চিঠিপত্র

অন্ধকূপ হত্যা প্রসঙ্গে

  • বিশিষ্ট ঐতিহাসিক সুশীল চৌধুরীর ‘অন্ধকূপ হত্যার ভ্রান্ত অস্তিত্ব’ শীর্ষক পত্রের (১৭ নভেম্বর ২০১৪) প্রেক্ষিতে দু’-একটি কথা বলতে চাই। নবাব সিরাজকে কালিমালিপ্ত করার জন্যই অলীক অন্ধকূপ হত্যাকাহিনির সৃষ্টি- এই সিদ্ধান্তের সমর্থনে একগুচ্ছ যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। হলওয়েল নিঃসন্দেহে ধূর্ত ও মিথ্যাচারী। তাই বলে নবাবের রাজত্বে বাস করে আগাপাশতলা এত বড় নির্ভেজাল মিথ্যা কাহিনি বানিয়ে বলার সাহস তিনি নিশ্চয়ই পাবেন না, বিশেষ করে সদ্য পরাজয়ের পরে। তাছাড়া ‘যা রটে তার কিছু বটে’ এই প্রবাদবাক্যটাই বা ভুলি কী করে? তাই হলওয়েলের বক্তব্যের সবটাই মিথ্যায় ভরা, এমন বলা যায় না।

    ইতিহাসাচার্য রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেছেন, ‘প্রচলিত বিবরণ মতে মোট কয়েদির সংখ্যা ছিল ১৪৬, তাহার মধ্যে ১২৩ জনই মারা গিয়েছিল। এই সংখ্যাটি যে অতিরঞ্জিত, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। সম্ভবত ৬০ কি ৬৫ জনকেই ঐ কক্ষে (অন্ধকূপে) আটক করা হইয়াছিল। ইহাদের মধ্যে কত জনের মৃত্যু হইয়াছিল তাহা সঠিক জানিবার উপায় নাই। কিন্তু ২১ জন যে বাঁচিয়াছিল, ইহা নিশ্চিত’ (বাংলা দেশের ইতিহাস, মধ্যযুগ পৃ. ১৬২)।

    একশো বছর আগে লেখা ‘কলিকাতা সেকালের ও একালের’ গ্রন্থেও হরিমাধব মুখোপাধ্যায় অন্ধকূপ হত্যার ঘটনা উল্লেখ না করে পারেননি। অতিরঞ্জনের কথা স্বীকার করে নিয়েও তিনি বলেছেন, আজকের রাইটার্স বিল্ডিংয়ের সামনে যেখানে অন্ধকূপ হত্যার স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপিত হয়েছিল, তার পাশে দুর্গের কাছ ঘেঁষে ছিল একটি গভীর নালা। অন্ধকূপে শোচনীয়ভাবে যারা মারা যায়, নবাবের আদেশে সেই নালাতেই তাদের মৃতদেহ ফেলে দেওয়া হয়। ১৯৪০ সালের জুলাই মাসের প্রথম দিকে সুভাষচন্দ্রের নেতৃত্বে সংগঠিত আন্দোলনের ফলশ্রুতি হিসেবে সেই স্মৃতিস্তম্ভ সেখান থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। মূলত হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতি বৃদ্ধির জন্যই এই অপসারণ (দ্রঃ নিমাইসাধন বসুর ‘দেশনায়ক সুভাষচন্দ্র’ পৃ. ২৪৭)।

    সুশীলবাবু বলেছেন, সমসাময়িক দু’টি ফারসি গ্রন্থে অন্ধকূপ হত্যার ঘটনা উল্লিখিত হয়নি। কিন্তু ‘রিয়াজ-উস-সালাতিন’ গ্রন্থের প্রায় সমসাময়িক আর-একটিতে তো এই হত্যাকাহিনি লিপিবদ্ধ রয়েছে। গ্রন্থটির নাম ‘বঙ্গদেশের পুরাবৃত্ত’, লেখক জন ক্লার্ক মার্শম্যান। বইটিতে বাংলার সর্বাত্মক ধারাবাহিক ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত। তাই স্বয়ং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর আগ্রহ সহকারে এটির সংক্ষিপ্ত অনুবাদের কাজে ব্রতী হয়েছিলেন। বইটির ‘বিজ্ঞাপন’-এ বলা হয়েছে ‘কোনও কোনও অংশ অনাবশ্যকবোধে পরিত্যক্ত হইয়াছে এবং কোনও কোনও বিষয় আবশ্যকবোধে গ্রন্থান্তর হইতে সঙ্কলনপূর্বক সন্নিবেশিত হইয়াছে।’ সন্দেহ নেই, ‘আবশ্যকবোধে’ই বিদ্যাসাগর অন্ধকূপ হত্যার কাহিনি বর্ণনা করেছেন। তিনি প্রসঙ্গক্রমে বলেছেন, ‘এই বৃত্তান্ত লোকের অন্তঃকরণে অদ্যাপি দেদীপ্যমান আছে...’ (বাঙ্গালার ইতিহাস)। কথা উঠতে পারে, ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের পড়ুয়াদের জন্যই তাঁর এই রচনা। তাই ইংরেজ শাসকের অনুরোধক্রমে বাঁধা-ধরার ছন্দে তাঁকে হয়তো কলম ধরতে হয়েছিল। কিন্তু বিদ্যাসাগরের মতো স্বাধীনচেতা মানুষ কখনওই ইংরেজ শাসককে খুশি করার জন্য ‘বাঙ্গালার ইতিহাস’-এ অলীক অন্ধকূপ হত্যার কাহিনিকে সন্নিবেশিত করেননি। তবে এই নৃশংস হত্যার জন্য বিদ্যাসাগর সরাসরি সিরাজকে দোষও দেননি। সেই রাত্রিতে দুর্গের ভার যার ওপর ন্যস্ত ছিল, নবাবের সেই সেনাপতি মানিকচাঁদকেই তিনি বলেছেন দোষের দোষী।

    বাণীবরণ সেনগুপ্ত, শ্যামনগর-৭৪৩১২৭