে দেশে ও বিদেশে? সঙ্ঘ পরিবার নিজেও কি জানে খ্রিস্টান সমাজের ওপর বেশি চাপ দিলে আমেরিকা ও অন্যান্য পাশ্চাত্য দেশের ক্রোধানল কী আকার ধারণ করবে? ইহুদি ও পূর্ব ইউরোপবাসীদের ওপর অহেতুক বিদ্বেষ সৃষ্টি করে হিটলার পৃথিবীকে এক প্রলয়ঙ্কর বিশ্বযুদ্ধ উপহার দিয়েছিলেন।

    সেই হিটলারের ভাবাদর্শ অনুসারী সাভারকরকে মোদী তাঁর মন থেকে নির্বাসন দিলে, তা হবে দেশের পক্ষে মঙ্গলজনক। 

    . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . .

    অঙ্কন: দেবাশীষ দেব

You may like